০৮ এপ্রিল, ২০২৬ ০৫:৫৬ পিএম
এনডিএফের সেমিনারে বক্তারা

বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা চর্চা ও সুশাসনই পারে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে গতিশীল করতে

বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা চর্চা ও সুশাসনই পারে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে গতিশীল করতে
ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: শুধু চিকিৎসা নয়, বরং সমন্বিত উদ্যোগ, বিজ্ঞানভিত্তিক চর্চা ও সুশাসনই স্বাস্থ্যসেবাকে গতিশীল ও কার্যকর করতে পারে বলে মত দিয়েছেন বিশিষ্টজনরা। এ ক্ষেত্রে বৈষম্যপূর্ণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা, আধুনিক জ্ঞানের সাথে তাল মেলাতে না পারা, অনির্ভরযোগ্য তথ্যের বিস্তার এবং বাজেট বাস্তবায়নের দুর্বলতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেন তারা। একই সঙ্গে টুগেদার ফর হেলথ, স্ট্যান্ড উইথ সায়েন্স, অর্থাৎ ‘স্বাস্থ্য সেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সকল প্রাণ’—এই বার্তার প্রতিফলন ঘটিয়ে মানুষ ও প্রাণীসহ পুরো বৈশ্বিক কমিউনিটির সম্মিলিত দায়িত্ববোধ ও আন্তরিক উদ্যোগ ছাড়া টেকসই স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা অসম্ভব বলে মনে করেন তারা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে আজ বুধবার (৮ এপ্রিল) রাজধানীর শাহবাগে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের অডিটোরিয়ামে ন্যাশনাল ডক্টর ফোরামের (এনডিএফ) সেমিনারে এসব কথা জানানো হয়।

প্রধান অতিথি ছিলেন ন্যাশনাল ডক্টর ফোরামের (এনডিএফ) সভাপতি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে সেমিনারে কি-নোট স্পিকার হিসেবে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তরুণ জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. কামারুদ্দিন মুজাক্কির।

প্যানালিস্ট হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএমইউর সদ্যসাবেক ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম, ইবনে সিনা মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. খোরশেদ আলী মিয়া, বিএমইউর ইন্টারনাল মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নাহিদুজ্জামান সাজ্জাদ ও এন্ডোক্রাইনলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হুরজাহান বানু।

অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বিশ্বে উল্লেখযোগ্য বৈষম্যপূর্ণ ব্যবস্থার একটি। এখানে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হন রোগীরা। কারণ তাদের ক্ষমতা নাই। তার পর বঞ্চিত জনগোষ্ঠী হলো মেডিকেল শিক্ষার্থীরা। ছাত্র বারবার অকৃতকার্য হচ্ছে। শিক্ষকের কোনো দায় নেই। কারও কাছে জবাবদিহি করতে হয় না।

‘এই অবস্থা উত্তরণে এমন একদল স্বাস্থ্যকর্মী দরকার, যারা শর্তহীনভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকবে। নিজের পাশাপাশি ভিন্ন মতের চিকিৎসকদেরও স্থান দেবে। ভিন্নমতে যোগ্য চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে যথাস্থানে জায়গা দেবে এবং তাকে সম্মান দেবে’—যোগ করেন তিনি।

এ সময় জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে সকলকে পরস্পরের সহযোগী হয়ে উঠার আহ্বান জানান অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম। বলেন, ‘নিজের জ্ঞান শাণিত করতে হবে। এ সময়ের চিকিৎসায় যদি ২০০০ সালের বিজ্ঞান চালাই, তাহলে তো এটা মেয়াদ্দোত্তীণ বিস্কুটের মতোই হলো। ওজনে কম দেওয়া, ভেজাল দেওয়া আর জ্ঞানের আধুনিকায়ন না করে চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রয়োগ করা সমান কথা।’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. খোরশেদ আলী মিয়া বলেন, স্বাস্থ্য মানে মানেই শুধু রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া নয়, বরং সবার সমন্বয়ে স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা পূরণ করাই স্বাস্থ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনাও এ রকমই।

স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে কেবল অধিক চিকিৎসা কেন্দ্র যথেষ্ট নয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ঢাকায় হাসপাতাল ও কেজি স্কুল প্রচুর। এটা বিশ্বের কোথাও নেই। আমাদের এমপি সাহেবরাও সংসদে স্থানীয় পর্যায়ে হাসপাতাল বানানোর দাবি করছেন। অথচ স্বাস্থ্য সংকট নিরসনে এটা একমাত্র সমাধান নয়।’

ডা. নাহিদুজ্জামান সাজ্জাদ বলেন, ‘চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে আমরা অনেক ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছি না। এক্ষেত্রে এভিডেন্স বেইজড প্র্যাকটিস বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’ 

ডা. হুরজাহান বানু বলেন, অনলাইনের সহজ লভ্যতার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে কখনো অনির্ভরযোগ্য উৎসের তথ্য চলে যায়। কেউ কেউ বিশ্লেষণ ছাড়া এখান থেকে পরামর্শ গ্রহণ করার কারণে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়েন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্পাইন সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. শহিদুল ইসলাম আকন বলেন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ‍সুশাসন (গুড গভার্নেন্স) নাই বলে অনেকে ঝুঁকির কাজে হাত দেয় না, পাচে দুদকের হাতে ধরা পড়তে হয়! ফলে স্বাস্থ্য বরাদ্দ অনেক ক্ষেত্রে খরচ করা সম্ভব হয় না।

তিনি বলেন, সৎ লোক কাজ করলে কোনো প্রটেকশন পাওয়া যায় না। এর মধ্যেও বাজেট কম। আবার যা আছে দক্ষতার অভাবে যথাযথ বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না।

বাজেটের বাস্তবায়ন এখন কীভাবে হয়—এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ দেশের এক নম্বর মেডিকেল কলেজ। ঢাকা মেডিকেল কলেজে কি দেশের এক নম্বর ইনভেস্টিগেশন ফ্যাসিলিটিজ আছে? অথচ ঢাকা মেডিকেল কলেজে যেটা কেনা হয়েছে, সেটি বেসরকারি খাতে ব্যবহৃত এমআরআই-এর তুলনায় বেশি দামের। কিন্তু আমরা কিনছি সবচেয়ে পুরোনো, অযোগ্য মডেল—যেটি অন্য দেশে ইতিমধ্যে বাদ দেওয়া হয়েছে। 

তিনি আরও বলেন, ‘যদি ভালো শাসনব্যবস্থা থাকে, কিছু ভালো কাজও হয়। বার্ন ইনস্টিটিউটটি আর্মিরা করেছে এবং তুলনামূলকভাবে ভালো হয়েছে। এমআরআই মেশিনের ক্ষেত্রে অনেকেই ঢাকা মেডিকেল থেকে বার্ন ইনস্টিটিউটে গিয়ে পরীক্ষা করান। অধ্যাপক ডিন মোহাম্মদ স্যার নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউট করেছেন। সেখানে তারা সিমেন্সের ভালো মানের এমআরআই মেশিন কিনেছেন—এটা আমি একটি ক্ষুদ্র উদাহরণ হিসেবে বললাম।’

বাজেট পর্যাপ্ত থাকলে এবং বাজেটের যদি সঠিক ব্যবহার হয়, এবং প্রতিষ্ঠান প্রধান যদি ঠিক থাকেন, সর্বপরি দেশ ঠিক থাকে বলে যানান তিনি। বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান প্রধান ঠিক থাকলে বেশিদিন স্থায়ী হয় না’। 

গত দেড় বছর সরকারের সাথে মিটিংয়ে যাওয়ার কিছু সুযোগ হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন,  মিডিয়াতে আসলো যে ঢাকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেল ভেঙে পড়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজে হোস্টেল দরকার। আমি গেলাম ছাত্রদের পক্ষে হোস্টেল চাইতে। মিটিং হলো, আমাকে প্রমাণ করা হলো যে এরা ছাত্রদের নিয়ে আন্দোলন করছে এই ইউনুস সরকারের বিরুদ্ধে। অতএব, এদের পানিশমেন্ট হওয়া উচিত।

সৎ প্রজেক্ট ডিরেক্টরদের সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আগের যারা বিভিন্ন প্রজেক্ট ডিরেক্টর ছিলেন, ভদ্রলোকেরা তো প্রজেক্ট ডিরেক্টর হতে চান না। ভদ্রলোক প্রজেক্ট ডিরেক্টর হলে—তিনি এক টাকাও খাওয়াবেন না, তিনি শতভাগ সৎ, নামাজ পড়েন, রোজা রাখেন, বেহেশতে যাওয়ার জন্য মরিয়া। কিন্তু কাজ শেষ করার পর যিনি অডিটে আসবেন, তাঁকে ১৫ শতাংশ দিতে হবে। এখন আপনি এই ১৫ শতাংশ কীভাবে দেবেন? আপনি তো সৎ মানুষ, আপনি একটি টাকাও খান নাই। এই অবস্থায় আপনি ১৫ শতাংশ না দিলে আপনার ভুল ধরা হবে, কারণ আপনার তো কোথাও না কোথাও ভুল থাকতেই পারে—চাইলে তো ধরতেই পারে।

সামগ্রিক সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এক হলো বাজেট কম, দুই হলো যেটুক আছে সেটুকের সঠিক ব্যবহার নাই, এবং যে মানুষটার হাতে পড়ছে, সেই মানুষটাও ওই পদে বেশিদিন থাকতে পারছে না। থাকতে হলে আপনাকে কম্প্রোমাইজ করতে হবে।

 

অনুষ্ঠানে ডা. ওয়ালিল্লাহ স্বাস্থ্যখাতকে এগিয়ে নিতে সবাইকে আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জাহাঙ্গীর আলমের সঞ্চালনায় সেমিনারে  সভাপতিত্ব করেন এনডিএফের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন। 

তিনি বলেন, টুগেদার ফর হেলথ, স্ট্যান্ড উইথ সায়েন্স, অর্থাৎ ‘স্বাস্থ্য সেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সকল প্রাণ’—এখানে টুগেদারের মর্মার্থ হলো মানুষ ও প্রাণীসহ গ্লোবাল কমিউনিটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই বিষয়েই গুরুত্বারোপ করছে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইবনেসিনা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সাজেদ আবদুল খালেক, এনডিএফের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. একেএম ওয়ালীউল্লাহ, এনডিএফের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. মো. আতিয়ার রহমান।

আরও ছিলেন জয়েন্ট সেক্রেটারি ডা. এমজি ফারুক হোসেন, ডা. রুহুল কুদ্দুস বিপ্লব ও ডা. মো. শাহাদাত হোসেন। এ ছাড়াও উপস্থিত ঢাকা মহানগরী উত্তর এনডিএফ সভাপতি ডা. এস এম খালেদুজ্জামান, কোষাধ্যক্ষ ডা. নাজমুল আরেফিন, অফিস সম্পাদক ডা. একেএম জিয়াউল হক।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
মাসুদ কামালের প্রতি ড্যাবের হুঁশিয়ারি

ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন

সাত কর্মদিবসের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাসে কর্মবিরতি প্রত্যাহার

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভাতা নবম গ্রেডের বেসিক

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত