১৮ এপ্রিল, ২০২৩ ১২:৩৫ পিএম

ঢাবির দ্বিতীয় প্রফে তৃতীয় বিদেশি শিক্ষার্থী মেহবিশ: হতে চান মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

ঢাবির দ্বিতীয় প্রফে তৃতীয় বিদেশি শিক্ষার্থী মেহবিশ: হতে চান মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
মেহবিশ বাবা। ছবি: মেডিভয়েস

চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে চার বছর আগে ভারতের কাশ্মীর থেকে বাংলাদেশে আসেন মেহবিশ বাবা। স্বপ্ন ছুঁতে মনোনিবেশ করেন কঠোর অধ্যাবসায়ে। সেটির প্রমাণ রাখেন এমবিবিএস দ্বিতীয় পেশাগত পরীক্ষায়।

গত ১১ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধিভুক্ত মেডিকেল কলেজগুলোর নভেম্বর ২০২২ এমবিবিএস দ্বিতীয় পেশাগত পরীক্ষায় তৃতীয় হন মেহবিশ বাবা। প্রায় ছয় হাজার মেডিকেল শিক্ষার্থীর মাঝে এ কৃতিত্ব অর্জন করেন সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের এ শিক্ষার্থী।

সম্প্রতি মেধাবী এ শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয় মেডিভয়েসের। আলাপচারিতায় উঠে আসে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও ঈর্ষণীয় সাফল্যের নেপথ্য কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: সাখাওয়াত হোসাইন, ক্যামেরায় ছিলেন আব্দুল লতিফ সাদ্দাম।

মেডিভয়েস: প্রায় ছয় হাজার মেডিকেল শিক্ষার্থীর মাঝে তৃতীয় হয়েছেন, আপনার অনুভূতি জানতে চাই।

মেহবিশ বাবা: প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফলাফল করায় আমার কাছে অনেক ভালো লাগছে। তৃতীয় স্থান অর্জন করবো, আমি চিন্তাও করিনি। আমি খুবই আনন্দিত।

মেডিভয়েস: ভিন্ন দেশে ও ভিন্ন কালচারে এসে এতো ভালো করলেন, আসলে আপনার অনুপ্রেরণার গল্পটা জানতে চাই?

মেহবিশ বাবা: ভালো ফলাফলের জন্য আমার ফ্যাকাল্টির অবদান রয়েছে। শিক্ষক ও ব্যাচমেটরা অনেক সহযোগিতা করেছেন। পড়াশোনায় যেকোনো সমস্যায় তারা আমাকে সহযোগিতা করেছেন।

মেডিভয়েস: আপনার পড়াশোনার কৌশল কেমন ছিল?

মেহবিশ বাবা: শুরু থেকে ভালোভাবে পড়াশোনা করার চেষ্টা করেছি। প্রতিদিনের পড়া প্রতিদিন শেষ করেছি। আইটেম, টার্ম ইত্যাদি ভালোভাবে দিয়েছি, এতে এমনিতেই প্রফেশনাল পরীক্ষার প্রস্তুতি হয়ে যেতো। আমাদের কলেজের (এনাম মেডিকেল) শিক্ষকরাও খুব আন্তরিক। তাঁরা যথাসময়ে সিলেবাস শেষ করেছেন। তাদের অবদানও অতুলনীয়।

আর যে পড়াটা কম পারতাম, তা বারবার রিভিশন দিতাম। শিক্ষকরা যেসব পড়া দিতেন, তা সম্পূর্ণ করতাম। আমি পড়ার পর ভুলে যেতাম, এটা সম্ভবত সবারই হয়। দুদিন আগে যা পড়েছি, তা ভুলে গেছি। আমার আম্মু আমাকে বলতেন, তুমি নিয়মিত রিভিশন দিতে থাকবা, তুমি পারবা। মানুষের স্বাভাবই ভুলে যাওয়া, তবে বারবার রিভিশন দিতে হবে।

মেডিভয়েস: কোন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হতে চান?

মেহবিশ বাবা: আমি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ হতে চাই। এটি অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় একটু ভিন্ন। সহজেই রোগীর রোগ নির্ণয় করতে পারবো। মেডিসিন নিয়ে কাজ করার মতো অনেক জায়গা আছে।

মেডিভয়েস: বাংলাদেশে মেডিকেল পড়া কেমন উপভোগ করছেন?

মেহবিশ বাবা: বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক ভালো। প্রতিদিন আইটেম হয়, প্র্যাক্টিক্যাল ও থিউরিটিক্যাল ক্লাসগুলোতে খুব গুরুত্বের সাথে পড়ানো হয়। এতে ঘাটতি থাকা পড়াগুলো ভালোভাবে পড়া হয়ে যায়। অন্যান্য দেশের তুলনায় এদেশের মেডিকেল শিক্ষাব্যবস্থা ভালো। শিক্ষকরাও খুব আন্তরিক। বাংলাদেশ খুব ভালো লাগে। আর আমি মেডিকেলের পড়াশোনা খুব উপভোগ করি। আমি কোনো কিছু না বুঝলে, শিক্ষকদের স্মরণাপন্ন হই। পড়াশোনা কঠিন লাগলে শিক্ষকরা সহজ করে দেন।
 
মেডিভয়েস: আপনার শিক্ষকদের অবদান কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মেহবিশ বাবা: এই পর্যন্ত আসার পেছনে শিক্ষকদের অবদান অতুলনীয়। এটা সত্য কথা, আমারও কঠোর পরিশ্রম করা লেগেছে। শিক্ষকদের সঠিক গাইডলাইন না দিলে ,আমি ভালো কিছু করতে পারতাম না। ঠিক সময়ে সিলেবাস শেষ করা নিশ্চিত করেছেন আমার লেকচারার ও অধ্যাপকরা। তাঁরা অনেক বেশি সহযোগিতা করেছেন।
 
মেডিভয়েস: আপনার কাছে বাংলাদেশের মানুষের জীবনাচার ও এ দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে চাই?

মেহবিশ বাবা: এখন একটু কঠিন সময় যাচ্ছে। মা-বাবাকে খুব মিস করি, কিন্তু মানিয়ে নিতে হয়। কয়েক বছর পর তো ডাক্তার হয়ে যাবো। তখন আর কিছু চাওয়া থাকবে না। বাংলা ভাষা অনেক ভালো লাগে। বাংলা সবকিছুই এখন বুঝতে পারি, কিন্তু বলতে কষ্ট হয়।

বাংলাদেশ আর কাশ্মীরের খাবারের মধ্যে একটু পার্থক্য আছে। প্রায় চার বছর হলো এদেশে এসেছি। এখন পুরোপুরি মানিয়ে নিয়েছি, তাই এই দেশের খাবার-দাবার ভালোই লাগে। খিচুরি, মাংস বেশি ভালো লাগে। আর আমি বেশি বাংলা খাবার খাই না, মাঝে মাঝে খাওয়া হয়।

মেডিভয়েস: দেশের বাইরে এসে আত্মীয়-স্বজনের কথা কতটুকু মনে পড়ে? কার কথা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে?

মেহবিশ বাবা: আত্মীয়-স্বজনকে অবশ্যই মিস করি। পরিবারের কথা খুব মনে পড়ে। জীবনে ভালো কিছু করতে হলে তো কষ্ট করতেই হবে।

মেডিভয়েস: বাংলাদেশে যারা মেডিকেলে পড়তে আসতে চায়, তাদের উদ্দেশ্য কি বলবেন?

মেহবিশ বাবা: আমিও ভিন্ন একটি (বাংলাদেশ) দেশের পড়াশোনা করছি। অন্যান্য দেশের চেয়ে এদেশের মেডিকেল শিক্ষাব্যবস্থা ভালো। এখানের শিখন পদ্ধতি ভালো। এই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা প্রশংসনীয়। 

মেডিকেলের বন্ধুদের চোখে মেহবিশ

জানতে চাইলে মেহবিশ বাবার ব্যাচমেট ও এনাম মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম রাব্বি বলেন, মেহবিশ বাবা এমবিবিএস প্রথম বর্ষ থেকেই পড়াশোনার প্রতি খুব আগ্রহী। তাঁকে দেখে একজন অনুকরণীয় মানুষ হিসেবে মনে করতাম। আমারা মেহবিশকে ফলো করার চেষ্টা করতাম।

মেহবিশের আরেক ব্যাচমেট রকিবুল হাসান রোমিও বলেন, মেহবিশ বাবা সত্যিকার মেধাবী। বলতে গেলে সবদিক দিয়েই দক্ষ। এক্ট্রা কারিকুলামেও সমানভাবে সক্রিয়। তাকে বলা যায়, মাল্টি ট্যালেন্টেড।

শিক্ষক ও কলেজ কর্তৃপক্ষের ভূমিকা

জানতে চাইলে এনাম মেডিকেলের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মিথুন আলমগীর বলেন, আমরা যখন একটা শিক্ষার্থীকে পাই, শুরু থেকে আমাদের পক্ষ থেকে পড়াশোনার কোনো ঘাটতি রাখা হয় না। তাদের ক্লাস নেওয়া, ক্লাস টেস্ট, ইন্টারনাল পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট ছাড়াও শিক্ষার্থীদের দক্ষতা অর্জনে অনেক পরীক্ষা নেওয়া হয়। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেশনাল পরীক্ষার সময় চলে আসে, তখন দেখা যায়, পরীক্ষার আগেই তাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, এই কলেজের শিক্ষকরা সবাই দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। প্রত্যেকেই প্রত্যেকের স্থানে স্বয়ং সম্পন্ন। তাঁরা তাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করে যান। শিক্ষার্থীদের পরিচর্যায় কোনো ঘাটতি রাখা হয় না।

এ প্রসঙ্গে এনাম মেডিকেল কলেজের চেয়ারম্যান, ত্রাণ ও দুর্যোগ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেন, আমাদের প্রতিটি বিভাগ স্বয়ং সম্পন্ন। পর্যাপ্ত পরিমাণে ফ্যাকাল্টি আছে। আর মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে ফ্যাকাল্টির উপর জোর দিয়েছি। শুরুতেই পর্যাপ্ত পরিমাণে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দিনে দিনে শিক্ষকের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছি। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) কারিকুলামের নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছি। প্রাইভেট সেক্টরে আমরাই একমাত্র বিএমডিসির শিক্ষক নিয়োগের শর্ত পূরণ করেছি।  

মন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের মান উন্নয়নে পর্যাপ্ত ল্যাব করা হয়েছে। সমৃদ্ধ লাইব্রেরি আছে। সেইসঙ্গে ছাত্র-ছাত্রীদের প্র্যাক্টিক্যাল শিক্ষার জন্য এক হাজার শয্যার বিশাল একটি হাসপাতাল তৈরি করা হয়েছে। যেখানে অসংখ্য রোগী সবসময় ভর্তি থাকে। তাতে মেডিকেল সাইন্সের যত ধরনের বিভাগ রয়েছে, সব ধরনের বিভাগ আমরা খুলতে পেরেছি। এতে ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষার ভালো করার সুযোগ পায়। এজন্য প্রথম ব্যাচ থেকে শিক্ষার্থীরা ফলাফল ভালো করে আসছে। ক্রমান্বয়ে ভালো ফলাফল করা ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বাড়ছে। 

এবার মেহবিশ বাবা ছাড়াও তিন শিক্ষার্থী দ্বিতীয় পেশাগত পরীক্ষায় অনার্স মার্ক পেয়েছে। গত বছরও দ্বিতীয় পেশাগত পরীক্ষায় ২৪জন অনার্স মার্ক পেয়েছিল। এটি আমাদের জন্য বিশাল সফলতা। আমাদের প্রচেষ্টা ও পরিশ্রম সফল হয়েছে। সবমিলিয়ে আমরা খুব অনুপ্রাণিত। আগামী দিনগুলোতে এটি আমাদেরকে আরও উৎসাহ দিবে, যোগ করেন প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান।

এএইচ

 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত