০১ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:২৫ পিএম
দেশে লিভার রোগ চিকিৎসার পথিকৃৎকে অশ্রুসিক্ত স্মরণ

অধ্যাপক ডা. মবিন খানের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে বিএমইউতে আলোচনা সভা

অধ্যাপক ডা. মবিন খানের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে বিএমইউতে আলোচনা সভা
দেশে লিভার রোগ চিকিৎসার পথিকৃৎ অধ্যাপক ডা. আব্দুল মবিন খানের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে বিএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে স্মরণ সভা। ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: বাংলাদেশে লিভার রোগের চিকিৎসা ও শিক্ষার প্রসারে নিরন্তর সংগ্রাম করে গেছেন অধ্যাপক ডা. আব্দুল মবিন খান। লিভার বিভাগ প্রতিষ্ঠা, কোর্স চালু, চিকিৎসকদের জন্য পদ সৃষ্টিসহ আজকের পর্যায়ে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে তিনি রেখেছেন অদ্বিতীয় ভূমিকা। বহু প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তার নিরলস প্রচেষ্টার কল্যাণে দেশের বিভিন্ন মেডিকেলে আজ হেপাটোলজি বিভাগ চলমান রয়েছে। এই বিভাগের বিভিন্ন সাব স্পেশালিটি থেকে এই পর্যন্ত ১৩০ জন বিশেষজ্ঞ তৈরি হয়েছেন, যারা দেশ-বিদেশে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

দেশে লিভার রোগ চিকিৎসার পথিকৃৎ অধ্যাপক ডা. আব্দুল মবিন খানের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ শনিবার (১ নভেম্বর) বিএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে আয়োজিত স্মরণ সভায় এসব কথা বলেন বক্তারা। 

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ডা. মবিন খানের বহুমুখী প্রতিভার কথা তুলে ধরেন বিএমইউর ভাইস-চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম।

সময় নিষ্ঠা ও গতিশীল নেতৃত্বের বিরল সত্তা

অধ্যাপক শাহিনুল আলম বলেন, সময় নিষ্ঠা ও নেতৃত্বের গতিশীলতায় অধ্যাপক ডা. আব্দুল মবিন খানের মতো চিকিৎসক চোখে পড়ে না। তিনি ৩৬৫ দিন সকাল ৮টার আগেই অফিসে আসতেন। শত প্রতিকূলতায়ও যেকোনো কাজ এগিয়ে নিতে তিনি ছিলেন অতুলনীয়। তিনি একাধারে শিক্ষা, গবেষণা ও হেপাটলজি বিভাগের উন্নতির জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন।

একদিকে তিনি ক্লিনিক্যালি অভাবনীয় দক্ষ ছিলেন, অন্যদিকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হয়েও নিয়মিত ক্লাসে চলে যেতেন। এ ক্ষেত্রে ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য তিনি অনুসরণীয় শিক্ষক। কাজের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন নিখুঁত কারিগর। এ রকম অতুলনীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়া অত্যন্ত কঠিন কাজ।

অনুজরা অনুসরণ না করলে মেডিকেল শিক্ষা চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে

অসাধারণ যোগ্যতার অধিকারী অধ্যাপক ডা. মবিন খানের বৈশিষ্ট্য বর্তমান চিকিৎসক ও রেসিডেন্টরা অনুসরণ না করলে উচ্চতর মেডিকেল শিক্ষা আগামী দিনে গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

অধ্যাপক মবিন খান ধার্মিক মানুষ ছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শত কর্মব্যস্ততার মধ্যেও দেখি স্যার কুরআন তেলাওয়াত করছেন।’

অধ্যাপক ডা. মবিন খানের অসমাপ্ত কাজগুলো এগিয়ে নিতে সবাই আন্তরিক ও প্রতিশ্রুতিশীল হওয়ার আহ্বান জানান ডা. শাহিনুল আলম।

কর্মব্যস্ত ও একাগ্রচিত্ত মানুষ

ডা. মবিন খানের সঙ্গে বিভিন্ন কাজের স্মৃতিচারণ করেন বিএমইউর প্রো-ভিসি (শিক্ষা ও গবেষণা) অধ্যাপক ডা. মুজিবুর রহমান হাওলাদার। তিনি বলেন, ‘মবিন খান অত্যন্ত কর্মব্যস্ত ও একাগ্রচিত্ত মানুষ ছিলেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার দারুণ দক্ষতা ছিল। একাডেমিক ক্ষেত্রে তার একাগ্রতা ছিল। গবেষণা, শিক্ষা ও সাংগঠনিক দক্ষতায় তাঁর জুড়ি নেই। তিনি গণমানুষের চিকিৎসায় যে রাস্তা গড়ে গেছেন, তার শিক্ষার্থীরা তা এগিয়ে নিচ্ছেন।’

গণমানুষের চিকিৎসাসেবায় অবদানের জন্য তিনি চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন বলেও মনে করেন অধ্যাপক ডা. মুজিবুর রহমান হাওলাদার।

অনুষ্ঠানে তাঁর কর্তব্যপরায়নতা ও সময়নিষ্ঠার কথা তুলে ধরে চিকিৎসকরা বলেন, অধ্যাপক ডা. মবিন খান ছিলেন কাজঅন্তপ্রাণ একজন মানুষ।

সকাল সাতটার আগে রাউন্ড শেষ

এ প্রসঙ্গে বিএমইউর হেপাটোবিলিয়ারি ও প্যানক্রিয়াটিক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মুহসিন চৌধুরী বলেন, ‘অধ্যাপক ডা. মবিন খান স্যার ফজরের নামাজের পর আর ঘুমাতেন না। সকালে পদ্মা জেনারেল হাসপাতালে রোগী দেখতে গিয়ে খবর পেতাম স্যার সকালে রোগী দেখে চলে গেছেন। জানলাম, সকাল সাতটার আগেই রোগী দেখে চলে গেছেন। সাড়ে সাতটার পর আর থাকতেন না। এর মধ্যেই ক্লিনিক্যাল রাউন্ড শেষ। চিন্তা করলাম, একজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক এতো তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠতে পারেন, তাহলে আমরা পারবো না কেন?’ 

বক্তারা বলেন, বহুমুখী কাজে জড়িয়ে যাওয়ার পরও সামাজিক দায়িত্ব পালনে সতর্ক ও আন্তরিক ছিলেন অধ্যাপক ডা. মবিন খান।

অনুষ্ঠানে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের লিভার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সাহেদ আশরাফ সেতু বলেন, ‘অধ্যাপক ডা. মবিন খান স্যারকে সম্মান দেওয়ার লক্ষ্যে দেশে একটি লিভার ইনস্টিটিউট করতে তাঁর শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসা জরুরি।

মবিন খানের পাঠশালার খ্যাতি ছিল সর্বত্র

ডা. মবিন খানের পাঠশালা নিয়ে স্মৃতিচারণ করে অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য স্টাডি অব লিভার ডিজিজেস বাংলাদেশের এই কোষাধক্ষ্য বলেন, সীমাবদ্ধতার মধ্যেই শিক্ষাকে এগিয়ে মেজেতে বসে ক্লাস চালু রেখেছিলেন ডা. মুবিন খান। এটি মবিন খানের পাঠশালা হিসেবে খ্যাতি পায়। বহু লোক এটি দেখতে আসতো।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্সের (বিসিপিএস) সচিব অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ জামাল বলেন, উচ্চশিক্ষায় লিভার রোগের চিকিৎসায় নিরলস ভূমিকা রেখেছেন অধ্যাপক ডা. মবিন খান। তাঁর চেষ্টার ফলে শত শত চিকিৎসক দেশে বিদেশে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন।

বিএমইউর হেপাটোলজি বিভাগ, হেপাটলজি সোসাইটি বাংলাদেশ, এসোসিয়েশন অব দ্য স্টাডি অব লিভার ডিজিজেস বাংলাদেশের যৌথ আয়োজনে বিএমইউসহ দেশের বিভিন্ন মেডিকেল ও ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা স্মরণসভায় যোগ দেন।

আলোচনা সভার সঞ্চালনা করেন বারডেম জেনারেল হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ও হেপাটলজি সোসাইটি বাংলাদেশের মহাসচি অধ্যাপক ডা. মো. গোলাম আযম এবং বিএমইউর হেপাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাইফুল ইসলাম।

আলোচনা সভায় সঞ্চালনা করেন বারডেম জেনারেল হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ও হেপাটলজি সোসাইটি বাংলাদেশের মহাসচি অধ্যাপক ডা. মো. গোলাম আযম এবং বিএমইউর হেপাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাইফুল ইসলাম।

এতে বক্তব্য রাখেন বিএমইউ সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম, অধ্যাপক ডা. মো. সেলিমুর রহমান, অধ্যাপক ডা. এম এ কাশেম খন্দকার, অধ্যাপক ডা. ফজলুল হক, এসোসিয়েশন ফর দি স্ট্যাডি অব লিভার ডিজিজেস বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক ডা. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, ডা. মোস্তাক আহমেদ, মবিন খান স্যারের সহধর্মিনী মিসেস মুনা খান প্রমুখ।

স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য শেষে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে বিএমইউর হেপাটোলজি বিভাগে অধ্যাপক ডা. মবিন খানের স্মৃতি সংরক্ষণার্থে একটি ডিজিটাল ক্লাস রুমের শুভ উদ্বোধন করা হয়।

গত বছরের ৩১ অক্টোবর রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন ডা. মবিন খান। তিনি বার্ধক্যজনিত রোগ ছাড়াও ডায়াবেটিস ও পারকিনসনে ভুগছিলেন।

প্রখ্যাত চিকিৎসক ও গুণী শিক্ষক অধ্যাপক ডা. মবিন খানের জন্ম ১৯৪৯ সালে। তিনি লিভার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ হেপাটোলজি সোসাইটির সভাপতি ছিলেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লিভার রোগ গবেষণায় তাঁর রয়েছে অসামান্য অবদান।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত