২৪ জুলাই, ২০২৫ ০৬:২৮ পিএম

ইন্টার্নশিপ ছাড়াই ছাত্রলীগ নেতাকে চূড়ান্ত সনদ দিল রামেক হাসপাতাল

ইন্টার্নশিপ ছাড়াই ছাত্রলীগ নেতাকে চূড়ান্ত সনদ দিল রামেক হাসপাতাল
নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি শাহরিয়ার রহমান সিয়াম ও রামেক হাসপাতালের লোগো। ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ইন্টার্নশিপ শেষ না হলেও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা শাহরিয়ার রহমান সিয়ামকে চূড়ান্ত সনদ প্রদানের অভিযোগ উঠেছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল প্রশাসনের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) আইন অনুযায়ী, এক বছরের ইন্টার্নশিপের বাধ্য-বাধকতা থাকলেও ছয় মাস প্রশিক্ষণ নিয়েছেন সিয়াম। গত ১৫ মে গোপনে সনদও উত্তোলন করেছেন তিনি।

প্রশিক্ষণ শেষ না করেও চূড়ান্ত সনদ ইস্যুর ঘটনা তদন্তে আজ বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. আজিজুল হক আজাদকে প্রধান করে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল প্রশাসন। চার কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

বগুড়া সদরের নারুলী পশ্চিমপাড়া গ্রামের মাহফুজার রহমানের ছেলে শাহরিয়ার রহমান সিয়াম রামেকের ডেন্টাল অনুষদের শিক্ষার্থী ছিলেন। শাখা ছাত্রলীগের সর্বশেষ কমিটিতে সহ-সভাপতি ছিলেন তিনি। শিক্ষার্থী নির্যাতন, র‌্যাগিং, চাঁদাবাজি ও মাদকদ্রব্য সেবনসহ নানা অভিযোগে গত বছরের ৩ নভেম্বর ছয় মাসের জন্য তার ইন্টার্নশিপ স্থগিত করা হয়। একই সাথে হোস্টেল থেকেও আজীবন বহিষ্কার হন তিনি।

জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৩ জানুয়ারি রামেকের শেষ পেশাগত বিডিএস পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। এরপর ১৮ জানুয়ারি রামেক হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ শুরু করেন সিয়াম। ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর আত্মগোপনে চলে যান। পরে একদিন অর্ধবেলা হাসপাতালে এসেছিলেন তিনি। এরপর তাকে আর দেখা যায়নি হাসপাতালে।

হিসেব অনুযায়ী, চলতি বছরের ২ মে তার ইন্টার্নশিপ স্থগিতের মেয়াদ শেষ হয়। সহপাঠীরা বলছেন, পরদিনই ইন্টার্নশিপে যুক্ত হতে পুনরায় আবেদন করেন সিয়াম। এরপর ১৫ মে তিনি সনদ উত্তোলন করেন।

তারা বলছেন, সিয়াম ১৮ জানুয়ারি ইন্টার্নশিপে যুক্ত হয়। এ হিসেবে ৫ আগস্ট পর্যন্ত তিনি ছয় মাস ১৮ দিন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। আরও পাঁচ মাস ১২ দিন প্রশিক্ষণের পর চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি তার ইন্টার্নশিপ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এর আগেই ৫ আগস্টের পর তিনি লাপাত্তা। পরে ৩ নভেম্বর থেকে ছয় মাসের জন্য ইন্টার্নশিপ স্থগিত হয় তার। এক্ষেত্রে কোনোভাবেই চূড়ান্ত সনদ পাওয়ার সুযোগ নেই সিয়ামের। ৩ মে থেকে অন্তত আরও পাঁচ মাস ১২ দিন ইন্টার্নশিপের পরই এ সুযোগ পাবেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গত বছরের ৬ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত অর্থোডন্টিক্স, ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল (ওএমএস), ১৬ অক্টোবর থেকে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত প্রস্থোডন্টিক্স এবং ৩০ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত কনজারভেটিভ ডেন্টিস্ট্রি বিভাগের প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়।

এসব প্রশিক্ষণে সিয়ামের অংশগ্রহণ ছিল মর্মে ইন্টার্নশিপ সম্পন্ন করার সনদে স্বাক্ষরও করেছেন বিভাগগুলোর প্রধানরা। সনদটি চূড়ান্তভাবে প্রস্তুত হয় গত ১১ মে। এতে সই করা বিভাগীয় প্রধানরা হলেন—অর্থোডন্টিকস বিভাগের ডা. আব্দুর রশিদ মন্ডল (পরে বদলি হয়েছেন), ওএমএস বিভাগের ডা. শরিফুল ইসলাম, প্রস্থোডন্টিকস বিভাগের ডা. জাকি আজম এবং কনজারভেটিভ ডেন্টিস্ট্রি বিভাগের ডা. ইসমাইল হোসেন। সনদে এসব বিভাগের প্রশিক্ষণ গ্রহণের ক্ষেত্রে মন্তব্যের ঘরে ইংরেজিতে লেখা হয়েছে ‘এক্সিলেন্ট’।

এ ছাড়া তিনি আবাসিক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বলেও উল্লেখ আছে এতে। ইংরেজিতে লেখা এ সনদপত্রে বলা হয়েছে, ‘তিনি ওয়ার্ড/বিভাগে রোগীদের পরিচর্যার জন্য মেডিকেল অফিসার, সহকারী রেজিস্ট্রার/ওয়ার্ডের মেডিকেল অফিসারের কাছে দায়বদ্ধ ছিলেন এবং ওয়ার্ড/বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যাপকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তার প্রশিক্ষণকে চমৎকার হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।’

হাসপাতালের নথিপত্রে দেখা গেছে, চূড়ান্ত সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এফ এম শামীম আহমদ, উপ-পরিচালক ডা. মো. আবু তালেব, ডেন্টাল ইউনিটের প্রধান ডা. আবুল হোসেন ও রামেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খন্দকার মোহাম্মদ ফয়সাল আলমের স্বাক্ষর রয়েছে।

জানতে চাইলে রামেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খন্দকার মোহাম্মদ ফয়সাল আলম মেডিভয়েসকে বলেন, ‘সিয়াম ছাত্র হিসেবে অনেক দিন আগে আমার এখান (রামেক) থেকে বের হয়ে চলে গেছে। সে ইন্টার্নশিপ করেছে, এতে ওখানকার বিভাগীয় ও ইউনিট প্রধানরা সই করেছেন, সে সই দেখে পরিচালক সই করেছেন।’

‘যেকোনো ভাবেই হোক, বিভাগ ও ইউনিট প্রধানরা দায় এড়াতে পারেন না’ উল্লেখ করে অধ্যক্ষ বলেন, ‘তারা সই করেছেন, বিধায় পরিচালক ও সহকারী পরিচালক সই করেছেন। পরে মেডিকেল অধ্যক্ষের কাছে আসে। আমিও সই করে দিয়েছি। তার কোনো ডকুমেন্ট আমার কাছে নেই। ফলে তাকে ফিল্টার করার কোনো সুযোগ আমার এখানে ছিল না। বিভাগীয় প্রধানরা কেন সই করলেন, আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সে (সিয়াম) সই নকল করেছে কিনা সেটাও বুঝতে পারছি না। আমি একজন বিভাগীয় প্রধানকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি বলেছেন এটি তার সই না।’

এ বিষয়ে রামেক হাসপাতালের ডেন্টাল ইউনিটের প্রধান ডা. আবুল হোসেন মেডিভয়েসকে বলেন, ‘ইন্টার্নরা আমাদের কাছে একটি অভিযোগ দিয়েছে। সার্টিফিকেট ইস্যুর ক্ষেত্রে অনেকের স্বাক্ষর রয়েছে। তবে ইন্টার্নরা যেসব স্বাক্ষর দেখিয়েছে, তা সন্দেহজনক মনে হচ্ছে। আমরা তদন্ত করে দেখবো।’

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এফ এম শামীম আহমদ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমরা তদন্ত করে দেখছি। যদি এরকম কিছু হয়, তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সনদপত্র ইস্যুর সময় যাচাই-বাছাই করা হয়নি কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে হাসপাতাল পরিচালক বলেন, ‘তার লগবুক ক্লিয়ার আছে, সবকিছু ঠিক পাওয়া গেছে। এসবের ভিত্তিতে স্বাক্ষর দেওয়া হয়েছে। তবে এটি খুবই বিরল ঘটনা। এরকমটা একেবারেই হয় না। হয়তো এ হাসপাতালের ইতিহাসে এটি প্রথম ঘটনা।’

এনএআর/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন
মাসুদ কামালের প্রতি ড্যাবের হুঁশিয়ারি

ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন

মাসুদ কামালের প্রতি ড্যাবের হুঁশিয়ারি

ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত