স্বাস্থ্য খাতে ৫% বরাদ্দের প্রস্তাব বিএনপির
মেডিভয়েস রিপোর্ট: স্বাস্থ্যখাত সংস্কারে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি প্রস্তাবনা দিয়েছে বিএনপি। প্রস্তাবনায় স্বাস্থ্য খাতে ন্যূনতম ৫% বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলেছে দলটি। একই সঙ্গে জনগণ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্য বীমা প্রবর্তনের পাশাপাশি সম্প্রসারণেরও কথা বলেছে তারা।
আজ মঙ্গলবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সকালে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের এসব প্রস্তাবনা তুলে ধরেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন।
প্রস্তাবনায় চিকিৎসা সেবা উন্নয়নে ব্যবস্থাপনার পরিচালন সেবার পুনর্বিন্যাস এবং পর্যায়ক্রমে জিডিপির ন্যূনতম ৫% বিনিয়োগ (উদ্ভাবনী অর্থায়ন পদ্ধতিতে) ও স্বাস্থ্য বীমা চালুকরণের কথা বলা হয়।
স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি ও অর্থায়ন পুনর্বিন্যাসের কথা তুলে ধরে প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ২-৩% ব্যয় হয়, যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। অধিকাংশ মানুষ ব্যক্তিগত অর্থায়নের মাধ্যমে চিকিৎসা গ্রহণ করেন, যা তাদেরকে আর্থিক সংকটে ফেলে। এই সমস্যার সমাধানে পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য খাতে বাজেটে জিডিপি'র পর্যায়ক্রমে ন্যূনতম ৫% বরাদ্দ করতে হবে।
জনগণের খরচ কমাতে স্বাস্থ্য বীমা প্রবর্তন জরুরি
স্বাস্থ্য বীমা ব্যবস্থা উন্নয়নের পরামর্শ দিয়ে দলটি বলেছে, স্বাস্থ্য বীমা প্রবর্তন এবং তা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন, যাতে জনগণ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক ঝুঁকি কমাতে পারে। এটি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থায়িত্বের সহায়ক হবে।
বিএনপি ক্ষমতায় এলে যুক্তরাজ্যের আলোকে বিনামূল্যে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে বলেও জানান দলের স্থায়ী কমিটির এই সদস্য।
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, জনগণ এখন অনেক বেশী স্বাস্থ্য সচেতন, সময়ের এই পরিবর্তনের সাথে বিশ্বায়ন, তথ্য প্রযুক্তির সহজলভ্যতা জনমনের প্রত্যশা বৃদ্ধি করেছে বহুলাংশে। একইসাথে পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে দায়িত্বশীলতা, অসংক্রামক রোগ যেমন—হৃদরোগ, কিডনি রোগ, স্নায়ুতন্ত্রের রোগ, ক্যান্সার, উচ্চ রক্ত চাপের আশাঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি, সরকারি হাসপাতালে সেবার নিম্নমুখী প্রবণতা, ওষুধপত্রের উচ্চমূল্য, মহানগর ও নগর কেন্দ্রীক বিশেষায়িত সেবা, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে মানসম্মত চিকিৎসা সেবা পৌঁছানোর ব্যর্থতা, চিকিৎসক ও চিকিৎসা প্রার্থীদের মাঝে সম্পর্ক ও আস্থার প্রশ্ন, বেসরকারি স্বাস্থ্য সেবার উচ্চমূল্য, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সেবার চাহিদা বৃদ্ধি, পরিবেশ ও জলবায়ুর পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য বাজেটে অপর্যাপ্ত অর্থ সংস্থান ইত্যাদি বিষয় মান-সম্মত চিকিৎসা প্রদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা।
‘এর সাথে বিগত পনের বছর স্বাস্থ্য খাতে পরিকল্পিত উদাসীনতা ও দুর্নীতির ব্যাপকতার মাধ্যমে অতি সাধারণ চিকিৎসার জন্যও ক্রমবর্ধমান বিদেশ গমনের প্রবণতা, দেশীয় সেবার প্রতি জনগণকে বিমুখ করার ষড়যন্ত্রের বিষয়টি স্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্কারের অগ্রাধিকারের বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন’—যোগ করেন তিনি।
ওষুধ শিল্প আওয়ামী লীগের একজন ব্যক্তির কাছে এতদিন কুক্ষিগত ছিল অভিযোগ করে তিনি বলেন, স্বৈরাচার সরকারের দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে রোগীদের মধ্যে বিদেশমুখিতা বেড়েছিল। এতে দেশের স্বাস্থ্যখাত ভেঙে পড়ে।
এ সময় স্বাস্থ্য খাতের অচলাবস্থার জন্য বিগত সরকারের নানা অনিয়মকে দায়ী করেন ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। বলেন, বর্তমান সরকারের সংস্কার কার্যক্রমকে স্বাগত জানায় বিএনপি, তবে নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে সকল সংস্কার সম্ভব।
সনাতন চিকিৎসা পদ্ধতির আধুনিকায়ন গুরুত্বপূর্ণ
মোশাররফ হোসেন বলেন, মান সম্পন্ন মেডিকেল শিক্ষা ও স্নাতকোত্তর শিক্ষা ও দেশের জন্য উপযোগী চিকিৎসা গবেষণা, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা, ডায়াগনস্টিক রিপোর্টের বিশ্বাস যোগ্যতা, ওষুধের মূল্য, ইউনানী, কবিরাজী, হোমিওপ্যাথিসহ ঐতিহ্যগত সনাতন চিকিৎসা পদ্ধতির প্রভাব ইত্যাদি বিষয়ও বিবেচনায় অগ্রাধিকারে রাখা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার আলোচনায় প্রায়শই বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের অধীনে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকদের বিবেচনায় রেখে সকল পরিকল্পনা, নির্দেশনা ও নীতিমালা প্রণীত হয়, ফলে দেশে বিদ্যমান প্রচলিত ও ঐতিহ্যবাহী (Traditional Medicine) ইউনানি, আয়ুর্বেদিক, হোমিওপ্যাথি, কবিরাজি চিকিৎসা ব্যবস্থার অস্তিত্ব উপেক্ষিত হয়। এ অবস্থায় অতীতের প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থায় অধিকতর উন্নয়ন আধুনিকায়ন ও বৈজ্ঞানিক করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় গবেষণা ও বিবিধ সহায়তা প্রদান সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপির প্রস্তাবনায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ইউনিয়নভিত্তিক গ্রামীণ স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগ ও স্বাস্থ্য কার্ড প্রবর্তনসহ বিভিন্ন সংস্কারের সুপারিশ করা হয়। এর মধ্যে রোগী ও সেবাপ্রদানকারীদের জন্য সমতাভিত্তিক আইন প্রণয়ন ও পর্যায়ক্রমে ১০০ শয্যায় উন্নীত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন মেয়াদি প্রস্তাবনার কথা তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাবনা। সেগুলো হলো—
স্বল্পমেয়াদি (১-৩ বছর)
প্রতিরোধের মাধ্যমে সুরক্ষিত স্বাস্থ্য একটি কার্যকর পরিকল্পনা-প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়ে ইউনিয়ন সাব-সেন্টার উন্নয়ন ও পর্যাপ্ত সংখ্যক 'গ্রামীণ স্বাস্থ্য সহকারী' নিয়োগ করা হবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার গুণগত মান উন্নয়ন এবং কার্যকরী প্রাথমিক রেফারেল সেন্টার হিসেবে রূপান্তর, প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত সেবা নিশ্চিত করা, পুষ্টিবিদ ও পরিকল্পিত পরিবার ও জনসংখ্যার ব্যবস্থাপনা।
জেনারেল ফিজিশিয়ানের (জিপি) অধীনে প্রত্যেক নাগরিককে একজন সরকারী রেজিস্টার্ড চিকিৎিসকের অধীনে রাষ্ট্রীয় খরচে সর্বোত্তম স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থার প্রবর্তন।
বিদ্যমান দ্বিতীয় (জেলা ও সদর হাসপাতাল) এবং তৃতীয় স্তরের বিষেশায়িত স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ ও সঠিক রেফারেল সিস্টেম বাস্তবায়ন। কিডনি, ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্নায়ুরোগ চিকিৎসাসহ ২৪ ঘণ্টা হেল্পলাইন, জরুরি সেবা, দুর্ঘটনা পরবর্তী সেবা, দ্রুত রোগী স্থানান্তর ব্যবস্থাপনা।
স্বাস্থ্যসেবায় ন্যায় বিচার, রোগী ও সেবা প্রদানকারীর জন্য সমতাভিত্তিক আইন প্রণয়ন।
সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে চিকিৎসক ও রোগী সম্পর্ক উন্নয়নের কার্যকর ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও মিডিয়ার যথাযথ এবং ইতিবাচক ব্যবহার।
মধ্যমেয়াদি (১-৫ বছর)
স্বাস্থ্য কার্ড প্রবর্তন ও স্বাস্থ্য কার্ডের মাধ্যমে সুবিধা প্রবর্তন।
দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাবনা
তাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাবনায় রয়েছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও গবেষণা আন্তর্জাতিক চাহিদা পূরণে সক্ষম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং স্বাস্থ্য পর্যটন উপযোগী একটি আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যপরিকাঠামো নির্মাণ।
জরুরি স্বাস্থ্য সেবা
জরুরি স্বাস্থ্য সেবার আওতায় মাতৃসেবা, শিশু স্বাস্থ্যসেবা, জরুরি অস্ত্রপাচার সেবার সম্প্রসারণ, পরবর্তী সেবার ধাপে চিকিৎসা সেবার নিশ্চয়তার জন্য রেফারেল সার্ভিস প্রবর্তন, রোগী স্থানান্তরের জন্য অ্যাম্বুলেন্স সেবার নিশ্চয়তা বিধান এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম, যেমন—এক্স-রে, ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাম, ল্যাবরেটরি সরঞ্জাম ও অন্যান্য চিকিৎসা সহায়তা সংযুক্তকরণে আগ্রহী বিএনপি।
তাদের প্রস্তাবনায় আরও রয়েছে,
১. বিদ্যমান জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল ও বিশেষায়িত স্তরের স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালীকরণ ও সঠিক রেফারেল সিস্টেম বাস্তবায়ন।
২. জেলা হাসপাতালকে একটি অর্থবহ সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সংযুক্ত ইউনিট (Composite Unit Capable of Delivering Comprehensive Care in Health) হিসেবে প্রতিষ্ঠা।
এর আওতায় তারা নিচের পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন চায়, যথা—
১. বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় জেলা সদর হাসপাতালকে একটি অর্থবহ সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সংযুক্ত ইউনিট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
২. পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থার মাধ্যমে সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রদান করে রোগীদের জন্য সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য সুবিধা নিশ্চিত করা। কার্ডিওলজি, নেফ্রোলজি, গ্যাস্ট্রোএন্ট্রোলজি, অনকোলজি, পেডিয়াট্রিকস, গাইনোকোলজি, ইন্টেন্সিভ কেয়ার ইউনিটসহ, জরুরি পরিষেবা এবং অস্ত্রোপচারের সুবিধা, এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, আল্ট্রাসোনোগ্রাফি ইত্যাদি ব্যবস্থা সংযোজন করা।
সংবাদ সম্মেলনে প্রতিরোধের মাধ্যমে সুরক্ষিত স্বাস্থ্য একটি কার্যকর পরিকল্পনা-প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়ে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের উন্নয়ন ও ‘গ্রামীণ স্বাস্থ্য সহকারী’ নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি।
দলটি জানিয়েছে, এর মাধ্যমে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতকে শক্তিশালী করার জন্য ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং সংক্রামক অসংক্রামক উভয় ধরনের রোগের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে তারা। একই সঙ্গে, গ্রামীণ জনগণের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘গ্রামীণ স্বাস্থ্য সহকারী’ নিয়োগ করার কথা জানিয়েছেন তারা, যার ৭০ শতাংশই হবে নারী।
এ ছাড়াও সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিটি ইউনিয়নের ১০০% জনসংখ্যাকে সেবার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
শক্তিশালী রেফারেল সেন্টার
প্রস্তাবনা অনুযায়ী, বিদ্যমান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স-সেবার গুণগত মান উন্নয়ন এবং কার্যকরী প্রাথমিক রেফারেল সেন্টার হিসেবে রূপান্তর করবে বিএনপি।
এ ছাড়া আগামী ৫ বছরের মধ্যে ওষুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করার পাশাপাশি ওষুধ রপ্তানি ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নতকরণের জন্য ব্যবস্থা নেয়ারও সুপারিশ করা হয়।
এমইউ/
-
১১ জুন, ২০২৬
বরিশালে চিকিৎসক নিগ্রহের ঘটনায় উদ্বেগ
‘রোগীর চাপের মধ্যেও সেবা দেন চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীরা, তাদের ওপর হামলা উদ্বেগজনক’
-
০৭ জুন, ২০২৬
-
০৬ জুন, ২০২৬
-
০৭ মে, ২০২৬
-
১৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬