অধ্যাপক ডা. তারিক রেজা আলী

অধ্যাপক ডা. তারিক রেজা আলী

সহযোগী অধ্যাপক, চক্ষু বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।


৩০ মার্চ, ২০২১ ০৮:৩২ পিএম

‘আমার আর সরকারি চাকরি করা হলো না’

‘আমার আর সরকারি চাকরি করা হলো না’

সে অনেক দিন আগের কথা। ১৯৯৫ সালে সরকারি চাকুরিতে এক থানা হেলথ কমপ্লেক্সে কর্মরত ছিলাম। তখন কিছুদিনের জন্য শুক্র ও শনিবান দুইদিন ছুটি বরাদ্দ ছিল। রোববার খুব সকালে যেতাম, বৃহস্পতিবার বিকেলে রওয়ানা দিয়ে বেশ রাতে ঢাকায় ফিরতাম।

রাজনৈতিক আন্দোলন খুবই তুঙ্গে ছিল। মাঝে মাঝেই ৪৮ ঘন্টা এবং ৭২ ঘন্টার হরতাল পালিত হতো। সাধারণত বৃহস্পতি, শুক্র বা শনিবার হরতালের আওতায় পড়তো না। কোন এক সপ্তাহের শেষ দিনগুলোতে রাজপথ রেলপথ অবরোধ চলছিল। আমি ঢাকায় যেতে পারলাম না। গভীর মনোকষ্টে থানা হেলথ কমপ্লেক্সের ডরমিটরিতে অলস সময় পার করছিলাম। শুক্রবার জুম্মার নামাজ শেষ করে যখন নিজের ডেরায় ফিরছিলাম। তখনই এক ঘটনা ঘটলো, যা পরবর্তীতে আমার জীবনের গতিপথ পাল্টে দিলো।

হাসপাতালের গেট দিয়ে ঢুকে দেখি ইমারজেন্সিতে অনেক ভিড়। ডিউটিতে যিনি ছিলেন, বেশ বয়স্ক একজন সিনিয়র ডাক্তার। আমি ভাবলাম, রোগীটা দেখেই যাই, না হলে ঐ সিনিয়র ভাইকে আবার কষ্ট করে আসতে হবে। গিয়ে দেখি রোগীর মাথায় আঘাত, রক্ত পড়ছে। ক্ষতস্থানে সেলাই করা হলো, ব্যান্ডেজ করা হলো, চিকিৎসা দেওয়া হলো।

এর সাত দিন পরে ঐ রোগী আমার কাছে এসে বললো, ‘সে কেস করবে এবং আমাকে একটা গ্রিভিয়াস হার্ট বা অতি গুরুতর আঘাতের সার্টিফিকেট দিতে হবে। আমি আঘাতের রেকর্ড ঘেঁটে দেখি এটা গুরুতর আঘাতের পর্যায়ে পড়ে না।’

বুঝিয়ে বললাম, তাঁকে আর তাঁর সাথে থাকা আত্মীয়-স্বজনকেও বোঝালাম। কোনও কাজ হলো না। রোগীর সমর্থনে এগিয়ে এলো এলাকার পাতি নেতা, উপনেতা আর সবশেষে উপজেলা চেয়ারম্যান স্বয়ং। না, কোন খারাপ ভাষা তিনি ব্যবহার করেননি। আমাকে শারীরিক হেনস্থাও করেননি। বলেছিলেন শুধু সার্টিফিকেটটা তার মতো করে দিতে হবে।

আমি সদ্য ইন্টার্নশীপ শেষ করা নবীন যুবক। আমি কেন মাথা নীচু করবো? করলাম না তো করলামই না। ছুটি নিয়ে ঢাকায় চলে এলাম। জনপ্রতিনিধি সেখানেই চলে এলেন, আমার ঢাকার বাড়িতে। অনেক দেন দরবার হলো, শেষে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটা কমিটি করে দেওয়া হলো। ঐ সিনিয়র ভাই, আর.এম.ও আর আমি। তিনজনের পক্ষে আমাকে সিগনেচার করতে হবে। শেষ পর্যন্ত তাই হলো। আমি গুরুতর আঘাতের পক্ষে স্বাক্ষর দিতে বাধ্য হলাম। কিন্তু এই মন থেকে এই আপোষ পছন্দ করতে পারলাম না।

ছুটি নিয়ে ঢাকায় চলে এলাম। দিন রাত চিন্তা করতে লাগলাম কি করা যায়। হিতৈষী বড় ভাই, বন্ধুদের সাথে দীর্ঘ বৈঠক করলাম। তারা আমাকে ধৈর্য ধরতে বললেন। আমার মন বললো, এই চাকুরি ছেড়ে দাও। আমি ছেড়ে দিলাম। আমার আর সরকারি চাকরি করা হলো না।

এর কিছুদিন পর হঠাৎ পত্রিকায় দেখি, মটর সাইকেল দূর্ঘটনায় ঐ জননেতা মারা গেছেন। না, আমি কখনোই তার অমঙ্গল কামনা করিনি, মৃত্যু তো নয়ই।

খোদ ঢাকা শহরে, ঢাকা মেডিকেল কলেজে, নিজের মেডিকেল কলেজে যখন কোন চিকিৎসককে জানালার কাঁচ ভেঙে সেই কাঁচ দিয়ে আঘাত করা হয়, থানা বা ইউনিয়ন সাব-সেন্টারে কর্মরতদের কি করা হবে? কি নিরাপত্তা আছে? জবাব পাওয়ার জন্য বোদ্ধা হবার প্রয়োজন নেই।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত