১৫ মে, ২০২৬ ০৪:২৮ পিএম

‘গেস্ট রুম’ তৈরির নামে ডিডিসিতে শিক্ষার্থীদের কক্ষে ভাঙচুরের অভিযোগ, প্রতিবাদের জেরে হাতাহাতি

‘গেস্ট রুম’ তৈরির নামে ডিডিসিতে শিক্ষার্থীদের কক্ষে ভাঙচুরের অভিযোগ, প্রতিবাদের জেরে হাতাহাতি
ছবি: সংগৃহীত ও সম্পাদিত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ঢাকা ডেন্টাল কলেজে (ডিডিসি) গেস্ট রুম তৈরির জন্য জায়গা করে দেওয়ার নামে কিছু শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ছাত্রাবাসের ১১৬ নম্বর রুমের তালা ভেঙে তিন শিক্ষার্থীর জিনিসপত্র তছনছ ও রুম দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। গতকাল বুধবার (১৩ মে) দুপুর ৩টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। প্রশাসনের নির্দেশে এটি করা হয়েছে দাবি করা হলেও কোনো ছাত্রদের এ রকম দায়িত্ব দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন হল সুপার ও কলেজ অধ্যক্ষ।

এ নিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ করায় বৃহস্পতিবার (১৪ মে) ঢাকা ডেন্টালের ওই রুমের তিন শিক্ষার্থীর সঙ্গে হাতাহাতিতে জড়ায় একাধিক জুনিয়র শিক্ষার্থী। ভাঙচুর ও হাতাহাতিতে জড়িতরা ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের সমর্থক বলে জানা গেছে।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা হলেন ডিডিসি ৬১ ব্যাচের রায়হানুল ইসলাম, মোন্তাকিম ও তানজিম ওভি। অন্যদিকে অভিযোগের মুখে থাকা শিক্ষার্থীরা হলেন ৫৮ ব্যাচের আবরার জাওয়াদ, মৃণাল কান্তা রায়, অর্ণব সাহা ও সামিউল্লাহ্ অনিক।

শিক্ষার্থী ও প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, হলে রুমের তালা ভেঙে অনুপ্রবেশ ও রুম তল্লাশির অভিযোগ করে অধ্যক্ষের কাছে সুরক্ষা ও আবাসন নিশ্চিতের আবেদন করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী রায়হানুল ইসলাম, মোন্তাকিম ও তানজিম ওভি। 

এতে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তারা বলেন, ‘বুধবার (১৩ মে) দুপুর ৩.১৫ মিনিটে আমার ব্যাচের মনিটর ফোনে জানতে চায়, কোথায় আছিস? ৫ মিনিটের মধ্যে রুমে আয় (রুম নং-১১৬)। বললাম যে আমি তো দূরে আছি, আসতে আসতে বিকাল বা সন্ধ্যা হবে। তখন সে আমাকে বললো, তোরা কেউ না আসলে তালা ভেঙে রুমে ঢোকা হবে। আমি কারণ জানতে চাইলে সে বললো, উপরের নির্দেশ আছে দ্রুত আসতে। আমি বললাম, আমার আসতে রাত হবে। আমার রুমমেটও বাইরে ছিল তারও দেরি হবে। এরপর পাশের রুমের ব্যাচমেটদের থেকে জানতে পারলাম যে, আমাদের রুমের তালা ভেঙে ভেতরে ঢোকা হয়েছে। কারা করেছে জানতে চাইলে বলে, ডি-৫৮ ব্যাচের জাওয়াদ ভাই, অর্ণব ভাই এদের কথা বলা হলো, তারপর সন্ধ্যায় আমি এসে দেখি, আমার রুমের জিনিসপত্র অগোছালো করে রাখা হইছে। কয়েকটি ব্যাগ ছিল ওগুলোও নিচে ফেলে দিছে, আবার রাতে ব্যাচ মনিটর সিফাত এসে হুমকি দিয়ে গেল যে, রাতের মধ্যে রুম না ছাড়লে সকালে ৫৮ ব্যাচের ভাইরা এসে সব বের করে দিবে।’

‘পরবর্তীতে সহকারী হল সুপারকে জানানো হলে তিনি এই ঘটনা সম্পর্কে অবহিত নন বলে জানান এবং সকালে দেখা করতে বলেন। সকালে দেখা করতে গেলে তিনি পুরো ঘটনা শুনে আমাদের রুমকে গেস্ট রুম করার বিষয়ে তার পরিকল্পনার কথা জানান এবং নোটিশ না পাওয়া পর্যন্ত রুম না ছাড়ার কথা বলেন। তালা ভেঙে ঢোকার জন্য আমাদেরকে হল সুপার মামুন স্যারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন। হল সুপার তখন কলেজে ছিলেন না তিনি রোববার আসবে বলে জানান। এবং সে আলোকে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নিবেন বলে জানান। এমতাবস্থায় আমরা আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত এটা বলার পর তিনি আমাদের আশস্ত করেন যে এমন কিছু আর হবে না’—বলা হয় আবেদনে।

এ ঘটনা নিয়ে হল সুপারে কাছে করা অভিযোগপত্রে শিক্ষার্থী বলেন, ‘গত ১৩ মে ২০২৬ বুধবার দুপুর ৩টা নাগাদ মিরপুর ছাত্রাবাসের ১১৬ নম্বর রুমের তালা ভেঙে ভিতরের জিনিসপত্র তছনছ ও তল্লাশি করে সোবহানবাগ ছাত্রাবাস থেকে আগত কিছু শিক্ষার্থী। তারা জানায়, গেস্টরুম তৈরি করার উদ্দেশ্যে এ কাজটি হল সুপারের নির্দেশে করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন ৫৮ ব্যাচের চার শিক্ষার্থী।’

যা বললেন ঢাকা ডেন্টালের অধ্যক্ষ

জানতে চাইলে ঢাকা ডেন্টাল কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) ডা. মো. আব্দুল আওয়াল বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে অবগত হয়েছি। হোস্টেল সুপারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছি। বিষয়টি সমাধানের জন্য রোববার পর্যন্ত সময় বেধে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা তাদের সাথে দেখা করতে এলে বসার জায়গা দিতে পারে না। সেই পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকজন শিক্ষার্থী ওই রুমকে গেস্টরুম করার আবেদন জানিয়েছে। সেখানে বর্তমানে যারা রয়েছে প্রয়োজনে তাদের অন্যরুমে স্থানান্তর করা হবে।’

নতুন বাংলাদেশে পুনরায় গেস্টরুম-গণরুম প্রথা চালু হবে কি-না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই রুমটা ছাত্রদের থাকার জন্য বরাদ্দ ছিল না। এটি হোস্টেলের জিমনেশিয়াম ছিল। প্রথম বর্ষের পরীক্ষা চলাকালে কয়েকজন ছাত্রের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এটিকে বসবাসযোগ্য করা হয়।’

জানতে চাইলে সহকারী হোস্টেল সুপার ডা. আতিক মাহমুদ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের পরিবারের নারী সদস্যরা তাদের সাথে দেখা করতে এলে হোস্টেলের ভিতরে ঢুকে পড়তো। এটি যেহেতেু ছাত্র হোস্টেল, তাই বিষয়টি বিব্রতকর। এর পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকজন ছাত্র গেস্টরুম চালুর আবেদন করে। সবদিক বিবেচনা করে আমরা একটি গেস্টরুম চালুর সিদ্ধান্ত নিই। পূর্বে এই রুমটা গেস্টরুম এবং জিমনেশিয়াম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। প্রথম বর্ষের পরীক্ষা চলাকালে কয়েকজন ছাত্রের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এখানে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। তবে এটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আজকে ওই রুমের শিক্ষার্থীরা আমাকে বললো, স্যার কয়েকজন আমাদের রুমে এসে রুম থেকে বের হয়ে যেতে বলেছে। আমি তাদের বলেছি, আমরা এ রকম একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু সেটা তোমাদের নোটিশের মাধ্যমে জানানো হবে, এভাবে না।’

পরে বিষয়টি সমাধান করতে উভয় পক্ষের শিক্ষার্থীদের নিয়ে বসেছেন জানিয়ে ডা. আতিক মাহমুদ বলেন, ‘এখানে দুই পক্ষেরই বক্তব্য হচ্ছে, আমাদের মধ্যে সামান্য ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে এবং ধস্তাধস্তির ঘটনাও ঘটেছে। আমি জানতে চেয়েছি, এখানে কারা জড়িত? তারা বলছে, আমরা নিজেরাই বিষয়টি সমাধান করে ফেলব।’

তিনি আরও বলেন, ‘অতিথিদের জন্য যে কক্ষ বরাদ্দ থাকবে, সেটি আমরা নির্দেশনা দেওয়ার পর কার্যকর হবে। এর আগে তা কার্যকর করার মতো কোনো সিদ্ধান্ত নেই। এ বিষয়ে আমরা বসব, শিক্ষকরা বসবেন। পরবর্তীতে নির্দেশনা জারি হলে তখন থেকেই অতিথিদের জন্য কক্ষ বরাদ্দ কার্যকর থাকবে।’

কলেজ কর্তৃপক্ষ ওই রুমের শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা জায়গায় সিট বরাদ্দ দিয়েছে বলেও জানান হোস্টেল সুপার।

তালা ভাঙার ঘটনায় তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থার আশ্বাস

এই ঘটনায় বিশেষ কোনো সংগঠনের হাত আছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি এসব বিষয়ে কিছু জানি না। রুমের তালা যারা ভেঙেছে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আর ওই রুমে থাকা শিক্ষার্থীদের বলা হয়েছে, তারা যেন তাদের সুবিধাজনক সময়ে বরাদ্দকৃত রুমে চলে যায়। গেস্টরুম চালুর বিষয়ে যেহেতু সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে, এখান থেকে সরে আসার সুযোগ নেই।’

জানতে চাইলে এই অভিযোগের মুখে থাকা অর্ণব সাহা মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমি এখন কথা বলতে চাচ্ছি না। আপনি হল সুপারের সঙ্গে এসে কথা বলেন। এটা তাঁর বিষয়, তিনি ঘোষণা দিবেন। প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেন, তাহলেই হবে। এ নিয়ে আমি এখন কথা বলবো না, বললেও পরে বলবো।’

আপনারা তালা ভেঙে ফেলেছেন, এমন অভিযোগ সত্য কিনা—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না এগুলো আমরা স্বীকার করছি না। আপনার সঙ্গে এ নিয়ে পরে কথা বলবো। আমি এখন ব্যস্ত আছি।’

এ ছাড়া অভিযোগের মুখে থাকা আরেক শিক্ষার্থী আবরারকে একাধিকবার চেষ্টা ফোনেও পাওয়া যায়নি। অন্য শিক্ষার্থী মৃণালের ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। আরেকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত