২৪ মার্চ, ২০২১ ১০:০৬ পিএম

যেভাবে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন ডা. আল মামুন

যেভাবে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন ডা. আল মামুন
গুরুতর আহত ডা. আল মামুন। ছবি: সংগৃহীত

আবু নাঈম মনির: ছিনতাইকারীদের পাশবিক নির্যাতনে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন ৩৯তম বিসিএসের ডা. আল মামুন। মূল সড়কে চলমান মাইক্রোবাসের ভেতরে হাত-পা বেঁধে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী তাঁকে নির্যাতন চালানো হয়। যানজটে আটকে থাকার পাশাপাশি একাধিক ট্রাফিক সিগন্যাল অতিক্রম করে বাহনটি। তবে এ সময়ের মধ্যে বিষয়টি কারও নজরে না আসায় বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি।

মৃত্যু থেকে ফেরত আসা নবীন এ চিকিৎসক বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা কিছুটা ভালো। 

আগের চেয়ে কিছুটা ভালো আছেন জানিয়ে মঙ্গলবার (২৩ মার্চ) রাতে মেডিভয়েসকে তিনি বলেন, ব্যথা কিছুটা কমেছে। কিন্তু চোখের সমস্যাটা (রক্তজমাট) এখনো সারেনি। তবে চোখে এখন ব্যথা নাই। মুখে-চোয়ালে ব্যথা আছে। বুকে ব্যথা আছে। ঢুক গেলার সময় গলায় ব্যথা অনুভূত হয়। পায়ে অনেক আঘাত করা হয়েছে, এ ব্যথাটা আছে। সামগ্রিকভাবে কিছুটা কমলেও ব্যথা আছে। ওষুধ সেবন চলছে।

যেভাবে পথ হারান ডা. মামুন 

ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ার ওই লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘শুক্রবার (১৯ মার্চ) আমার বিসিএস পরীক্ষা ছিল। জেনারেল ক্যাডারে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ঢাকা আসছিলাম। বৃহস্পতিবার কাজ সেরে সাড়ে চারটার দিকে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর থেকে রওয়ানা দিই। সিএনজি করে আধাঘণ্টায় অ্যালেঙ্গায় আসি। উত্তরবঙ্গ থেকে হানিফ-শ্যামলী পরিবহনের যেসব বাস আসে সেগুলো করেই সাধারণত ঢাকা আসি। বৃহস্পতিবার ঢাকাগামী বাসগুলোতে যাত্রীদের বেশি চাপ থাকে। এ কারণে সিটও থাকে কম। তবুও বাসের অপেক্ষায় ছিলাম।’

‘এর মধ্যে একটি মাইক্রোবাস আসে। ড্রাইভারসহ চার জন ছিল। সবাইকে যাত্রী মনে করেছিলাম। ওরা জানতে চায়, আমি কোথায় যাবো? বললাম, ঢাকা যাবো; তবে বাসে, আপনারা চলে যান। তারা বলে, আমাদের সঙ্গে যেতে পারেন। আমরাও ঢাকা যাবো। যাত্রী নামিয়ে দিয়ে আসলাম। খালিই যাবো, আপনি চাইলে যেতে পারেন। পেছন থেকে একজন এসে বলে—চলেন, আমিও ঢাকা যাবো। আমি চন্দ্রায় নেমে যাবো। …আপনি ভেতরের দিকে বসেন, আমি জানালার পাশে বসি। কি মনে করে যেন উঠে পড়লাম। ভাবলাম, তাড়াতাড়ি যাওয়া যাবে—যেহেতু যাত্রী পূর্ণ হয়ে গেলো। রাস্তায় আর থামবে না’, যোগ করেন ডা. মামুন।

তিনি বলেন, ‘আমি ড্রাইভারকে বললাম—ভাই, একটু আস্তে-ধীরে যান। যেহেতু ছোট গাড়ি, মূল সড়কে বড় বাসের ভিড়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। বললো, অসুবিধা হবে না, আস্তেই যাবো। টেনশন করবেন না।’

ক্লান্ত থাকায় কিছুক্ষণ পর ঘুমিয়ে পড়েছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আগের দিন রাতে ডিউটি করেছি। এর পর দিনে ডিউটি করেছি। খুব চাপ গেছে। এ কারণে কিছুক্ষণ পর ঘুমিয়ে পড়ি। আনুমানিক ২০-২৫ মিনিট পর আমার পায়ের সঙ্গে হাত বেঁধে ফেলে তারা। এর মধ্যে আমার ঘুম ভেঙে যায়। তারা জানায়, টাকার জন্য আমাকে জিম্মি করেছে। ছুরিসহ দেশীয় বিভিন্ন অস্ত্র দেখিয়ে বলে, চিৎকার করবেন না। তাহলে মেরে ফেলবো। কোনো রকম চালাকি করবেন না, যা আছে তাই নেবো। টাকার জন্য ধরেছি। টাকা পেলে ছেড়ে দেবো। এই বলে মানিব্যাগ, টাকা-পয়সা সবই নিয়ে নেয়। এটিএম কার্ড নিলো—পাসওয়ার্ড চাইলো, বিকাশের পাসওয়ার্ড জিজ্ঞাসা করলো। তবে সঠিকটা দিইনি।’

এ সময় পেশাসহ ডা. মামুনের বিস্তারিত পরিচয় জানতে চায় ছিনতাইকারী। এর পর তার কাছে চার লাখ টাকা দাবি করে বসে। জানায়, টাকা পেলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, ‘আমি ডাক্তার মানুষ, সবেমাত্র চাকরিতে যোগ দিয়েছি। আমার কাছে এতো টাকা নাই। তখন তারা বাসা থেকে ব্যবস্থা করে দিতে বলে। বাবা ও স্ত্রীকে ফোন দেওয়ার চাপ দিয়ে বলে, ডাক্তার মানুষ টাকা তো থাকবেই। সন্ধ্যার মধ্যে টাকার ব্যবস্থা করো।’

শুরু হয় নির্যাতন 

এরই মধ্যে তারা চোখ বেঁধে ফেলে। তাঁকে কালো একটি চশমা পরিয়ে দেওয়া হয়। ফলে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না তিনি।

পরে বাড়িতে ফোন দিতে চোখ খুলে দেওয়ার অনুরোধ করেন ডা. মামুন। এর মধ্যে রাস্তায় একটু যানজট লাগলে চিৎকার শুরু করেন তিনি। 

তিনি বলেন, ‘এক পর্যায়ে দেখলাম, রাস্তায় যানজট লেগেছে এবং ট্রাফিক পুলিশও আছে সামনে। এ সময় বাঁচাও, বাঁচাও বলে চিৎকার করি। তখন ছিনতাইকারীরা গ্লাসগুলো উঠিয়ে দিয়ে দ্রুত গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেয়। হয় তো কেউ শুনেছে, কিন্তু কেউ সাড়া দেয়নি।’

‘সঙ্গে সঙ্গে তারা আমার গলা বেঁধে ফেলে। প্রচণ্ড মার-ধর শুরু করে। মুখে অনবরত কিল-ঘুষি মারতে থাকে। প্রায় আধাঘণ্টা ধরে পেটাতে থাকে। এতে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই।’

কিছুক্ষণ পর ছিনতাইকারীরা বাম দিকে একটি রাস্তায় ঢুকে পরে, যা বনের ভেতরে চলে গেছে। এটি গাজীপুর সীমান্তে পরেছে। সন্ধ্যার পর ওই রাস্তায় তেমন যাতায়াত হয় না। তখন মাগরিব ঘনিয়ে আসে। সামনে সম্ভবত তাদেরই আরেকটি গাড়ি ছিল, যা স্পষ্ট দেখতে পান ডা. মামুন।

তবে তখনও তাদের এলোপাথারি কিল-ঘুষি অব্যাহত ছিল। আঘাতের কারণে তাঁর মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। এক পর্যায়ে তিনি শক্তিহীন হয়ে যান, একদম মুমূর্ষু অবস্থা।

মারা যেতে পারেন—এমন আশঙ্কায় তাকে ফেলে যেতে চায় ছিনতাইকারীরা। 

ডা. মামুন বলেন, ‘তারা বলাবলি করতে থাকে, ডাক্তার মানুষ রাস্তায় ফেলে দেই, মানুষ কিছুক্ষণ পরে এসে নিয়ে যাবে। আরেকজন বলছে, ওরে মেরে ফেলি। ডাক্তার মানুষ, বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ আছে। পরে ধরিয়ে দিতে পারে। আরেকজন বলে, ওরে তো সহজ-সরলই মনে হলো, নতুন চাকরিতে জয়েন করেছে, ওর বাপ কষ্ট করে পড়িয়েছে। অত ধনী মানুষ না। রাস্তার পাড়ে এক জায়গায় হাত-পা বেঁধে রেখে দিই, লোকজন নিয়ে চিকিৎসা করাবে।’

এর পর তাকে নিয়ে ময়নমসিংহের ভালুকায় চলে যায় ছিনতাইকারীরা। ঘণ্টা দেড়েকের ব্যবধানে টাঙ্গাইল থেকে ভালুকা পর্যন্ত পথ পাড়ি দেয় তারা। 

সেখানে হাজি বাজারের কাছে বাসস্ট্যান্ডের একটু আগে দু-হাত বেঁধে রাস্তার পাড়ে ডা. মামুনকে ঝোপের মাঝে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। ওরা চলে যাওয়ার ১০-১৫ মিনিট পর হাতের বাঁধন খুলে সেখান থেকে রাস্তার পাশে আসেন তিনি। তখনও দাঁড়াতে পারছিলেন না।

যেভাবে বেঁচে যান 

রাত পৌনে আটটার দিকে ওই সড়কে চলাচলরত ছোট গাড়িতে থাকা কিছু মানুষ তাকে দেখে গাড়ি থামিয়ে দেয়। ওই গাড়ির ড্রাইভার ঘটনা জানতে চান, পরে তাঁকে হাজি বাজারে নিয়ে যাওয়া হয়। 

ডা. মামুন বলেন, ‘ওখান থেকে বাড়িতে কথা বলি। এ সময় বাড়ি থেকে বিকাশে টাকা-পয়সা নিই। পরে স্থানীয়রা বাইকে করে আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তারা আমাকে ঢাকা যাওয়ার জন্য পরিচিত প্রাইভেটকারের ব্যবস্থা করে দেয়।’

সঙ্গীবিহীন যাত্রীকে লক্ষ্য বানায় ছিনতাইকারীরা!

চক্রটি আপনাকে কেন লক্ষ্য বানালো—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়েছে, ওরা আমাকে টার্গেট করেনি। ওরা কোনো যাত্রী পেলেই লক্ষ্যে পরিণত করে। তারা তো মূলত একজন যাত্রীই নেবে। বাকিরা তো তাদেরই। যাকে পাবে তাকেই নেবে। পরে তার কাছে কিছু পেলে নেয়, না হয় পরিবার থেকে মুক্তিপণ আদায় করে। তাদের কথা শুনে তাই মনে হয়েছে। তাদের সবার বয়স ৩৫-৪০ বছরের মধ্যে হবে।’

ঘণ্টা দেড়েক সময়ের মধ্যে কারও নজরে না পড়ার বিষয়টি কিভাবে দেখেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওরা তো আমাকে নিয়ে কোথাও দেরি করেনি। তবে আমার মনে মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এত দূর আসলাম, কিন্তু কোনো একটি সিগন্যালেও তাদের ধরা হলো না। কোনো একটি জায়গায়ও গাড়ি থামানো হয়নি। তারা আমাকে বলেছে, তোমাকে যে উঠিয়েছি, তুমি কি মনে করো যে আমাদের পরিচিত (প্রভাবশালী) নাই? এখানে প্রশাসন জড়িত আছে, সবাই জড়িত আছে। ওরা তাই বলছিল। তবে আমার কাছে তা মনে হয় না। আমার কাছে মনে হয়েছে, ওরা মাঝে মাঝেই এমনটি করে…।’

লোমহর্ষক এ ঘটনার জন্য আইনের দ্বারস্থ হয়েছেন কিনা—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মামলা করবো। বিষয়টি নিয়ে কালিহাতি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। কথা-বার্তায় বেশ ভালো ও সহায়ক মানুষ হয়েছে তাঁকে। বিষয়টি খতিয়ে জানতে পেরে তিনি এরই মধ্যে অনেক জায়গায় ফোন দিয়ে করেছেন। আমাদের মানিকগঞ্জে তাঁর প্রথম পদায়ন হয়েছিল। সুস্থ হয়ে যোগাযোগ করতে বলেছেন তিনি। যতটুকু সম্ভব তার সবটুকু করার বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন তিনি।’

এক নজরে ডা. আল মামুন 

ডা. মামুন টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন। 

মানিকগঞ্জের স্থানীয় একটি স্কুল থেকে এসএসসি এবং রাজধানীর ক্যামব্রিয়ান কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন তিনি। পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ (এফএমসি) থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন ডা. মামুন।

 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : ৩৯তম বিসিএস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক