২৫ এপ্রিল, ২০২১ ০৩:৫১ পিএম

ঢাকা মেডিকেলের সব স্তরেই জনবল বাড়ানো দরকার

ঢাকা মেডিকেলের সব স্তরেই জনবল বাড়ানো দরকার
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। ছবি: সাহিদ

মুন্নাফ রশিদ: ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র।  ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তাবের ভিত্তিতে ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত সরকারি এ হাসপাতালটি গত বছর প্রায় ১০ লাখ রোগীকে সেবা দিয়েছে।

সাধারণ মানুষের পরম ভরসাস্থলে পরিণত হওয়া এ হাসপাতালে শুধু রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোই নয়, দেশের সব বিভাগ, জেলা ও উপজেলা থেকে রোগীদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় এখানে। ঢাকা মেডিকেল সাধারণত কাউকে ফিরিয়ে দেয় না।  শয্যা না হোক, ফ্লোরে হলেও ঠাঁই হয়।

ঢামেক হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে ৯১ হাজার ২০০ জন রোগী এ হাসপাতালে ভর্তি হন।  মাসে ভর্তি হন গড়ে প্রায় আট হাজার রোগী। একই সময়ে জরুরি বিভাগে ৩ লাখ ও বহির্বিভাগে ৬ লাখ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। অর্থাৎ গত বছর প্রায় ১০ লাখ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন, প্রতিদিনের হিসাবে যা দাঁড়ায় দুই হাজার ৭০০ জন।

যেখানে আগে ২০১৫ সালে প্রায় আট লক্ষ রোগীকে সেবা প্রদান করেছে প্রতিষ্ঠানটি। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে রোগী সেবার সংখ্যা বেড়েছে দু্ই লাখ। প্রতিবছর এভাবেই রোগীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে।

প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে তাই ছুটে আসা জটিল ও দূরারোগ্য নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত এসব রোগীদের চিকিৎসা সেবায় দিন-রাত চবি্বশ ঘণ্টা ব্যস্ত সময় পার করেন প্রতিষ্ঠানটির চিকিৎসক-নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তবে সুবিশাল এই প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক অবকাঠামো কেমন?

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৫ সালে পর্যন্ত কলেজ ও হাসপাতাল একই প্রশাসনের আওতায় পরিচালিত হতো। ১৯৭৫ সালে দুটিকে বিভক্ত করে কলেজের প্রধান হিসেবে একজন প্রিন্সিপাল এবং হাসপাতালের প্রধান প্রশাসক হিসেবে একজন পরিচালক নিয়োগ করা হয়। 

তবে মানুষের শেষ ভরসাস্থল হিসেবে পরিচিত ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অবকাঠামোগত পরিধিসহ কর্মপরিবেশ বাড়লেও এর প্রশাসনিক অবকাঠামো বৃদ্ধি পায়নি। বর্তমানে দেশের বৃহৎ এই চিকিৎসা সেবাকেন্দ্র পরিচালনা করছেন মাত্র পাঁচজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে একজন পরিচালক, উপ পরিচালক একজন এবং সহকারী পরিচালক হিসেবে তিনজন কর্মকর্তা রয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু প্রশাসনিক কাজ দেখার জন্যই নবম গ্রেডে ২৫ জন, ষষ্ঠ গ্রেডে ১০ জন, পঞ্চম গ্রেডে পাঁচজন কর্মকর্তা প্রয়োজন। অথচ কোন প্রশাসনিক নবমম বা ষষ্ঠ গ্রেডের পদ নেই। 

ঢাকা মেডিকেল কলেজের সদ্য সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘অবশ্যই মনে করি জনবল বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যত দ্রুত রোগী ভর্তি করা যায় ঠিক ততোটা সহজ নয় প্রশাসনিক পদ বৃদ্ধি করা। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে এভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে এখানে কিছুটা সংস্কার দরকার।

তিনি বলেন, ‘উপজেলা হাসপাতালগুলোর শয্যা সংখ্যা যখন বৃদ্ধি করে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট করা হলো তখন কিন্তু মেডিকেল অফিসারের সংখ্যা ওই আলোকে বৃদ্ধি করা হয়নি বরং আগের নিয়মেই চলছে। সুতরাং আমাদের পরিকল্পনায় এগুলো নিয়ে আসা উচিত। অর্থাৎ যেসকল প্রতিষ্ঠানে কাজের পরিধি বাড়বে সেখানে সার্বিক পরিচালনার জন্যও জনবল বৃদ্ধি করা উচিত। 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কাজের পরিধির কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘করোনার সময়ে আমরা তাদের কর্মচঞ্চলতা খুব কাছ থেকে লক্ষ্য করেছি। তারা দিন রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। কোথায় কি সমস্যা তা সমাধান করার চেষ্টা করছে। সুতরাং ঢামেকের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য পরিচালকের সাথে একটি টিম থাকা দরকার। অর্থাৎ পরিচালকের সাথে একজন উপ পরিচালক, উপ পরিচালক ফাইন্যান্স একজন, উপ পরিচালক অ্যাডমিন একজন, উপ পরিচালক নার্সিং একজন, উপ পরিচালক খাদ্য ম্যানেজমেন্টসহ বিভিন্ন বিভাগের জন্য একজন করে উপ পরিচালক থাকা উচিত। এতে কাজের পরিধি এবং সচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সদ্য সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিন মেডিভয়েসকে বলেন, ‘বিশাল এই প্রতিষ্ঠানের জন্য মাত্র পাঁচজনের জন্য যে অ্যাডমিনিস্ট্রেডিভ বডি রয়েছে তা খুবই ছোট। হাসাপাতাল এবং ক্লিনিক্যাল, শুধু এই দুইটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের আলাদাভাবে অনেক জনবল দরকার। এতো অল্প সংখ্যক জনবল নিয়ে এই বিশাল প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা অবাস্তব এবং অসম্ভব। যা বছরের পর বছর চলে আসছে। এরফলে কাজ গুছিয়ে করা সম্ভব হয় না। কেননা একজন যখন কয়েকটি বিভাগের দ্বায়িত্ব পালন করে তখন ব্যালেন্স করা সম্ভভ হয়ে ওঠে না। কাজগুলো যদি আরও কয়েকটি শাখায় বিভক্ত করা যেত তাহলে যেমন কাজের সচ্ছতা বাড়াতো তেমন কাজের গতিও বাড়তো।

শুধু পরিচালক বা উপ পরিচালকের পদ বাড়ালেই সমাধান হবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পরিচালকের নিচে যে পদগুলো রয়েয়েছ সেখানেও জনবল বৃদ্ধি করা দরকার। যেখানে ওয়ার্ডমাস্টার দরকার ছিল কমপক্ষে ২০ জন, সেখানে মাত্র ৭ থেকে ৮ জন ওয়ার্ডমাস্টার দিয়ে ২৪ ঘণ্টা এত ব্ড় হাসপাতাল পরিচালনা করা অবাস্তব এবং অসম্ভব। এছাড়া ওয়ার্ডমাস্টারের উপরে একটি অ্যাডমিনিস্ট্রেটিব পদ থাক উচিত। শুধু তাই না এই লেভেলটিতে অনেক জনবল দরকার।

পাশাপাশি নবম, ষষ্ঠ ও পঞ্চম গ্রেড সবমিলিয়ে ৩০ জনের উপরে জনবল দরকার বলে মনে করনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসির উদ্দিন।

সার্বিক বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজমুল হক মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এ বিষয়গুলোকে সামনে রেখে আমাদের নতুন যে মহাপরিকল্পনা চলমান রয়েছে। সেখানে প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। এখানে উন্নত দেশের যেসব আধুনিক হাসপাতাল সুনামের সাথে এগিয়ে যাচ্ছে তাদেরকে সামনে রেখে প্রশাসনিক ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে।

ঢামেকের মতো প্রতিষ্ঠানের বিবেচনায় বর্তমানে প্রশাসনিক জনবলের সংখ্যা খুবই অপ্রতুল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটি একটি পুরাতন অবকাঠামো এবং পুরাতন একটি টিম। তবে সমাস্যা সমাধানে বিভিন্ন সংকটকালীন মুহূর্তে অথবা বিশেষ সময়গুলোতে সংযুক্তির মাধ্যমে জনবল নিয়ে কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হচ্ছে।

ঢামেক পরিচালক বলেন, ‘এখানে দুই হাজার ৬০০ শয্যা সংখ্যার হিসাব করেই যেমন জনবল রয়েছে তেমনি প্রশাসনিক ব্যবস্থাও সে অনুযায়ী তৈরি করা আছে। তবে এই ধরনের সমস্যার কথা বিবেচনা করেই মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে এবং যেখানে প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে আধুনিক রূপ দেওয়া হবে।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক