‘গ্রাম ও শহরের স্বাস্থ্যসেবায় বিভাজন রয়ে গেছে’
মেডিভয়েস রিপোর্ট: শহর বা গ্রামের কোনো অংশের মানুষকে সেবার বাইরে রেখে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্ভব নয়। অথচ নগর এলাকাতেও বহু মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বাইরে বসবাস করছেন। তা ছাড়া মোটাদাগে গ্রাম ও শহরের স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে বিভাজন রয়ে গেছে।
শনিবার (৩০ নভেম্বর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকদের বক্তব্যে এসব কথা উঠে এসেছে।
একইসঙ্গে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি ও স্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করার উপর জোর দেওয়া হয় এই গোলটেবিল বৈঠকে। ১২ ডিসেম্বর সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিবসকে সামনে রেখে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আর্ক ফাউন্ডেশন ও প্রথম আলো যৌথভাবে এটির আয়োজন করে।
বৈঠকে স্বাস্থ্য খাতে অপ্রতুল বরাদ্দের চিত্র তুলে ধরেন আর্ক ফাউন্ডেশনের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো দীপা বড়ুয়া। বাংলাদেশে ৬৭ শতাংশ মৃত্যু অসংক্রামক রোগে হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অসংক্রামক রোগ বিষয়ে সরকারের বরাদ্দ স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের মাত্র ৪.২ শতাংশ। দেশের বহু মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য খারাপ অবস্থায় থাকলেও এ বিষয়ে বরাদ্দ স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের এক শতাংশের কম। অন্যদিকে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কারণে এর কার্যকারিতা হ্রাস পেয়েছে। ২০১৯ সালে শুধু এ কারণেই দেশে ২৬ হাজার ২০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে জিডিপির ০.৭ শতাংশ বরাদ্দ হয় স্বাস্থ্য খাতে। এই বরাদ্দ দক্ষিণ এশিয়ার সব কটি দেশের তুলনায় কম।
আলোচনায় ছয়টি বিষয়ে উপর গুরুত্বারোপ করেন দীপা বড়ুয়া। এগুলো হচ্ছে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পদ্ধতি, অসংক্রামক রোগ ও মানসিক স্বাস্থ্য, অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হ্রাস, স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন, ডিজিটালাইজেশন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব।
এ সময় স্বাস্থ্য খাতে দুই ধরণের ব্যর্থতা দেখা গেছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে দুই ধরনের ব্যর্থতা দেখা গেছে। তা হচ্ছে নিয়ন্ত্রণজনিত ব্যর্থতা এবং ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত ব্যর্থতা। অনিয়ন্ত্রিত বেসরকারি খাত, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দুটি বিভাগ, মহাপরিচালকদের কাজে সমন্বয়হীনতা, জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে না ওঠা, গবেষণার ফলাফল কাজে না লাগা, লাগামহীন ওষুধ কোম্পানি—এগুলো নিয়ন্ত্রণজনিত ব্যর্থতার উদাহরণ।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব মু. হুমায়ুন কবির বলেন, মোটাদাগে গ্রাম ও শহরে স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বিভাজন দেখা যায়। গ্রামাঞ্চলের প্রতিষ্ঠানে চাপ বেশি, কাজের দ্বৈততা আছে। কমিউনিটি ক্লিনিকে যারা সেবা দিচ্ছেন, তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। অনেক স্থানে ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো প্রায় অকেজো অবস্থায়, অনেক স্থানে পদ খালি। এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দুটি বিভাগ করে একজন সচিবের পদ তৈরি হওয়া ছাড়া উল্লেখযোগ্য কিছু হয়নি।
‘ডিজিটাল হেলথ’ দরকার উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে বেশ কিছু এমআইএস (ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম) হতে দেখা যাচ্ছে। এমআইএস আর ডিজিটাল হেলথ এক জিনিস নয়। কিন্তু দরকার ডিজিটাল হেলথ। দ্রুত না করা হলে দেশ এর সুফল পাবে না।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, শহর বা গ্রামের মানুষকে বাইরে রেখে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্ভব নয়। নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির মাধ্যমে শিশু, নারী ও পুষ্টিসেবা দেওয়া হয়। এই সেবা দেওয়া হয় দরিদ্র ও অতিদরিদ্রদের। শহরের মধ্যবিত্তরাও এই সেবার বাইরে। এর অর্থ নগরের বহু মানুষ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বাইরে।
অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সদস্য আবু মুহাম্মদ জাকির হোসেন গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে বলেন, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা হচ্ছে উদ্দেশ্য। উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে কৌশল দরকার। স্বাস্থ্যে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় কমানোর জন্য ব্যক্তি বিমা নাকি জাতীয় বিমা সঠিক, তা নিয়ে আরও আলোচনা দরকার। সেবার মান তত্ত্বাবধান অনলাইনে করা ঠিক নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংখ্যাগত বিষয় অনলাইনে দেখভাল করা যায়, কিন্তু সেবার মান দেখতে হবে সরেজমিন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির সাবেক পরিচালক খালেদা ইসলাম, নাগরিক সংগঠন বাংলাদেশ হেলথ ওয়াচের আহ্বায়ক আহমদ মোশতাক রাজা চৌধুরী, আইসিডিডিআরবির মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য কর্মসূচির পরিচালক শামস এল আরেফিন, এফসিডিওর স্বাস্থ্য উপদেষ্টা রাশিদ জামান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টসের ফোকাল পয়েন্ট সুব্রত পাল, আর্ক ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুমানা হক ও প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি শিশির মোড়ল গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।
এনএআর/