অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে যেভাবে সফল ডিএমসি শিক্ষার্থী রাকিব
ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ডিএমসি) ৭৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রাকিব হাসান। ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন দেখেন চিকিৎসক হয়ে মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করবেন। এরপর থেকে মনোনিবেশ করেন পড়াশোনায়। ২০১৯-২০ সেশনে জাতীয় মেধা তালিকায় ২১০তম স্থান অর্জন করেন।
২০২০ সালে মেডিকেলে ক্লাস শুরুর অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে হানা দেয় ভয়াবহ প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস, বন্ধ হয়ে যায় বাংলাদেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সবার মতো রাকিবও চলে যান গ্রামের বাড়িতে, কিন্তু তিনি বাড়িতে অবসর বসে না থেকে অনলাইনে শিক্ষার্থীদের পাঠদান শুরু করেন এবং ব্যাপক সাড়া পান। এ পর্যন্ত অনলাইনে পড়িয়েছেন ১৫ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী।
সম্প্রতি ডিএমসিতে রাকিবের সঙ্গে কথা হয় মেডিভয়েস প্রতিবেদকের। আলাপচারিতায় উঠে আসে তাঁর জীবনের বাঁকে বাঁকে ঘটে যাওয়া নানা গল্প। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: সাখাওয়াত হোসাইন।
মেডিভয়েস: অনলাইনে পাঠদান আপনার শুরুটা কিভাবে এবং সাড়া পাচ্ছেন কেমন?
রাকিব হাসান: আমি ২০২০ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হই। ওই বছর জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারি মাসে ক্লাস হয়েছে। মার্চে বাংলাদেশে ভয়াবহ করোনা থাবা দেয়, সব মেডিকেল কলেজের ক্লাস বন্ধ হয়ে যায়। আমি চলে গেলাম বাড়িতে। এপ্রিল মাসে একটা ফেসবুক গ্রুপে পোস্ট করি, ‘যেখানে লিখেছিলাম যারা আমার মতো গ্রাম থেকে পড়াশোনা করে মেডিকেলে চান্স পেতে চায়, তাদের জন্য করণীয় বিষয়ে। কেন গ্রামে থাকা শিক্ষার্থীরা চান্স পায় এবং পায় না, এ বিষয়গুলো ছিল।’ এতে আমি প্রচুর পরিমাণে সাড়া পাই। এর আগে এ সম্পর্কে আমি বেশি একটা জানতাম না। তারপর গ্রুপের এমডিন আমাকে মডারেটর হিসেবে নিয়োগ দেন এবং বলে তুমি এখানে বিভিন্ন পোস্ট করো। তাতে আমি নিয়মিত পোস্ট করতাম এবং এখানে লাইভ করতাম। এভাবে আমার অনলাইনে যাত্রা শুরু হয়।
দিন দিন প্রতিযোগিতা বাড়ছে। করোনাকালীন সময় শিক্ষার্থীরা অনলাইন নির্ভর ছিলো বেশি। এখন আগের মতো অনলাইনে আসছে না, তবে সাড়া পাচ্ছি। অভিভাবকরাও অনলাইনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। অনেকে এখন অনলাইনকে প্রাধান্য দিচ্ছে।
মেডিভয়েস: কোন চিন্তা থেকে এ প্ল্যাটফর্মে এসেছেন?
রাকিব হাসান: অনলাইনে আমি আসতে চাইনি। আর আমি অনলাইন সম্পর্কে এতটা পরিচিত ছিলাম না। কিন্তু আমি যখন একটা পোস্ট করলাম এবং এতো এতো শিক্ষার্থী কমেন্ট করেছে কিভাবে আমি পড়বো এবং কিভাবে এটা করবো ভাইয়া, এডমিশন কিভাবে হয় এবং কত মার্ক থাকে। তখন থেকে আমি ফেসবুক পেইজ খুলে ধীরে ধীরে মেডিকেল এডমিশন সংক্রান্ত লেখা শুরু করি। এতে শিক্ষার্থীরা কমেন্ট করতো। পড়ে দেখি, শুধু লেখা-ই যথেষ্ট নয়। যারা গ্রামে থাকে এবং এগুলো জানে না, তাঁদেরকে কিভাবে পড়তে হবে? ইত্যাদি নিয়ে ভিডিও বানিয়ে শিখানোর চেষ্টা করেছি। এরপর থেকে অনলাইনে লাইভ ভিডিও, ক্লাস, তাতে শিক্ষার্থীরা ভালো রেসপন্স করে। সেখান থেকে আমার অনলাইনে যাত্রা।
মেডিভয়েস: আপনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কতটুকু উপকৃত হচ্ছেন বলে মনে করেন।
রাকিব হাসান: আমি চেষ্টা করছি, একজন শিক্ষার্থী গ্রামে বা যেখানেই থাকুক, এডমিশন যে যে বাধাগুলো রয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে তাকে ক্লিয়ার আইডিয়া দেওয়ার এবং মেডিকেল এডমিশনে, কলেজ লাইফে এবং চিকিৎসা বিদ্যায় বাস্তবতা কি? ভালোভাবে উপস্থাপন করার। আমি অন্তত ১৫ হাজার মেডিকেল ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীকে পড়িয়েছি। আর তাঁদের মধ্য থেকে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী ঢাকা মেডিকেলসহ দেশের বিভিন্ন মেডিকেলে চান্স পেয়েছে। যদিও সংখ্যাটা কম, কিন্তু আমার পক্ষ থেকে অনেক বেশি মনে করি। সামনে আরও ভালো কিছু করবো, এজন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা করছি।
মেডিভয়েস: যারা মেডিকেলে পড়তে চান, তাঁদের কোন সময় থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত?
রাকিব হাসান: আমি মনে করি শুধু এডমিশনের চিন্তা করলে, এইচএসসি পরীক্ষার পর থেকে সিরিয়াস হওয়া প্রয়োজন। যাদের অনেক বেশি দুর্বলতা আছে, তারা শুধু এইচএসসি পরীক্ষার পর থেকে পড়লে ভালো জায়গায় চান্স নাও হতে পারে। এজন্য এইচএসসি প্রথমবর্ষ থেকে থেকে ধীরে ধীরে বুঝে বুঝে মূল বই পড়া, পরিকল্পনা করে সাধারণ জ্ঞান এবং ইংরেজি পড়া এবং মেডিকেলের মানবন্টন অনুযায়ী পড়া উচিত। প্রশ্নব্যাংকগুলো সমাধান করা এবং দেখে নেওয়া। এভাবে পড়াশোনা করলে চান্স পাওয়া অনেক বেশি সহজ হয়ে যাবে। তাই প্রস্তুতি গ্রহণ করা উচিত এইচএসসির পর থেকে। তবে মূল প্রস্তুতি এইচএসসি পরীক্ষার পর থেকে নিতে হবে এবং শুধু এদিকেই চিন্তা, ধ্যান-জ্ঞান সবকিছু দিতে হবে।
মেডিভয়েস: এখন আপনি কোন কোন বিষয় নিয়ে কাজ করছেন?
রাকিব হাসান: যারা এডমিশন দিবে, তাদের জন্য একটি গাইডলাইন তৈরির কাজ করছি। এ ছাড়া নিজের একাডেমিক পড়াশোনার প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছি। আমি রসায়ন, পদার্থ আর জীব বিজ্ঞান পড়াই। মেডিকেলের এডমিশনের কোচিং এবং ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান নিয়েও কাজ করছি। বর্তমানে কয়েকটি ফেসবুক পেইজে কার্যক্রম পরিচালনা করছি। আমার ব্যক্তিগত ফেসবুক ফেইজে লাখেরও বেশি ফলোয়ার রয়েছে।
মেডিভয়েস: এমবিবিএস কোর্সে পড়াশোনার অনেক চাপ থাকে, এরপর শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজও করছেন, আসলে আপনি সময় বের করেন কিভাবে?
রাকিব হাসান: মেডিকেলে যে পরিমাণ পড়াশোনা করা লাগে, আসলেই আমরা ওই পরিমাণ পড়াশোনা করি কিনা? সত্যিকার অর্থে দেখবেন, মেডিকেল শিক্ষার্থীরাও কিন্তু সময়ের অপচয় করে। অনেকে মেডিকেলে পড়াশোনা করছেন পাশাপাশি ফেসবুক, ইউটিউব ভিডিও রিলস দেখেন। আমি শুধু অনলাইনে কার্যক্রমই করছি না, শিক্ষার্থীদেরকে পড়ানোর জন্য আমাকেও পড়তে হচ্ছে। এটার মধ্যে আমি মনে রাখা শিখছি এবং দ্রুত কিভাবে পড়ালেখা করা লাগে সেটাও আমি শিখছি। আর এটা সবসময় পারফেক্ট চলে না, কিছু ব্যালেন্স আপনাকে করতে হবে। যখন আমার সামনে পরীক্ষা থাকে, তখন পরীক্ষার দিকে মনোযোগ দেই। আর যখন পরীক্ষা শেষ, তখন বাহিরের এক্সট্রা কাজের দিকে ফোকাস দেই। একটু পরিশ্রম আর টেকনিক খাটিয়ে চললে, খুব ভালোভাবে যেকোনো কাজ এগিয়ে নেওয়া যায়।
আমার অনলাইন কার্যক্রম শুরু হয় সন্ধ্যার পর থেকে। আমরা অনলাইনে একটা ক্লাস, একটা পরীক্ষা নিয়ে থাকি। আর কিছু টিউটোরিয়াল ভিডিও স্যুট করে অনলাইন থেকে বের হয়ে যাই। এরপর মেডিকেলের পড়াশোনা করতে যাই। এক ঘণ্টা পড়াশোনা করে চেষ্টা করি তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাওয়ার আবার সকালে তাড়াতাড়ি উঠার। আজকে যে আইটেম বা পড়া আছে, সেটার জন্য প্রস্তুতি নিই। ৭টা ২০ মিনিট থেকে ক্লাস, পরীক্ষা ও ওয়ার্ড শুরু হয়। দুইটার পর থেকে বেশ লম্বা একটা সময় ফাঁকা থাকে। এসময় অনেকে ভিডিও দেখে, মোবাইল সময় কাটান। আমি তখন মেডিকেলের পড়াশোনা কমপ্লিট করে রাখি। আমি বিশ্বাস করি, আমাকে প্রস্তুত থাকতে হবে। আমি জানি, সন্ধ্যার পর আমি পড়াশোনায় সময় দিতে পারবো না। এজন্য যখন সময় পাই, তখনই একাডেমিক পড়াশোনায় মনোযোগ দেই।
মেডিভয়েস: মেডিকেল লাইফ কতটুকু উপভোগ করছেন?
রাকিব হাসান: প্রথম দিকে আমরা যখন মেডিকেলে আসি, তখন আমাদের মধ্যে অনেক আশা থাকে। আর মেডিকেল লাইফে একটা ডিসিপ্লিনের মধ্যে থাকা লাগে। এটা অনেকে হয়তো নিতে পারে না। আমার কাছ থেকে পরিবার, সমাজ কি আশা করে। মানবদেহ হলো জটিলবোর্ড। আমার উপর একটা মানুষের জীবন, হাসি আর দুঃখ নির্ভর করে। এটা ভাবলে পড়াশোনাটা অনেক সহজ হয়ে যায়। যারা শৃঙ্খলাবোধ পছন্দ করেন, এবং এখন কষ্ট করলে সামনে ভালো কিছু পাওয়া যাবে, এমন প্রত্যাশা করেন তাদের জন্য সহজ। এটি ত্যাগের একটা পেশা। এখানে কষ্ট করে বড় হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাদের জন্যই মেডিকেল লাইফ উপভোগ্য। আমিও সেভাবেই মেডিকেল লাইফ উপভোগ করছি।
মেডিভয়েস: কখনও কি ভেবেছেন শিক্ষা জীবনে এতটুকু এগিয়ে যাবেন?
রাকিব হাসান: এতদূর এগাবো কল্পনা করিনি। তবে স্বপ্ন দেখেছি। একদিন ক্যাম্পাসে আসবো। এখনতো অনলাইনে ক্যাম্পাস নিয়ে ভিডিও আছে, আগে সেভাবে ছিল না। যতটুকু পেতাম ক্যাম্পাস নিয়ে ভিডিও দেখতাম। আমি ভিডিও অনলাইনে দেওয়ার চেষ্টা করছি। এডমিশনে যখন ছিলাম, তখন পড়াশোনা করতাম আর একটু ভাবতাম। আমারও হবে একদিন। আশা ছিল, চেষ্টা করেছি। তাই স্বপ্নটা পূরণ হয়েছে।
আর আমাদের গ্রামে ভালো মনের শিক্ষিত লোক আছে এবং শিক্ষাকে অন্তত কদর করা হয়। যে কারণে ভালো একটা পরিবেশ পেয়েছি এবং অনুপ্রেরণা পেয়েছি।
আমার আত্মীয় স্বজন বা গ্রামের মধ্যে কেউই মেডিকেলে পড়ে নাই, বংশের আমিই একমাত্র মেডিকেল শিক্ষার্থী। আর আমি যে কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট দিয়েছি, সেখানেও আমার জানা মতে একজন মেডিকেলে চান্স পেয়েছে।
মেডিভয়েস: আপনাকে নিয়ে আত্মীয়-স্বজনের অনুভূতি কী?
রাকিব হাসান: আমার বাবা-মা অনেক খুশি। আমার গ্রামের একমাত্র মেডিকেল শিক্ষার্থী, আমি। আমার বাবাকে গ্রামের মানুষ এখন একটু বেশি সম্মান করেন। আব্বাকে বলে আপনি অনেক কষ্ট করেছেন, আপনার ছেলে ডাক্তার হবে। এটা শুনতে সবার পিতা-মাতাই চান। আত্মীয়-স্বজনও গর্ববোধ করেন। সবাই খুশি এবং সবাই দোয়া করেন। গ্রামে গেলে সবার সাথে দেখা করি এবং সবার সঙ্গে মিশি। তাঁরা আমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেন এবং তা দেখে আমার মনে হয়, আমার আরও অনেক পরিশ্রম করা উচিত এবং অনেক দূর যাওয়া উচিত।
মেডিভয়েস: আপনার বেড়ে ওঠা নিয়ে জানতে চাই।
রাকিব হাসান: আমার বেড়ে ওঠা লক্ষীপুর জেলার সদর উপজেলায়। আমরা পাঁচ ভাইবোন। আমার বাবা একজন মুদি দোকানদার এবং মা গৃহিনী। এসএসসি এবং এইচএসসি দুটোতেই এ প্লাস পেয়েছি।
এএইচ/
-
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
-
২৯ ডিসেম্বর, ২০২৪
-
২৫ ডিসেম্বর, ২০২৪
-
১২ ডিসেম্বর, ২০২৪
-
২৯ নভেম্বর, ২০২৪
-
২৭ নভেম্বর, ২০২৪
-
২৭ নভেম্বর, ২০২৪
-
২৭ নভেম্বর, ২০২৪
-
২৭ নভেম্বর, ২০২৪