প্রতি উপজেলায় মেডিকেল কলেজ চাওয়া কতটা যৌক্তিক, প্রশ্ন প্রতিমন্ত্রীর
মেডিভয়েস রিপোর্ট: রেফারেল ব্যবস্থা কার্যকর হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মতো তৃতীয় স্তরের হাসপাতালের রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম. এ. মুহিত।
এ সময় চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, 'রেফারেল সিস্টেমে ৮০ শতাংশ রোগী উপজেলায় চলে যাবে। কিন্তু সঙ্গে আপনারাও কি যাবেন?'
আজ শনিবার (১১ জুলাই) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ঢামেকের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কলেজ ক্যাম্পাসের শহীদ মিলন চত্বরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. মুহিত বলেন, সবাই সবকিছু চাইলে হবে না। প্রতিটি উপজেলায় মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবি কতটা যৌক্তিক, সে প্রশ্নও তুলতে হবে। সাধারণ মানুষ হয়তো মনে করেন, মেডিকেল কলেজ মানেই বড় হাসপাতাল। কিন্তু চিকিৎসকদেরই বোঝাতে হবে যে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের আলাদা উদ্দেশ্য ও দায়িত্ব রয়েছে। আন্ডারগ্র্যাজুয়েট শিক্ষা, পোস্টগ্র্যাজুয়েট প্রশিক্ষণ এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা; সবকিছুকে এক জায়গায় এনে জটিলতা তৈরি করা ঠিক নয়।
তিনি বলেন, 'আমরা অনেক সময় মেডিকেল কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় বানাতে চাই। কিন্তু কোন প্রতিষ্ঠানের কী ভূমিকা, সেটি ঠিক রাখতে হবে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ আজ যে চিন্তা করবে, অন্য মেডিকেল কলেজগুলোও তা অনুসরণ করবে। তাই আবেগ দিয়ে নয়, যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।'
চিকিৎসা শিক্ষার বর্তমান কাঠামো নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আগে পোস্টগ্র্যাজুয়েট প্রশিক্ষণের জন্য আলাদা ব্যবস্থা ছিল। বিসিপিএস থেকে এফসিপিএস এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমডি-এমএস পরিচালিত হতো। পরে সেই প্রশিক্ষণও আন্ডারগ্র্যাজুয়েট শিক্ষাকেন্দ্রিক মেডিকেল কলেজে নিয়ে আসায় প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপ, দুই ক্ষেত্রেই চাপ বেড়েছে।
তিনি বলেন, এখন পোস্টগ্র্যাজুয়েট প্রশিক্ষণার্থী ও ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মধ্যে প্রশিক্ষণের সুযোগ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। তবে কেউ কারও প্রতিপক্ষ নন। পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার কথা বিবেচনা করে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
রোগীর চাপ কমাতে রেফারেল ব্যবস্থা শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়ে ড. মুহিত বলেন, 'আপনারাই বলেন, রেফারেল নেটওয়ার্ক না থাকায় ঢাকা মেডিকেল ওভারলোডেড। চিকিৎসকেরা দ্বিগুণ-তিনগুণ পরিশ্রম করছেন। রেফারেল ব্যবস্থা চালু হলে ৮০ শতাংশ রোগী উপজেলা হাসপাতালেই চিকিৎসা পাবে। তখন প্রশ্ন হচ্ছে, আপনারা কি সেখানে গিয়ে সেবা দেবেন?'
তিনি বলেন, সরকার উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে আরও শক্তিশালী করছে। হাসপাতাল নির্মাণ, ওষুধ সরবরাহসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন সরকার করতে পারবে কিন্তু চিকিৎসাসেবা দিতে হবে চিকিৎসকদেরই।
চিকিৎসকদের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, 'আমরা গাছের আগাটাও চাই, তলাটাও চাই; এভাবে হবে না। বাংলাদেশ সীমিত সম্পদের দেশ। শুধু ভবন নির্মাণ বা পদ সৃষ্টি করলেই হবে না, চিকিৎসকদেরও যেখানে প্রয়োজন সেখানে যেতে হবে।'
উপজেলায় কর্মস্থল নিয়ে নেতিবাচক ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, 'একসময় উপজেলা মানেই গ্রাম মনে করা হতো। কিন্তু এখন বাংলাদেশের কোনো উপজেলা আর সেই অর্থে গ্রাম নয়। সেখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। তাই উপজেলা পর্যায়ে কাজ করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে।'
বক্তব্যের শেষে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান প্রতিমন্ত্রী ড. এমএ মুহিত। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ. জেড. এম. জাহিদ হোসেন, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. এম. এ. মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস. এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার এবং প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
এ ছাড়া আরও উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদ, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস প্রমূখ।
এমআই/