১৩ জুলাই, ২০২৩ ০৪:৪৯ পিএম

যাদের অনুপ্রেরণায় রামেবির ফাইনাল প্রফে সেরা ডা. সিরাজুম মুনিরা

যাদের অনুপ্রেরণায় রামেবির ফাইনাল প্রফে সেরা ডা. সিরাজুম মুনিরা
ডা. সিরাজুম মুনিরা।

রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (রামেবি) অধিভুক্ত ২৪টি মেডিকেল কলেজের নভেম্বর-২০২২ এমবিবিএস চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষায় প্রথম হয়েছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের (রামেক) ৫৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ডা. সিরাজুম মুনিরা। গত ৯ জুলাই প্রকাশিত ফলাফলে এক হাজার ৯২২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে কৃতকার্য ১ হাজার ৩৭৮ জন চিকিৎসকের মাঝে একমাত্র অনার্স মার্ক পাওয়া শিক্ষার্থী তিনি।

বাবা-মা ও পরিবারের অনুপ্রেরণায় ছোটবেলা থেকে পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলেন ডা. মুনিরা। সেই সঙ্গে কঠোর অধ্যাবসায় ও নিয়মিত প্রচেষ্টায় তাঁকে পাঠাভ্যাসে অনন্য করে তোলে। সব শ্রেণিতেই থাকতেন শীর্ষসারির একজন। বুধবার (১২ জুলাই) বিকেলে নবীন এ চিকিৎসকের সঙ্গে কথা হয় মেডিভয়েস প্রতিবেদকের। আলাপচারিতায় উঠে আসে চিকিৎসা পেশা ঘিরে তাঁর পরিকল্পনাসহ ঈর্ষণীয় সাফল্যের নেপথ্য কথা।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: সাখাওয়াত হোসাইন

মেডিভয়েস: আপনার অনুভূতি জানতে চাই।

ডা. সিরাজুম মুনিরা: মহান আল্লাহর কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা। ভালো ফলাফল করতে পেরে অনেক ভালো লাগছে। সত্যি বলতে, আমি কখনও ভাবিনি এতো ভালো ফলাফল করতে পারবো। সব মিলিয়ে অনেক ভালো লাগছে।

মেডিভয়েস: কোন অনুপ্রেরণায় এ পর্যন্ত আসা?

ডা. সিরাজুম মুনিরা: আমার মূল অনুপ্রেরণা বাবা-মা, আমার পরিবার। পরিবারে কোনো চিকিৎসক নেই, তাই আমার আব্বুর অনেক ইচ্ছা ছিল আমাকে ডাক্তার বানাবেন। আমি অনেক খুশি তাঁর এই ইচ্ছা পূরণ হয়েছে। আমার পরিবার আমাকে অনেক উৎসাহিত করেছে, পরিবারের একজন চিকিৎসক থাকতে উপযুক্ত পরামর্শ পাওয়া যায়। তা ছাড়া আব্বু চিকিৎসা পেশা অনেক পছন্দ করেন। চিকিৎসক হলে মানুষকে কাছ থেকে সেবা দেওয়া যায়। এভাবে আমাকে তাঁরা উৎসাহিত করতেন। আত্মীয়-স্বজন অনেক উৎসাহ জুগিয়েছেন। শিক্ষকদের কথা বলতেই হয়, তাদের কাছে আমি অনেক কৃতজ্ঞ। তাঁরা অনেক আন্তরিকতার সাথে আমাদেরকে শিখিয়েছেন এবং সকলক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছেন। তা ছাড়া আমার বন্ধু-বান্ধব, সিনিয়রদের অনেক ভূমিকা ছিল। সবার সহযোগিতায় আমি এ পর্যন্ত আসতে পেরেছি, যা আমার একার পক্ষে কখনই সম্ভব ছিল না।

মেডিভয়েস: এমবিবিএসের পাঁচ বছরের পথ-পরিক্রমা কেমন ছিল? দিনগুলো কীভাবে কাটিয়েছেন?

ডা. সিরাজুম মুনিরা: এমবিবিএসের পুরো সময়টা মোটেও সহজ ছিল না। বিশেষ করে শুরুর দিনগুলো আমার জন্য অনেক কঠিন ছিল। কারণ প্রথমবারের মতো নিজের পরিবার এবং এলাকা ছেড়ে এতো দূর এসেছিলাম। তার মধ্যে হোস্টেলের নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে অনেক সমস্যা হচ্ছিল। প্রায় সবসময়ই বাড়ির কথা মনে পড়তো, অনেক খারাপ লাগতো। তারপর ধীরে ধীরে যখন পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে লাগলাম, তখন আর অতটা খারাপ লাগেনি। আর আমাদের প্রতি দিন অনেক ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে কাটে। প্রতি দিন লেকচার, ক্লাস, টিউটোরিয়াল, ওয়ার্ড, ইভেনিং আর প্রতিদিনই পরীক্ষা থাকে। এসব নিয়ে যখন ব্যস্ত হয়ে পড়লাম, তখন এই পরিবেশটার সাথে মিশে গেলাম। এভাবেই কেটে গেছে পাঁচ বছর।

সিনিয়রদের কাছ থেকে অনেক পরামর্শ নিতাম, আমাদের চারটা প্রফেশনাল পরীক্ষা। সব প্রফেশনাল পরীক্ষায় নতুন নতুন সাবজেক্ট যোগ হতো। সেগুলো নিয়ে সিনিয়রদের সাথে আলোচনা করতাম এবং তাঁরা বিভিন্ন পরামর্শ দিতেন। সেই অনুযায়ী চলার চেষ্টা করতাম। বন্ধু-বান্ধবদেরও সহযোগিতা নিতাম। আর মেডিকেলে একা একা চলা যায় না। কারণ বিভিন্ন বিষয়ে গ্রুপ স্টাডি করতে হয়। যেটা আমি বুঝি না, সেটা আমি আমার বন্ধু-বান্ধবদের থেকে বুঝে নিতাম এবং আমি যেটা পারতাম, তাদেরকে সেটা বুঝিয়ে দিতাম।

মেডিভয়েস: কোন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে চান এবং কেন?

ডা. সিরাজুম মুনিরা: সার্জারিতে ক্যারিয়ার গড়ার ইচ্ছা আছে, বাকিটা আল্লাহর উপর। সার্জারি আমার কাছে খুব ভালো লাগে। আমি যখন দেখি, অপারেশনের পর রোগী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে, তখন এই ব্যাপারটা আমাকে অনেক মুগ্ধ করে। শিক্ষাজীবনে যতটুকু দেখেছি, অত্যন্ত যত্ন এবং দক্ষতার সাথে এই কাজগুলো করতে হয়। এতে অনেক সাহসও লাগে, তারপরও আমার কাছে মনে হয়, আমি পারবো। এ ছাড়া আমাদের দেশে মেয়ে সার্জনের সংখ্যা অনেক কম। অনেক মেয়েই আছেন, যারা পুরুষ সার্জনের কাছে যেতে সংকোচবোধ করেন। আমি সার্জন হতে পারলে মেয়েদেরকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সেবা দিবো।

মেডিভয়েস: পরীক্ষার প্রস্তুতি ও কৌশল সম্পর্কে জানতে চাই।

ডা. সিরাজুম মুনিরা: আমাদেরকে প্রতিদিনই পড়াশোনা করতে হয়, প্রতিদিনই পরীক্ষা ও আইটেম থাকে। কার্ড, টার্ম তো লেগেই থাকে। এ ছাড়া প্রফেশনাল পরীক্ষাতো আছেই। আর ফাইনাল ইয়ারে কম সময় পাই। অল্প সময়ে অনেক বড় সিলেবাস শেষ করতে অনেক কষ্ট হয়েছে।

স্যার-ম্যামরা ক্লাসে যা বলতেন, আমি তা অনুসরণ করতাম এবং ভালোভাবে খেয়াল করতাম। স্যার-ম্যামরা গুরুত্বপূর্ণ যা বলতেন, সেগুলো টেক্সবুক থেকে একবার এসে দেখে নিতাম। যাতে এই ব্যাপারটা সম্পর্কে পুরো স্পষ্ট ধারণা রাখতে পারি। যা বুঝতাম না, তা বিভিন্ন মাধ্যমে দেখে নিতাম এবং শিক্ষকদের কাছে থেকে জেনে নিতাম। মোট কথা যেকোনো বিষয় বুঝে পড়ার চেষ্টা করতাম, যাতে বহুদিন স্মরণে রাখতে পারি। আর অল্প অল্প করে প্রতিদিনই পড়েছি, যাতে পরীক্ষার আগে পড়া জমে না থাকে, বারবার পড়তাম।

মেডিভয়েস: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাই।

ডা. সিরাজুম মুনিরা: এখন ইন্টার্নশিপ মনোযোগ দিয়ে করার ইচ্ছা এবং ভালোভাবে কাজ শিখার ইচ্ছা আছে। আমার যা দায়িত্ব, তা যেন সঠিকভাবে পালন করতে পারি। এরপর বিসিএস এবং পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনের জন্য পড়াশোনার করার পরিকল্পনা। ভবিষ্যতে দেশের মানুষকেই সেবা দেওয়ার ইচ্ছা, বিদেশ যাওয়ার সুযোগ পেলেও যাওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই। উচ্চতর শিক্ষার জন্য বিদেশ যাওয়া লাগলে যাবো। তবে বিদেশে স্থায়ীভাবে থাকার কোনো স্বপ্ন বা ইচ্চা জাগে না।

মেডিভয়েস: এমবিবিএস লাইফে অনেকে নানা কারণে বিপথগামী হয়ে যায়, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কি?

ডা. সিরাজুম মুনিরা: মেডিকেলে যারা আসেন, তাঁরা সবাই অনেক মেধাবী। হঠাৎ করে নতুন পরিবেশে আসার পর অনেকেরই মানিয়ে নিতে সমস্যা হয়, পড়াশোনার চাপও অনেক থাকে। সেইসঙ্গে অনেক পরিশ্রমও করতে হয়। অনেকেই এটা করতে পারে না, ধীরে ধীরে পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে পড়ে। তখন দেখা যায়, হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং কেউ কেউ অন্য পথ বেঁছে নেয়। তাদেরকে পরামর্শ হলো ধৈর্য ধারণ করার এবং পরিশ্রম করতে থাকার। ফলাফল আশানুরুপ নাও হতে পারে, হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে। কাজেই সফলতা একদিন আসবেই।

মেডিভয়েস: আপনার আশেপাশের অনেক বন্ধু-বান্ধব অকৃতকার্য হয়েছেন। তাদের জন্য কি পরামর্শ দিবেন?

ডা. সিরাজুম মুনিরা: এটা খুবই দুঃখজনক ব্যাপার। যারা অকৃতকার্য হয়েছেন, তাদের জন্য পরামর্শ হলো ধৈর্যধারণ করা। আর মেডিকেল লাইফে ভাগ্যও বড় একটা ব্যাপার। অনেক ভালো প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা খারাপ হয়ে যেতে পারে। তাই বলে তিনি খারাপ শিক্ষার্থী, তা নয়। যারা অকৃতকার্য হয়েছেন, যেকোনো কারণে হয়তো তাদের ভাগ্য সহায় হয়নি। তাদেরকে বলবো, হতাশ হওয়া যাবে না। মনোবল ধরে রাখতে হবে। সামনে পরীক্ষা আসছে, সেই পরীক্ষায় ভালো করার জন্য নিজেকে যথাসম্ভব প্রস্তুত করতে হবে।

বেড়ে ওঠা

ডা. মুনিরার জন্ম ও বেড়ে ওঠা বগুড়া জেলার শাজাহানপুর উপজেলার খোট্টাপাড়া ইউনিয়নের জালশুকা গ্রামে। বাবা-মা ও তিন ভাই-বোন নিয়ে তাঁর পরিবার। বাবা খোট্টাপাড়া ফাযিল মাদরাসার সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। মা গৃহিনী। বাবার মাদরাসা থেকেই ডা. মুনিরার পড়ালেখার হাতেখড়ি হয়। খোট্টাপাড়া ফাযিল মাদরাসা থেকে ২০১৫ সালে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাস করেন তিনি। এরপর ২০১৭ সালে বগুড়া শহরের পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন এ মেধাবীমুখ। ২০১৭-১৮ সেশনে এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষায় জাতীয় মেধায় সারাদেশে ৯১৯তম হয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘ যাত্রা শেষে নামের পূর্বে ডাক্তার লিখার সুযোগ হয়েছে মুনিরার। তাঁর পরিবারের একমাত্র চিকিৎসক তিনি।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : ফাইনাল প্রফে সেরা
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক