২৪ জুলাই, ২০২৫ ০১:৩১ পিএম

‘শৈশবে প্রতিকূল অভিজ্ঞতা মানসিক ও সামাজিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে’

‘শৈশবে প্রতিকূল অভিজ্ঞতা মানসিক ও সামাজিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে’
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএমইউর ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম।

মেডিভয়েস রিপোর্ট: শৈশবে প্রতিকূল অভিজ্ঞতার (এসিই) শিকার ব্যক্তিরা শুধু শারীরিক নয়, মানসিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হন। সামাজিক জীবনে এ ধরনের অভিজ্ঞতার ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, এসিইর শিকার ব্যক্তিদের জীবনের পরবর্তী সময়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সামাজিক জটিলতা অনেক বেশি।

বুধবার (২৩ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের বেসিক সায়েন্স ভবনে আয়োজিত ‘শৈশবকালীন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুরা’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব তথ্য উঠে এসেছে। যুক্তরাজ্যের দ্য ওপেন ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি স্কুল অব সোশ্যাল ওয়ার্ক এবং গ্লোবাল স্ট্রিট কানেক্টের সহায়তায় এই সেমিনার আয়োজিত হয়।

এ সময় ‘শৈশবকালের প্রতিকূলতা ও তার স্বাস্থ্যগত প্রভাব’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। শৈশবকালীন প্রতিকূল অভিজ্ঞতা (এসিই) এবং পরবর্তীকালে দীর্ঘমেয়াদী অসংক্রামক রোগ ও সামাজিক সমস্যার উপর এর প্রভাব নিয়ে পরিচালিত এ গবেষণায় দুই হাজার ৯৭০ জন অংশ নেন।

সেমিনারে কী-নোট স্পিকার ছিলেন পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুল হক। তিনি ‘শৈশবকালের প্রতিকূলতা ও তার স্বাস্থ্যগত প্রভাব’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন।

গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, শৈশবে যারা মানসিক, শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, অথবা অবহেলা, পারিবারিক অশান্তি, মাদকাসক্ত পরিবেশ, মা-বাবার বিচ্ছেদ বা পরিবারের কারো কারাবাসের মতো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন—তাদের জীবনের পরবর্তী সময়ের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সামাজিক জটিলতা অনেক বেশি। এ ধরনের শৈশবকালীন প্রতিকূল অভিজ্ঞতার প্রভাব শুধু শারীরিক নয়, মানসিক এবং সামাজিক জীবনেও গভীরভাবে পড়ে।

যাদের এসিই স্কোর ৪ বা তার বেশি, তাদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা সাধারণের তুলনায় দুই গুণ বেশি। একইভাবে, যেসব মায়েদের জীবনে তিনটির বেশি এসিই ছিল, তারা স্নায়ুবিকাশজনিত ব্যাধিতে (এনডিডি) আক্রান্ত সন্তানের জন্ম দেওয়ার ঝুঁকিতে ছিলেন চার গুণ বেশি। হৃদরোগ হওয়ার সম্ভাবনাও এসিইর সংখ্যা অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। যারা শৈশবে এসিইর অভিজ্ঞতা পেয়েছে, তাদের মধ্যে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ ও স্ট্রেসের মাত্রা অনেক বেশি দেখা গেছে, যা একটি শক্তিশালী সম্পর্ক নির্দেশ করে।

এ ছাড়া শৈশবে এসিইর অভিজ্ঞতা থাকলে পরবর্তীকালে দাম্পত্য সহিংসতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বৃদ্ধ বয়সে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের সম্ভাবনাও এসিই থাকার ফলে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ে।

যৌন নির্যাতনের সঙ্গে এসিইর একটি সম্পর্ক থাকলেও গবেষণার ফলাফলে তা পরিসংখ্যানগতভাবে খুব শক্তিশালী প্রমাণিত হয়নি। তবে অর্থনৈতিক নির্যাতনের মতো বিষয়েও এসিইর প্রভাব পাওয়া গেছে, যদিও সেটি অপেক্ষাকৃত দুর্বল ছিল।

অধ্যাপক আতিকুল হক বলেন, এই গবেষণার সবচেয়ে বড় বার্তা হলো—শৈশবের নিরাপদ ও সহিংসতামুক্ত পরিবেশ শুধু তাৎক্ষণিক কল্যাণ নয়, বরং একজন মানুষের সারাজীবনের স্বাস্থ্য, মানসিক স্থিতি এবং সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি গড়ে দেয়। একটি শিশুর জীবনে ভালোবাসা, নিরাপত্তা এবং যত্নের অভাব হলে তা তার ভবিষ্যৎ জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তাই সমাজের সকল পর্যায়ে পরিবার, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে—শৈশবে সহিংসতা ও অবহেলা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

সেমিনারে ইন্ডিয়ান ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. হাসান রেজা গ্লোবাল স্ট্রিট কানেক্ট পরিচালিত একটি ন্যাশনওয়াইড মিক্সড-মেথডস স্ট্যাডির ফলাফল উপস্থাপন করেন। এতে বাংলাদেশের পথ শিশুদের উপর নির্যাতনের বাস্তবতা উঠে আসে।

গবেষণার ফলাফলে জানানো হয়, শতভাগ পথশিশুই শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। প্রায় সকলেই অর্থনৈতিক শোষণের মুখোমুখি হয়েছে। ২৭ শতাংশ শিশু জানে না তাদের পিতা-মাতার অবস্থান সম্পর্কে। ৯৭ শতাংশ শিশু এসেছে অত্যন্ত নিম্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থা থেকে।

এ প্রসঙ্গে ড. হাসান রেজা বলেন, এই শিশুদের প্রতিদিনের জীবনে যে পরিমাণ ট্রমা ঘটে—তা শুধু তাদের শৈশব নয়, ভবিষ্যত জীবনেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। সময়মতো সহায়তা না পেলে, এসব শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি ভয়াবহ হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের দ্য ওপেন ইউনিভার্সিটির মেন্টাল হেলথ ক্লিনিশিয়ান ও ফ্যাকাল্টি মেম্বার ডা. শরীফ হায়দার বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য কোনো গৌণ বিষয় নয়, বরং এটিই শিশু সুরক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। গবেষণা বলছে, একটি শিশুর জীবনে যত বেশি এসিই ঘটে, তার মানসিক স্বাস্থ্যের ঝুঁকিও তত বেশি। সহিংসতা প্রতিটি শিশুর মনে অদৃশ্য দাগ রেখে যায়, যা সারাজীবন বহন করে বেড়াতে হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, শৈশবকালের প্রতিকূলতা ও তার স্বাস্থ্যগত প্রভাবসহ এ ধরণের গবেষণা ও নানামুখী কার্যক্রম তাদের সু-স্বাস্থ্য নিশ্চিত করা ও সুরক্ষাসহ সুন্দর ভবিষ্যত জীবন নিশ্চয়তায় বিরাট ভূমিকা রাখবে। শিশুরা যাতে পরিবার থেকে শুরু করে সর্বত্র সহিংসতা, অবহেলা ও অত্যাচারের শিকার না হয় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। শৈশব থেকেই শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ থাকলে ভবিষ্যতে তাদের স্বাস্থ্যের উপর নানা ধরণের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা গবেষণায় প্রমাণিত।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, পুরুষ শাসিত সমাজে নারী স্বাস্থ্য অবহেলিত। কন্যা শিশুরা সবচাইতে বেশি অবহেলা, অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়। পরিবার, সমাজ এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও নানা ধরণের অত্যাচার নির্যাতন ও মানসিক চাপের শিকার হয়ে ট্রমাসহ অনেক শিশু মানসিক রোগে ভুগছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে এ সকল বিষয় নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত ফলাগুলি বাস্তবায়ন করতে পারলে শিশুদের ভবিষ্যত সু-স্বাস্থ্য অবশ্যই নিশ্চিত করা যাবে।

সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারিহা হাসিন বলেন, শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জনস্বাস্থ্য নীতি এবং সামাজিক সুবিচার খাতে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

সেমিনারের বক্তারা বাংলাদেশের পথশিশুদের প্রতি সহিংসতা বন্ধে দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমুখী কর্মপন্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন।

প্রসঙ্গত, গ্লোবাল স্ট্রিট কানেক্ট পরিচালিত জাতীয় পর্যায়ের প্রচারণা ব্রেক দ্যা সাইকেল-স্টপ ভায়োলেন্স এগেইনস্ট স্ট্রিট চিলড্রেনের অংশ হিসেবে আয়োজিত এই সেমিনারের উদ্দেশ্য—শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং নীতিনির্ধারণে গঠনমূলক পরিবর্তন আনা।

এনএআর

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন
মাসুদ কামালের প্রতি ড্যাবের হুঁশিয়ারি

ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন

মাসুদ কামালের প্রতি ড্যাবের হুঁশিয়ারি

ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত