সিএমইউর তৃতীয় প্রফে সেরা কক্সবাজার মেডিকেলের আল হিসাম
গত ৯ মে চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সিএমইউ) অধিভুক্ত মেডিকেল কলেজগুলোর তৃতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। এতে অংশগ্রহণ করেন ১৬টি মেডিকেল কলেজের ১ হাজার ২০৯ জন শিক্ষার্থী, এর মধ্যে পাস করেছেন ৯৮২ জন। তার মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর অনার্স মার্ক অর্জন করেন ৩২ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ৩১ জন অনার্স পেয়েছেন এক সাবজেক্টে, আর কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের মোহাম্মদ আল হিসাম দুই সাবজেক্টে অনার্স পেয়ে অনন্য ফলাফল অর্জন করেছেন, যা সিএমইউর অধীনে তৃতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষায় সবার সেরা।
আল হিসাম ২০০০ সালে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারার একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিন ভাই-বোনের মধ্যে তিনি মেঝ। ডুলাহাজারা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি আর কক্সবাজার সরকারি কলেজ থেকে ২০১৮ সালে এইচএসসি পাস করেন।
সম্প্রতি কক্সবাজার মেডিকেলের ১১তম ব্যাচের মেধাবী এ শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় মেডিভয়েসের। আলাপচারিতায় উঠে আসে, চিকিৎসা পেশা ঘিরে আল হিসামের পরিকল্পনা এবং ঈর্ষণীয় সাফল্যের নেপথ্য কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: সাখাওয়াত হোসাইন।
মেডিভয়েস: ১২০৯ জন মেডিকেল শিক্ষার্থীর মাঝে সেরা ফলাফল করেছেন। আপনার অনুভূতি জানতে চাই।
আল হিসাম: মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা। এখন আসলেই অনেক ভালো লাগছে। অনেক পরিশ্রম করার পর যখন ভালো কিছু অর্জন করা যায়, তখন খুবই ভালোই লাগে। আমার এ ফলাফলে বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবাই খুশি।
মেডিভয়েস: কোন অনুপ্রেরণায় এ পর্যন্ত আসা?
আল হিসাম: বাবা-মা, ভাই-বোন, শিক্ষক ও ব্যাচমেটদের অনুপ্রেরণাই সবচেয়ে বেশি ছিল। আমি গ্রাম থেকে উঠে এসেছি এবং গ্রামের সন্তানই বলা যায়। গ্রামের মানুষগুলো কিভাবে চিকিৎসা না নিয়ে দিনের পর দিন ভুগতেছে? এগুলো আমি দেখে এসেছি। এ বিষয়টা আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছে। সেই থেকে চিকিৎসক হতে হবে, এটা বুকে লালন করেছি।
মেডিভয়েস: আপনার পড়ার কৌশল কেমন ছিল?
আল হিসাম: পড়াশোনায় আমি রেগুলারিটি ম্যানটেইন (নিয়মানুবর্তিতা) করি। একটা বিষয় লক্ষ্য করেছি, মেডিকেলে যত বেশি নিজেকে ডেভেলপ করা যাবে, ভালো রেজাল্ট করার সম্ভাবনা তত বেড়ে যায়। আমি রেগুলার পড়ে মূল বইয়ের পাশাপাশি গাইড বইয়ের প্রশ্নগুলো মূল বইয়ের আলোকে সাজানোর চেষ্টা করতাম, আর আমাদের গাইড বইতে রেফারেন্স থাকলেও মূল বইয়ের মতো থাকে না। যখন গাইডের প্রশ্নগুলো মূল বইয়ের মতো সাজাতাম, তখন অনেক কিছুই সহজ হয়ে যেত। আর আমি অনেক বেশি রিভিশন দিতাম, এতে আমার ভুলগুলো আস্তে আস্তে কমে আসতো। এ কৌশলগুলো আমি অবলম্বন করেছি।
মেডিভয়েস: শেষের দিকের মেডিকেল কলেজগুলো নিয়ে অনেকেই নানা কথা বলে থাকে। কিন্তু আপনি শেষের দিকে মেডিকেল কলেজ থেকেও ভালো ফলাফল করেছেন, আপনার অভিজ্ঞতা থেকে নবীন শিক্ষার্থীদের কী পরামর্শ দিবেন?
আল হিসাম: সব কিছুরই ইতিবাচক-নেতিবাচক দিক থাকে। আমি এখানে যে, ইতিবাচক দিকটা খুঁজে পেয়েছি, সেটি হলো এই মেডিকেলে শিক্ষার্থী কম হওয়ার কারণে আমরা শিক্ষকদের খুব কাছে যেতে পারি। তাঁরা আমাদেরকে খুব কাছ থেকে চিনেন। এজন্য যেকোনো সমস্যায় আমরা স্যারদের সাহায্য-সহযোগিতা পেয়ে থাকি। আর আমাদের সিনিয়ররাও খুব সহযোগিতা করেন। তারা সবসময় গাইডলাইন দিয়ে থাকেন। সিনিয়রদের পরামর্শ নিয়ে পড়াশোনা করলে ভালো করা আসলেই খুব সহজ।
আর এখন আধুনিক যুগ। ইউটিউবে অনেক লেকচার পাওয়া যায়। সেগুলোতেও খুব উপকার পাওয়া যায়। আমি মনে করি, সবকিছু নিজের উপর নির্ভর করে। আপনি ভালো করতে চাইলে সব জায়গা থেকে ভালো করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করি। আর কঠোর পরিশ্রম করলে সফলতা আসে, এটাও আমি বিশ্বাস করি।
মেডিভয়েস: ভবিষ্যতে কোন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে চান এবং কেন?
আল হিসাম: আমার কাছে মেডিসিন সাবজেক্টটা ভালো লাগে। এই বিষয়ে ক্যারিয়ার গড়ার ইচ্ছা আছে। আর স্পেশালিস্ট হিসেবে যদি চিন্তা করতে চাই, তাহলে কার্ডিওলজিস্ট হওয়ার ইচ্ছা আছে। কারণ আমার আব্বু হৃদরোগে আক্রান্ত। এইখান থেকে কার্ডিওলজিস্ট হওয়ার ইচ্ছা, এই বিষয়টা পড়তেও ভালো লাগে।
মেডিভয়েস: মেডিকেল লাইফের চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে অতিক্রম করেন?
আল হিসাম: মেডিকেল লাইফে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জ এবং চাপ থাকে। এখানে একটা বিষয় মেনটেইন করতে হয়, সেটা হলো রেগুলারিটি। নিয়মিত পড়াশোনা করলে সবকিছু সহজ মনে হয়। একদিন পড়ি, আরেকদিন পড়ি না, তখন মনের মধ্যে একটা হতাশা কাজ করে। আর মেডিকেল হতাশা আসাটাই স্বাভাবিক। এগুলো দূর করার জন্য নিয়মিত পড়তে হয় এবং পরিশ্রম করতে হয়। সেইসঙ্গে সিনিয়রদের থেকে সহযোগিতা নেওয়া লাগে। যত বেশি সিনিয়রদের সহযোগিতা নিবো, সবকিছু তত সহজ মনে হবে।
মেডিভয়েস: মেডিকেলে পড়ার স্বপ্ন কোথা থেকে পেলেন? ভর্তিচ্ছুদের প্রতি আপনার পরামর্শ জানতে চাই।
আল হিসাম: ছোটবেলা থেকে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ছিল। আর এখানে আমার জীবনের একটা বড় ঘটনাও আছে, সেটি হলো আমার বড় ভাই যখন অ্যাডমিশন টেস্ট দেয়, তখন দুর্ভাগ্যবশত: তাঁর মেডিকেলে চান্স হয়নি। তাতে আমার মা-বাবা অনেক কষ্ট পায়, মেডিকেলে চান্স না হওয়ার কারণে। সেখান থেকে আমার মনের মধ্যে একটা তীব্র আকাঙ্খা তৈরি হয়, আমি অবশ্যই মেডিকেলে পড়বো। এভাবে মেডিকেলে চান্স পাওয়া।
যারা মেডিকেলে আসতে চায়, তাদেরকে বলবো, মেডিকেলে যারা পরীক্ষা দেয়, তারা সবাই মেধাবী। কিন্তু তারাই মেডিকেলে চান্স পায়, যারা কঠোর পরিশ্রম করে এবং অনেক বেশি পড়ালেখা করে। আর পূর্বের পড়াগুলো বেশি বেশি রিভিশন দিতে হবে। এতে চান্স পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।
-
২৩ জানুয়ারী, ২০২৫