২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০১:০৬ পিএম

ঢাবির চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষায় দ্বিতীয় মমেকের ডা. তাহমিদ

ঢাবির চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষায় দ্বিতীয় মমেকের ডা. তাহমিদ
ডা. তাহমিদ মিহদা ফেরদৌস। ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের (মমেক) শিক্ষার্থী ডা. তাহমিদ মিহদা ফেরদৌস। ঢাকার বাইরের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে এমন অর্জন সত্যিই অনন্য দৃষ্টান্ত।

ঈর্ষণীয় ফলাফলের পর মেডিভয়েসের মুখোমুখি হয় এই কৃতি শিক্ষার্থী। আলাপচারিতায় তুলে ধরেন নিজের সাফল্যের গল্প, পড়াশোনার কৌশল, মানসিক চাপ মোকাবিলার অভিজ্ঞতা, শিক্ষক ও সহপাঠীদের অবদান এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা। আমাদের বিশ্বাস, তার অভিজ্ঞতার কথাগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মেডিকেল শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণার রসদ হবে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ওমর ফারুক ফাহিম।

মেধা তালিকায় দ্বিতীয় হওয়ার অনুভূতি 

আলহামদুলিল্লাহ, এটা আল্লাহর অশেষ রহমত। আমি মনে করি, এ সাফল্য কেবল আমার একার নয়, বরং আমার পরিবার, শিক্ষক, সহপাঠী ও পুরো ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের। এবারের ফলাফলের অনুভুতি একটু ভিন্ন। কারণ বাকি তিনটা প্রফের ফল পেয়েছিলাম বাসায় আম্মুর সাথে। কিন্তু এবারের ফলের সময় আমি ছিলাম আব্বুর অফিসে। ফল প্রথমে আব্বু তার অফিসের পিসিতে দেখে এবং খুশি হয়ে জড়িয়ে ধরে আমাকে। এজন্যই এবারের ফলাফলের অনুভুতি একটু আলাদা।

ঢাকার বাইরে থেকে এমন সাফল্য অনন্য অর্জন 

সাধারণত শুরুর বেশিরভাগ শীর্ষ ফলগুলো ঢাকার মেডিকেল কলেজগুলো থেকেই পেয়ে থাকে। এজন্য আমার পরীক্ষা অনেক ভালো হয়েও আমি আশা করিনি যে, দ্বিতীয় হবো। তবে কথায় আছে—‘সংগ্রাম যত কঠিন, বিজয়ের গর্জন ততই উচ্চ’ (The Greater the struggle, the louder the triumph). ঢাকার বাইরে থেকে প্লেস করা একটু কঠিন। কিন্তু এর পেছনে ছিল আমার শিক্ষকগণ এবং ম-৫৭ এর সহপাঠীদের অশেষ সাহায্য। ময়মসিংহ মেডিকেল থেকে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করতে পেরে আমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে। আমি স্যার-ম্যাডামদের প্রচেষ্টার একটু হলেও ফল দিতে পেরেছি। তারা বছরের শুরু থেকেই আমাকে উৎসাহ দিতেন এবং সকল বিষয়ে আন্তরিকতার সাথে সাহায্য করতেন।

ভালো ফলাফলের অনুপ্রেরণা 

আমার ভালো ফলাফলের চেয়ে আমাকে ভালো মতো পড়াশোনার জন্য অনেকে অনুপ্রেরণা জোগাতেন। করোনার সময় ১.৫ বছর লকডাউনে আমি আর আমার বড় ভাইয়া (কে-৭৩) একসাথে পড়তাম। ভাইয়া তখন ফাইনাল ইয়ারে ছিল আর আমি প্রথম বর্ষে। ভাইয়া সেবার ফাইনাল প্রফে ঢাকা ইউনিভারসিটির আন্ডারে পঞ্চম স্থান অধিকার করেন। তখন থেকেই আমার লক্ষ্য ছিল, ভালো বেসিক নিয়ে পড়াশোনা করে একটা ভালো ফলাফল করা। কিন্তু বাকি তিন প্রফে আমি ময়মনসিংহ মেডিকেলে প্রথম স্থান অধিকার করেও ঢাকা ইউনিভারসিটিতে প্লেস করতে পারিনি। তবে ফাইনাল ইয়ারে শুরু থেকে আমাকে সবাই উৎসাহ দিতে থাকে যে, এই প্রফে প্লেস করা সম্ভব। আমার বাবা-মাসহ শিক্ষকবৃন্দ এবং আমার সহপাঠীরা আমাকে অনেক উৎসাহ দিতো।

পড়ালেখার কৌশল 

আমি খুব কম সময় পরীক্ষা কেন্দ্রিক ভাবতাম। আমি একটা পৃষ্ঠা পড়ার সময় নিজের মতো করে ভাবতাম, এখান থেকে কোন জ্ঞানটা আমার রোগীর জন্য কাজে লাগবে। কখন পরীক্ষায় এসেছে দেখে শুধু সেটাই পরতাম না। তবে হ্যাঁ, যেকোনো পরীক্ষার এক মাস আগে থেকে তখন পরীক্ষা কেন্দ্রিক প্রস্তুতি নিতাম গাইড থেকে বা প্রশ্ন ব্যাংক থেকে। তবে আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, ফাইনাল ইয়ার হলো আগের চার বছরের পড়াশোনার যোগফল। শুধু এক বছর পড়লে ফাইনাল ইয়ারে ভালো করার সম্ভবনা কম। তবে পড়াশোনার সময় ভালো ফলাফলের চেয়ে ফোকাস থাকা উচিত যে জ্ঞ্যান আহরণ হচ্ছে কিনা। আমার ভালো ফলাফলের চেয়ে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি যে আমার ব্যাচমেট- জুনিয়র—তারা নিজেদের বাবা-মা বা আতীয়-স্বজনের কোনো মেডিকেল এডভাইস নিতে হলে আমাকে ভরসা করে। তাদের এই ভরসার আমানত রাখতে হলেও আমার পড়াশোনাটা ঠিকমত করতে হয়।

আমি সবসময় একটিভ রিকল এবং পমোড্রো স্ট্রাটিজি ফলো করতাম। ৪০ মিনিট পরতাম কোনো ধরনের ডিস্ট্রাকশন ছাড়া। এরপর ১০ মিনিট লিখার চেষ্টা করতাম না দেখে। এরপর ১০ মিনিটের জন্য ব্রেক দিতাম পড়াশোনায়।আর আমি চেষ্টা করতাম অনেক ডেমো দিতে। এতে অন্যের উপকার হতো, আমারও বলার অভ্যাস হতো। মেডিকেলের বেশিরভাগ পরীক্ষায় লেখার চেয়ে বলার গুরুত্ব বেশি, তাই আমি চেষ্টা করতাম পড়ার চেয়ে বেশি বলতে। এক্ষেত্রে লেকচারে সামনে বসলে শিক্ষকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেয়াটাও একটা ভালো প্র্যাক্টিস আমি মনে করি। এতে ভয় ও কেটে যায়, বলার অভ্যাসও তৈরি হয়।

ফাইনাল ইয়ারে মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পড়াশোনার ধারাবাহিকতা, আমি চেষ্টা করেছি বছরের শুরু থেকে প্রতিদিন পড়াশোনা করতে। যেহেতু এই বর্ষে আইটেম, কার্ড, টার্ম নেই, সেহেতু নিজেই নিজেকে মোটিভেট করে পড়ার টেবিলে বসাতে হয়। এ ক্ষেত্রে পড়াশোনাটাকে জীবনের একটা অংশ করে নিতে হবে, যেহেতু ডাক্তারি করতে চাইলে এটাই আমাদের রুটি-রুজির অবলম্বন।

ওয়ার্ডে অনেক সময় পাওয়া যায়, বসে না থেকে চেষ্টা করতাম রোগী দেখতে। যেসব টপিক বইয়ে পড়তাম, চেষ্টা করতাম সেসব রোগী দেখে মিলিয়ে দেখতে যে, আমার বইয়ের জ্ঞানের সাথে বাস্তবিকে কতটুকু মিলে। এ ছাড়াও প্রতিদিন শর্ট কেস প্র্যাক্টিস করার চেষ্টা করতাম এমন ভাবে, যেন এগুলো রিফ্লেক্সে পরিণত হয়। আর প্রফ পরীক্ষার আগে ২মাস থেকে রিটেনের জন্য প্রশ্ন ব্যাঙ্ক থেকে নিজের মত করে উত্তর সাজানো শুরু করেছিলাম সারাবছরে পড়া বই থেকে।

শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষক-সিনিয়রদের গাইডেন্স 

আমি মনে করি ময়মন্সিংহ মেডিকেল পড়াশোনার ক্ষেত্রে একটা স্বর্ণযুগ পার করছে। এর প্রমাণ গত তিন বছরে বিভিন্ন প্রফেশনাল পরীক্ষায় প্রথম স্থানসহ বিসিএসেও প্রথম, দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছেন আমাদের জ্যেষ্ঠরা। পাঠদানের ব্যাপারে বর্তমান প্রতিটি শিক্ষক অত্যন্ত আন্তরিক। শুধু পড়াশোনা এবং ভালো ফলাফল না, আমাদের একেকজন শিক্ষক আমাদের ব্যক্তিগত এবং পেশাগত জীবনেও আমাদের আদর্শ। যখন দেখি, আমাদের বিভাগীয় প্রধান স্যার হাটু গেরে মাটিতে শোয়া রোগীর উপর পরীক্ষা করছেন, তখন আমরা বুঝি বিনয় ডাক্তারদের অলংকার। এ ছাড়াও পড়াশোনার ব্যাপারে আমাদের শিক্ষকগণ অনেক বেশি আন্তরিক। আর আমার ম ৫৭ এর ব্যাচমেটদের কথা বিশেষভাবে না বললেই নয়। আমি অনেক শুনেছি, মেডিকেলের ব্যাচমেটরা সাহায্য করে না, কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা ভিন্ন। আমাদের যে কেউ কোনো ধরনের নোট বা রিসোর্স পেলে সাথে সাথেই আমাদের গ্রুপে দিয়ে দিত। আমার বিশ্বাস আমাদের ব্যাচের সবাই শুধু ভাল ডাক্তার হবে না, অনেক ভালো মানুষও হবে।

রাজধানীর বাইরের শিক্ষার্থীদের জন্য বার্তা

আমি মনে করি, প্রতিভা বা সাফল্য শুধু জায়গার উপর নির্ভর করে না, বরং পরিশ্রম, ধৈর্য আর নিয়তের উপর নির্ভরশীল। কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘মানুষের জন্য তার প্রচেষ্টারই প্রতিফল পাওয়া যায়।’ (সূরা নাজম: ৩৯)। তাই রাজধানীর বাইরের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আমার বার্তা, নিজেদের কখনো ছোট ভাববেন না। নিয়মিত প্রচেষ্টা আর আল্লাহর উপর ভরসা—এ দুটো থাকলে যেকোনো জায়গা থেকেই বড় অর্জন সম্ভব। আর সবসময় নিয়ত রাখা উচিত উপযুক্ত জ্ঞান আহরণ হচ্ছে কিনা। ভালো ফলাফল বাই প্রোডাক্ট হিসেবে চলে আসবে ইনশাল্লাহ। নিজেকে পিছিয়েপড়া মনে করা যাবে না কখনোই, হারার আগে হেরে যাওয়া যাবে না। বর্তমানে পড়াশোনার অনেক সোর্স আছে, যে কেউ চাইলেই নিজের মতো করে অনেক কিছু শিখতে পারবে। কিন্তু নিজের কাছে সৎ থাকতে হবে। ডাক্তারি করতে এসেছি মানে পড়াশোনা করে জ্ঞানার্জন আমার আমানত।

অনুজদের প্রতি পরামর্শ

প্রথমত বেসিক বইগুলো ভালোভাবে আয়ত্ত করা, দ্বিতীয়ত রিভিশন আর তৃতীয়ত শিক্ষকদের ক্লাস মনোযোগ দিয়ে অনুসরণ করা জরুরি। আর সর্বশেষে, শৃঙ্খলা ও ধৈর্য ধরে পড়তে হবে। আর চেষ্টা করবে নিজের যতটুক সম্ভব, ততটুকু দিয়ে নিজের ব্যাচমেট এবং জুনিওরদের সাহায্য করতে। তাহলে আল্লাহ তায়ালাও তোমাকে সাহায্য করবেন।

মানসিক চাপ সামলানোর কৌশল

আমি সবসময় নামাজকে আঁকড়ে থেকেছি। নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াত আমাকে মানসিক প্রশান্তি দিয়েছে। এ ছাড়া পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোও আমাকে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করেছে। অনেক সময় রাত জেগে পড়তে হয়, সে সময় কেউ যদি তাহাজ্জুদ পড়ার অভ্যাস করতে পারে তাহলে আরো ভালো। আর চেষ্টা করতে হবে যেন জীবনে হতাশা চলে না আসে, এজন্য নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করা যাবে না, সকলের পথ আলাদা, রিজিক নির্ধারিত। আর নিজেকে চাপমুক্ত রাখার সবচেয়ে ভাল উপায় অন্যের উপকারে আসা, নিজের সাধ্য মতো উপকার করতে হবে।

চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন যেভাবে

পারিবারিকভাবেই আব্বু-আম্মুকে দেখে আমার ইচ্ছা ছিল ডাক্তার হওয়ার। এ ছাড়া আমার বড় ভাইয়ের কাছ থেকেও অনুপ্রেরণা পেয়েছি। বিশেষ করে ভালো লাগে যে, এই পেশায় মানুষ নিজের সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় শরণাপন্ন হয়, এজন্য অপ্রাপ্তির অনেক কিছু থাকলেও প্রাপ্তিটা এই পেশায় নিতান্তই কম নয়।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

বর্তমানে আমার ইচ্ছা পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে ইন্টার্নশিপ করা এবং একজন ডাক্তার হিসেবে রোগীর সাথে কীভাবে কথা বলতে হয়—এসব থেকে শুরু করে ট্রিটমেন্টের আগাগোড়া আমার জ্যেষ্ঠ ও শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে শেখা। এরপর আমার ইচ্ছা মেডিসিনের সাব স্পেশালিটি নিয়ে পড়া। বাকিটা আল্লাহ যেখানে রিযিক রেখেছেন সেখানেই হবে।

ডা. তাহমিদ ফেরদৌসের বেড়ে ওঠার গল্প

ডা. তাহমিদের গ্রামের বাড়ি শেরপুর জেলায়। পিতার চাকরি সুবাদে জন্ম ও বেড়ে ওটা রংপুরের পার্বতীপুর উপজেলায়। রংপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। তিন ভাইয়ের মধ্যে বড় ভাই ডিএমসি কে-৭৩ থেকে পাস করে এমআরসিএস দিয়ে যুক্তরাজ্যে আছেন এবং ছোট ভাই হাফেজ এবং বর্তমানে এডমিশন কোচিং করছেন। বাবা-মা দুজনই ডাক্তার। পড়াশোনার পাশাপাশি জাতীয় টেলিভিশন বিতর্ক, আন্তঃক্যাডেট কলেজ সাহিত্য প্রতিযোগিতা এবং আন্তঃদেশীয় ক্যাডেটদের সাংস্কৃতিক বিনিময়, লন্ডনে অংশগ্রহণ করেছেন।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত