অধ্যাপক শামসুজ্জামান তুষারের মৃত্যুতে বিশিষ্টজনের শোক
মেডিভয়েস রিপোর্ট: করোনাভাইরাস তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড গোটা বিশ্ব। এই অতিমারি ঝড়ে নাকাল বাংলাদেশও। ভাইরাসটির ছোবলে প্রতিদিনই না ফেরার দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন সম্মুখসারির যোদ্ধা চিকিৎসকসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ।
এ পথ ধরে চিরবিদায় নিলেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের (এনআইএলএমআরসি) পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল খায়ের মোহাম্মদ শামসুজ্জামান তুষার।
আজ শনিবার (২৪ এপ্রিল) সকালে রাজধানীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।
অধ্যাপক ডা. আবুল খায়ের মোহাম্মদ শামসুজ্জামান তুষারের মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বপ্নচারী এ চিকিৎসকের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন দেশের বিশিষ্টজনরা। তাঁরা মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনার পাশাপাশি শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।
স্বাচিপ সভাপতির শোক
শোক জানিয়ে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বলেন, ‘বলার মতো কোনো ভাষা নেই। মানুষ হিসেবে অসাধারণ ছিল তুষার। মানুষের দোয়া তোমার সঙ্গে আছে, ভালো থেকো।’
সেরাদের সেরা
‘একটি নক্ষত্রের বিদায়’ শিরোনামে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কর্মরত ডা. শফিউর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিভাগে যত মানুষকে কাছ থেকে দেখেছি, আমার মনে হয়েছে প্রফেসর ডা. শামসুজ্জামান তুষার স্যার সেরাদের সেরা। তিনি ছিলেন মাইক্রোবায়োলজির প্রফেসর, দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিডিসির পরিচালক ছিলেন এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের পরিচালক। এ রকম একজন গুণী মানুষ স্বাস্থ্য বিভাগে কমই আছেন। এ রকম জ্ঞানী, বিজ্ঞ, কর্মতৎপর, দরদী মানুষ বিরল। তাঁর সান্নিধ্যে যারা এসেছেন, তারা সকলেই এক বাক্যে স্বীকার করেন বাংলাদেশের কনফুসিয়াস আমাদের প্রিয় তুষার স্যার।’
অধ্যাপক ডা. শামসুজ্জামান তুষারের গড়া ন্যাশনাল রেফারেন্স ল্যাবরেটরির সূচনা ও পথচলার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘একটা নতুন প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল রেফারেন্স ল্যাবরেটরিকে তিনি নিজের সন্তানের মতো লালন পালন করতেন। নাম দিয়েছিলেন স্বপ্নপুরী। সেই স্বপ্নপুরী ছিল নবীন, ছিল না প্রয়োজনীয় জনবল। তিনি বিভিন্নভাবে জনবল ধার করে দিন-রাত পরিশ্রম করে সেই স্বপ্নপুরীকে দেশের সেরা পিসিআর ল্যাবরেটরিতে রূপান্তর করেছিলেন। ন্যাশনাল রেফারেন্স ল্যাবরেটরি প্রায় সাত লাখ পিসিআর একাই করেছে, যা একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে সর্বোচ্চ। তিনি অত্যন্ত ধার্মিক পরহেজগার মানুষ ছিলেন। ছিলেন স্বভাবকবি। দেশের ক্রান্তিকালে দিনরাত পরিশ্রম করে তিনি কোভিড রোগ নির্ণয়ে পিসিআর পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছেন। শত শত স্বাস্থ্যকর্মী তাঁর মুখের কথায় তাঁকে ভালবেসে ন্যাশনাল রেফারেন্স ল্যাবরেটরিকে দেশসেরা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেছেন। সেই মহান দেশপ্রেমিক গুণী মানুষটি কোভিডের সঙ্গে যুদ্ধ করে আজ দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন।
শেষ অসিয়ত
গত ১৪ এপ্রিল প্রফেসর ডা. শামসুজ্জামান তুষার করা একটি অসিয়তের কথা উল্লেখ করে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের বিভাগীয় প্রধান (ল্যাব) ও উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. জয়নাল আবেদীন টিটো লেখেন, ‘সন্তানগণ ও আত্মীয়স্বজন, আমার কবর দিও কোরবানির মাঠে আমার ক্রয়কৃত জায়গায়। চারদিক দেওয়াল দিয়ে ঘিরে একটা ঘর বানিয়ে নাম লিখে দিও।’
ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে শায়িত অবস্থায় একই দিন করা তাঁর অন্য অসিয়ত হলো—‘আমার পাশে আমার স্ত্রীর কবর হবে। শেষ নসিহত।’
ডা. টিটো বলেন, জীবনে ছিলেন একসাথে, মৃত্যুর পরও থাকতে চান একই সাথে। এরই নাম সহধর্মিণী। জীবন-মরণে চিরসাথী পথচলার।
এমন গুণী মানুষদের যথাযথ মূল্যায়নের চর্চা না থাকায় আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ হয়ত জানেন না, কত বড় স্বপ্নচারীকে তারা হারিয়েছে। জানবে কী করে? ঔপনিবেশিক শাসন আমাদের চিন্তাকে এমনভাবে কলুষিত করেছে যে, জ্ঞানীদেরকে আমরা যথাযথ মূল্যায়ন করি না। যে যত বেশি অভিনয় করতে পারে, যে যত বেশি ক্ষমতার দাপট দেখাতে পারে, এই বঙ্গদেশে তারই প্রশংসা বেশি।
প্রফেসর শামসুজ্জামান ছিলেন দক্ষ প্রশাসক
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী সার্জন ডা. মো. ফজলুল কবির পাভেল বলেন, ‘তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী মানুষ। করোনার সময় স্যার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে কাজ করেছেন তার কোন তুলনাই হয় না। স্যারের সংস্পর্শে যে বা যারা এসেছেন কেউ স্যারকে ভুলতে পারবে না। সবাইকে স্নেহ করতেন, ভালবাসতেন—তিনি ছিলেন দক্ষ প্রশাসক। মহান আল্লাহ প্রফেসর শামসুজ্জামান তোষার স্যারকে যেন জান্নাতবাসী করুন।’
ঢাকার অধিকাংশ করোনা টেস্টই তাঁর ল্যাবে
‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’র কেন্দ্রীয় কমিটির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. ফারুক মহসিন বলেন, ‘ফারুক পাঠাই দাও। আমিতো আছি’—এখনও কানে বাজে কথাটা। ঢাকার বেশিরভাগ মানুষের করোনা টেস্ট বোধ করি স্যারের ল্যাবই হয়েছে।’
করোনাকালীন সময়ে ঢাকা সিভিল সার্জন অফিসে কাজ করার সময় স্যারের সাথে পরিচয়। কি অমায়িক ব্যাক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ!
পরবর্তীতে ডিএনসিসিতে বিদেশগামী যাত্রীদের করোনা টেস্টের দায়িত্ব পালনের সময় একই অবস্থা, সেই তুষার স্যার।
ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না, কি বলবো! স্যার, কোন দিন না করেননি।
দেশ একজন হিরো, দেশপ্রেমিক, অসাধারণ মানুষকে হারালো। এই ক্ষতি পোষাবার নয়। স্যার নিজের জীবনটাই দিয়ে দিলেন সেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে।
সহকর্মীর স্মৃতিচারণ
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার লেখেন, ‘সবারই প্রিয়মুখ অধ্যাপক ন্যাশনাল রেফারেন্স ল্যাব ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা.একেএম শামছুজ্জামান তুষার গতরাতে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। ব্যক্তিগতভাবে আমার দীর্ঘ দিনের সহকর্মী, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে এক সাথে অনেক দিন ছিলাম। আমরা একই সময় এম ফিল (১৯৯৩-১৯৯৫) কোর্সে ছিলাম। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে প্রার্থনা করছি, আল্লাহতালা আমাদের প্রিয় তুষারকে মাগফেরাত দান করুন, তার কবরকে জান্নাতের টুকরা বানিয়ে দিন ও জান্নাতুল ফিরদাউসে দাখিল করুন।’
শোকসন্তপ্ত পরিবারের সবাইকে জানাই গভীর সমবেদনা ও সহানুভূতি। পরিবারের সদস্যদের ও নিকট আত্মীয়দের এ শোক কাটিয়ে ওঠার তৌফিক দান করুন।
-
১৯ মে, ২০২৬
-
০৪ মে, ২০২৬
-
২৯ এপ্রিল, ২০২৬
-
২০ এপ্রিল, ২০২৬
-
০৮ এপ্রিল, ২০২৬
-
২৬ মার্চ, ২০২৬
-
২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬