১০ ডিসেম্বর, ২০২০ ০৯:০৬ পিএম
বর্ষপূর্তিতে কণ্ঠে উদ্দীপনার সুর 

৩৯ এর চিকিৎসকদের কল্যাণে স্বাস্থ্যসেবায় নতুন মাত্রা

৩৯ এর চিকিৎসকদের কল্যাণে স্বাস্থ্যসেবায় নতুন মাত্রা
কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকদের বর্ষপূর্তি উদযাপন। ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

মো. মনির উদ্দিন: ৩৯তম বিশেষ বিসিএসে নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসকদের চাকরিতে এক বছর পূর্ণ হলো গত আট ডিসেম্বর। তরুণ এ চিকিৎসকদের ছোঁয়ায় দেশের স্বাস্থ্যসেবায় লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। বৈশ্বিক সংকট করোনা পরিস্থিতি সামালে মফস্বল এলাকাগুলোতে আন্তরিক ও দুঃসাহসী ভূমিকা রেখে চলেছেন তারা।

তবে উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা আরও গতিশীল করতে মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের দাবি তাদের। একই সঙ্গে দাবি জানিয়েছেন দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রকৃত চিকিৎসা নিশ্চিতে প্রতিটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে, ইসিজি ও আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি স্থাপনের।

অন্যদিকে নিজের জীবন বাজি রেখে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাওয়া এ সম্মুখযোদ্ধাদের চাওয়া একটুখানি উৎসাহ-উদ্দীপনা। এ ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বোঝাপড়াতেই সন্তুষ্টি খুঁজতে চান ৩৯তম বিসিএসের তরুণ চিকিৎসকরা।

একটি বছরে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশালের হিজলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. ইকরাম হোসেন মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এ হিসাব অনেক জটিল, এটা মেলানো যায় না। অপ্রাপ্তি থাকবে, এটা নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের স্বাস্থ্য খাত বরাবরই অগোছালো। এ অবস্থার মধ্যে প্রাপ্তি খুঁজতে চাইলে ধীরে ধীরে অগোছালো অবস্থা ঠিক করতে হবে। যতখানি পারা যায়, ততখানিই প্রাপ্তি। সেটা অবশ্য অনেকাংশে ঠিক হয়ে এসেছে। পেরিফেরিতে এখন কাজের পরিবেশ আগের চেয়ে অনেক ভালো। এক ঝাঁক নতুন চিকিৎসকের সংগ্রাম, অন্যদিকে বড় ধরনের কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। 

ফ্রন্টলাইনারদের উজ্জীবিত রাখার আহ্বান 

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, করোনার সময়ে ফ্রন্টলাইনার চিকিৎসকদের উজ্জীবিত রাখা জরুরি। এটা সব সময় টাকা দিয়ে হতে হবে তা না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রতিশ্রুতিশীল একটি ভালো বোঝাপড়াই এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট। উৎসাহ-উদ্দীপনা ও মূল্যায়নের মাধ্যমে এটা সম্ভব। এতে কাজে আগ্রহটা বাড়বে। এখনও তা চলছে, তবে তা চলছে নিজস্ব মনোবলে। একাত্তর সালে মুক্তিযোদ্ধারা যতটা না নিজের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তার চেয়ে বেশি উজ্জীবিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর জন্য। এ রকম একটি উজ্জীবনী শক্তি চিকিৎসকদের জন্য খুব দরকার। 

রোগীরা মাস্ক না পরায় ঝুঁকিতে চিকিৎসকরা 

করোনা পরিস্থিতিতে পেরিফেরির চিকিৎসকরা সর্বাধিক ঝুঁকিতে আছেন জানিয়ে তিনি বলেন, সকাল আটটা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত মাত্র একটি সার্জিকেল মাস্ক পরেই দায়িত্ব পালন করতে হয়। ইনডোরে প্রচুর জ্বরের রোগী ভর্তি আছে, পুরোপুরি অরক্ষিত অবস্থায় আমরা সকাল-বিকাল রাউন্ড দিচ্ছি। সরকার এটা নিয়ে কাজ করছে। এ ব্যাপারে জনগণের সচেতনতা জরুরি। নো মাস্ক, নো সার্ভিস বললেও অতটা কঠোর হচ্ছি না আমরা। সাধারণ মানুষ হাসপাতালে বা জনসমক্ষে মাস্ক পরে গেলেই সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।

এ প্রসঙ্গে লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা উপজেলার মেডিকেল অফিসার ডা. হিরন্ময় বর্মণ সাগর মেডিভয়েস বলেন, রোগীরা কোভিডকে পাত্তাই দিচ্ছে না। তারা মাস্ক ছাড়াই আসে। আমরা বারবার বলি, সরকারের নীতি হলো: নো মাস্ক—নো সার্ভিস। সেটাকেও আমলে নিচ্ছে না। এখানকার প্রশাসন অনেক সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। পুলিশ, ইউএনও বা স্থানীয় প্রতিনিধিসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সবাই বেশ আন্তরিক।

সংকট পুরোপুরি কাটেনি

তিনি বলেন, ৩৯ এর নিয়োগে চিকিৎসকদের ঘাটতি কিছুটা দূর হলেও এখনো এ সংকট পুরোপুরি কাটেনি। এ কারণে কখনো কখনো আমাদের ১২ ঘণ্টা বা তার চেয়েও বেশি সময় ডিউটি করতে হয়। তবে এ নিয়োগের ফলে দেশের স্বাস্থ্যখাতে অনেক গতি সঞ্চার হয়েছে। রোগীরা যে হাসপাতালে এসে ডাক্তার পেতেন না, তা দূর হয়েছে। হাতিবান্ধায় আউটডোরে চারটি কর্নার আছে। পর্যাপ্ত সরঞ্জামাদি না থাকলেও ডেন্টাল সার্জন নিজ দায়িত্বে তা এনে স্বাস্থ্যসেবা চালিয়ে যাচ্ছেন। রোস্টার ডিউটি অনুসারে ইমার্জেন্সিতে ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসা সেবা অব্যাহত আছে। ৫০ শয্যার এ হাসপাতালে পাঁচটি আইসোলেশন শয্যাও রয়েছে। 

চিকিৎসকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ইউএইচএফপিও ইসিজি মেশিন ও গ্লুকোমিটারসহ বেশ কিছু মৌলিক সরঞ্জাম জোগাড় করে দিয়েছেন বলেও জানান তিনি। 

হাসপাতালে চিকিৎসক না থাকার মতো নেতিবাচক ধারণা জনমন থেকে দূর হয়েছে জানিয়ে ডা. সাগর বলেন, ‘এ কারণে জনগণ বেশ স্বস্তিতে আছেন।’

পূর্ণাঙ্গ সেবা থেকে বঞ্চিত রোগীরা

জানতে চাইলে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার ডা. মিয়া মোহাম্মদ মামুন মেডিভয়েসকে বলেন, ‘জনগণ ও রাষ্ট্র মনে করে এখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক আছে। কিন্তু তাতেই তো সব কিছু হয়ে যায় না। কারণ স্বাস্থ্যসেবা পদ্ধতিটা একটি টিম ওয়ার্ক। উপজেলা পর্যায়ে ওই টিমটা এখনো পূর্ণতা পায়নি। সংখ্যায় কম হলেও নার্সরাও আছেন, কিন্তু প্রয়োজনের আলোকে মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, কার্ডিওগ্রাফারের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর জনবলের ঘাটতির কারণে আমরা চাইলেই পূর্ণ স্বাস্থ্যসেবাটা দিতে পারছি না। এ কারণে জনগণ প্রকৃত সেবাটা পাচ্ছে না। রোগীদের কয়েকটি ওষুধের নাম লিখে দিলেই তো পরিপূর্ণ সেবা হয়ে যায় না। প্রকৃত রোগটা ধরার জন্য ডায়াগনোসিসের প্রয়োজন। কিছু পরীক্ষা দরকার হয়, যা এখানে নিশ্চিত হয় না। অনেক সময় আল্ট্রাসনোগ্রাম করা যায় না। হাসপাতালে পরীক্ষাগুলো না হওয়ার কারণে দালালরা নিম্নবধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত পরিবারের রোগীদের বাইরে নিয়ে যায়। এখানে সবগুলো পরীক্ষা করা গেলে ৫/৬শ’ টাকার মধ্যে ৩/৪টি পরীক্ষা করা সম্ভব হতো। কিন্তু এক্স-রে, ইসিজি ও আল্ট্রাসনোগ্রাম বাইরে করার কারণে জনগণের অনেক টাকা খরচ হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘তবে আশার কথা হলো, আগে তো আমাদের এখানে মাত্র দুই-তিনজন ডাক্তার ছিলেন; এখন একজন ডেন্টাল সার্জনসহ ১৭ জন ডাক্তার যোগদান করেছেন। এর ফলে রোগীরা নিয়মিত আউটডোরে সেবা পাচ্ছে; একই সঙ্গে পাচ্ছে ইমার্জেন্সি ও ইনডোরেও। চিকিৎসকদের যতটুকু সম্ভব তার সবটুকুই দেওয়ার চেষ্টা চলছে যেন রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবাটা দেওয়া যায়।’

তবে করোনার চিকিৎসায় নানা সীমাবদ্ধতা ও উল্লেখযোগ্য কোনো স্বীকৃতি না জোটায় অভিমানের সুর ঝরল তরুণ এ চিকিৎসকের কণ্ঠে। ডা. মিয়া মোহাম্মদ মামুন বলেন, ‘প্রণোদনাসহ কোনো স্বীকৃতি না মিললেও করোনার সময় আমরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করেছি, এখনো করে যাচ্ছি এবং ভবিষ্যতেও এ আন্তরিকতা অব্যাহত থাকবে। এছাড়া প্রণোদনা দিলেই যে আমরা কাজ করবো বিষয়টি তাও না।’

স্বাস্থ্যসেবায় ব্যাপক পরিবর্তন

৩৯তম বিসিএসের চিকিৎসকদের স্বাস্থ্যসেবা মূল্যায়ন করতে গিয়ে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচএফপিও) ডা. অসীম কুমার দাস মেডিভয়েসকে বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতিসহ সার্বিক চিকিৎসায় আমার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এই চিকিৎসকদের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। করোনায় তারা নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। কাজের বিষয়ে প্রতিটি সুযোগের সর্বোচ্চ সৎব্যবহার করেছেন তারা। তাদের নিয়োগের মধ্য দিয়ে আমার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সেবায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তারা এটা উপভোগও করছে।’

জনবলের অভাবে পড়ে আছে যন্ত্রপাতি

তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী ও বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমার এখানে রক্তের অনেকগুলো পরীক্ষা এবং ডায়াবেটিস ও ইসিজিসহ রুটিন চেকআপগুলো হয়। এখানে ইসিজি সেবা চলে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা, যা অন্য কোনো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ রকম করে নাই। এর খরচ ৮০ টাকা, তবে গরিবদের বিনামূল্যে করে দেওয়া হয়। আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন থাকলেও জায়গার স্বল্পতার জন্য এখনো বসানো যায়নি। আগামী দুই মাসের মধ্যে নতুন ভবনে গেলে এক্সরে ও জিন এক্সপার্ট মেশিন সংযোজনের পাশাপাশি আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনও চালু হয়ে যাবে।

একজন ইউএইচএফপিওর ইচ্ছা থাকলে এগুলো চালানো সম্ভব উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে এ যন্ত্রপাতিগুলো আছে। তবে দক্ষ জনবলের অভাবে কোথাও কোথাও পড়ে আছে অকার্যকর অবস্থায়। ডেপুটেশনে থাকা ব্যক্তিদের নিজ কর্মস্থলে ফেরানো হলেও এ সংকট দূর হবে।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : ৩৯তম বিসিএস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক