গাজা সংহতিতে যোগদানে বাধা: ডা. সুলতানা আলগিনের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি
মেডিভয়েস রিপোর্ট: গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার প্রতিবাদে ‘গ্লোবাল স্ট্রাইক ফর গাজা’ কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশে শিক্ষার্থীদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ তদন্তে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) মনোরোগবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. সুলতানা আলগিনের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিএমইউ কর্তৃপক্ষ।
আজ মঙ্গলবার (৮ এপ্রিল) সকালে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈঠকে এ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে আগামী সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বিএমইউর ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম আজ দুপুরে মেডিভয়েসকে বলেন, ‘প্রো ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি কাজ শুরু করেছে। তাদেরকে সাত দিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। আশা করি, তার আগেই দিতে পারবে। কমিটির সদস্যরা আজ এক দফা বসেছেন। ঘটনা জানতে অধ্যাপক ডা. সুলতানা আলগিনকে ডেকেছেন তারা।’
গাজায় গণহত্যার প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসূচির কথা তুলে ধরে অধ্যাপক শাহিনুল আলম বলেন, ‘গ্লোবাল স্ট্রাইক ফর গাজা’ কর্মসূচি সামনে রেখে আমাদের গতকালের সিদ্ধান্ত ছিল ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ থাকবে। এর ধারাবাহিকতায় আজ আমরা দোয়া ও গায়েবানা জানাজার ব্যবস্থা করেছি।’
বিএমইউর ভাইস চ্যান্সেলর বলেন, ‘গতকাল আমরা নোটিস দিয়েছি, সাধারণত কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত না নিলেও শিক্ষার্থীদের এ রকম কোনো কর্মসূচি থাকলে আমরা ক্লাস করতে যাই না। সব বিশ্ববিদ্যালয় এ ধরনের সংহতি প্রকাশের ঘোষণা দেয়নি। ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর ও বিএমইউ এ ঘোষণা দিয়েছে। আমাদের নোটিসের আগেই গণহত্যার প্রতিবাদ হিসেবে অনেক শিক্ষক ক্লাস নেওয়ার ব্যাপারে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন।’
তাহলে কী অধ্যাপক সুলতানা আলগিনের শিক্ষার্থীদের ক্লাস করতে বাধ্য করার সিদ্ধান্ত শৃঙ্খলাবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যেহেতু বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠিত হয়েছে, তারা রিপোর্ট দেবে। এর আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সূত্র মতে, ‘গ্লোবাল স্ট্রাইক ফর গাজা’ কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে সোমবার (৭ এপ্রিল) সকালে সব ক্লাস ও পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার নোটিস দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে ডা. সুলতানা আলগিন সেই নির্দেশনা অমান্য করে প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসকদের ক্লাসে উপস্থিত হতে বাধ্য করেন। এমনকি কোনো শিক্ষার্থী অনুপস্থিত থাকলে পরীক্ষায় অংশ নিতে না দেওয়া বা ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন বলেও অভিযোগ করেছেন একাধিক শিক্ষার্থী।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্লাসে না গেলে ভবিষ্যতে পরীক্ষায় বসতে দেওয়া হবে না—এমন হুমকির মুখে বৈশ্বিক এই কর্মসূচি বাদ রেখে ক্লাসে যেতে বাধ্য হন তারা।
এ ঘটনা ছাড়াও অধ্যাপক আলগিনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার, মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং ধর্মীয় বিষয়ে শিক্ষার্থীদের অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ রয়েছে বলেও জানান শিক্ষার্থীরা।
চিকিৎসকদের অভিযোগ, অধ্যাপক সুলতানা আলগিন আওয়ামী লীগ সমর্থিত চিকিৎসক সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) একজন সক্রিয় সদস্য। অতীতে শিক্ষার্থীদের জোর করে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মিছিলে নিয়েছেন।
ধর্মীয় পোশাক বা প্রতীক বহনকারী চিকিৎসকদের কটাক্ষ করার কথাও উল্লেখ করেন একাধিক শিক্ষার্থী। এমন অবস্থায় অধ্যাপক সুলতানা আলগিনকে প্রশাসনিক ও একাডেমিক পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে একাধিকবার চেষ্টা করেও অধ্যাপক ডা. সুলতানা আলগিনকে মুঠোফোনে পাওয়া যায়নি।
ডা. আলগিনকে অব্যাহতির দাবি বৈচিফের
স্বৈরাচারের দোসর আখ্যা দিয়ে অধ্যাপক ডা. সুলতানা আলগিনকে অব্যাহতির দাবি জানিয়েছে পোস্টগ্র্যাজুয়েট প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসকদের সংগঠন বৈষম্যবিরোধী চিকিৎসক ফোরাম (বৈচিফ)। ৭ এপ্রিল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ দাবি জানায় তারা।
বৈচিফ সভাপতি ডা. সামিউর রশিদ রিফাত ও সাধারণ সম্পাদক ডা. মাহমুদুল হাসান নয়ন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি সমাবেশেকালীন সময়ে জোরপূর্বক পোস্ট গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী চিকিৎসকদের ক্লাসে অবস্থান করতে বাধ্য করার অভিযোগ ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকিয়াট্রি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ডা. সুলতানা আলপিনের বিরুদ্ধে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, যেখানে আজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেখানে ডা. সুলতানা নির্দেশনা অমান্য করে সকল শিক্ষার্থীকে ক্লাসে অবস্থান করতে জোর জবরদস্তি করেন।’
এতে আরও বলা হয়, ‘এই অভিযুক্ত অধ্যাপক পতিত স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদী সংগঠন আওয়ামী লীগের মদদপুষ্ট চিকিৎসক সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) আজীবন সদস্য। জোরপূর্বক আওয়ামী লীগের মিছিলে ছাত্র-ছাত্রীদের নেওয়ার অভিযোগ এবং ওনার বিরুদ্ধে উচ্চারিত মন্তব্যের জের ধরে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় ফেইল করিয়ে দেবার গুরুতর অভিযোগ আছে এই ফ্যাসিবাদের দোসরের বিরুদ্ধে। এমনকি ইসলাম বিদ্বেষী মনোভাব, যেমন—দাঁড়ি, টুপি, হিজাব এবং বোরকা পরিহিত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হেনস্তার ন্যায় জঘন্যতম অভিযোগ ও উত্থাপিত হয়েছে তার বিরুদ্ধে।’
‘ফ্যাসিবাদের দোসর, জুলাই অভ্যুত্থানে বিরোধিতাকারী এই স্বৈরাচারিনীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উৎখাত করার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সময় ও বিচক্ষণ দৃষ্টি আকর্ষণ করছি’—যোগ করা হয় বিজ্ঞপ্তিতে।
এমইউ/