পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুতে যেন বিষাদে না হারায় ঈদ আনন্দ
আলী হোসাইন: আনন্দ ভাগাভাগি করতে ঈদের ছুটিতে শহর থেকে পরিবার নিয়ে গ্রামের দিকে মানুষের স্রোত বয়ে যায়। বাড়িতে পৌঁছানোর পর পরিবারের বড় সদস্যাদের তুলনায় শিশুরা দাদা-নানা ও খালা-ফুফুদের সঙ্গে অনেক বেশি ঈদআনন্দে মেতে উঠে। তবে একটু অসচেতনতা এ আনন্দকে বিষাদে পরিণত করতে পারে। কারণ শহরের শিশুরা নিজেদের বা আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে বিভিন্ন দুর্ঘটনার শিকার হয়। এর মধ্যে অন্যতম পানিতে ডুবে করুণ মৃত্যু। সাঁতার না জানার কারণে পুকুর বা নদীতে নেমে গোসল করতে গেলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। বিশেষজ্ঞরাও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ ধরনের মৃত্যু থেকে রক্ষা পেতে তাঁরা দিয়েছেন বিভিন্ন পরামর্শ।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ মেডিভয়েসকে বলেন, দেশে বছরে প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হলো শিশু। বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান বড় কারণ পানিতে ডুবা। শিশুরা পানিতে পড়লে মুহূর্তের মধ্যেই তার মৃত্যু হতে পারে। খুব অল্প পানিতেও শিশু মারা যেতে পারে।
এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেন, ঈদের সময় শহর থেকে গ্রামে অনেক শিশু বেড়াতে যায়। এ সময় শিশুরা পুকুর, নদী-নালা দেখলে নেমে পড়ে। তারা যেহেতু অনেকে সাঁতার জানে না, যার কারণে পানিতে ডুবে যায়। এ ছাড়া অনেকে ঈদে ভ্রমণে যান। সেখানে দেখা গেছে শিশুরা সমুদ্রে নেমে পড়ে অথচ সাঁতার জানে না। ফলে ডুবে মারা যায়।
বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ
পানিতে ডুবা একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ এবং বিশ্বব্যাপী দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর তৃতীয় প্রধান কারণ বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)। সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশে শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণগুলোর একটি পানিতে ডুবে যাওয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (ডব্লিউএইচও) ডুবে যাওয়া রোধে বিভিন্ন কৌশল ও পদক্ষেপ সুপারিশ করে এবং একটি মাল্টিসেক্টরাল উদ্যোগের প্রচার করে যাচ্ছে। মাল্টিসেক্টরাল সহযোগিতা বৃদ্ধি, ডুবে যাওয়া প্রতিরোধে শক্তিশালী নেতৃত্ব এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে, এই ট্র্যাজেডি রোধ করতে এবং সবার জন্য একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যত অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করছে ডব্লিউএইচও।
পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যুকে বড় একটি উদ্বেগের জায়গা জানিয়ে অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, এটি একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বছরে ছয় থেকে সাত হাজার মানুষ মারা যায়, এমন রোগ আমাদের দেশে খুব কম আছে। টিবিতে হয়তো অনেক বেশি মারা যায়। এরপরেই পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার সংখ্যা। সাপের কামড়েও অনেক মানুষ মারা যায়। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো-পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু।
উদ্বেগের কারণ হিসেবে আইইডিসিআরের সাবেক এই প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলছেন, বর্তমানে আমাদের দেশে অধিকাংশ মানুষ দুটি বা একটি সন্তান নিয়ে থাকেন। একটি পরিবারে যদি একটা দুটো বাচ্ছা থাকে। সে একটা দুটো বাচ্ছা যদি পানিতে ডুবে মারা যায়, তাহলে পরিবারের জন্য এটি বিশাল ক্ষতি।
পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর নানা কারণ গবেষকেরা খুঁজে বের করেছেন। মা ও অভিভাবকদের গাফিলতি আর সাঁতার না জানাকেই মূল কারণ হিসেবে শনাক্ত করে ব্যবস্থাপত্র জারি হয়েছে। পানিতে ডুবে মৃত্যু ঠেকাতে গ্রামে গ্রামে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য দিবাযত্ন কেন্দ্র চালু করা, ছয় বছর বা তার চেয়ে বড় শিশুদের জন্য সাঁতার শিক্ষার ব্যবস্থার কথাও বলা হচ্ছে। তবে এ ছাড়াও মৃগী রোগে আক্রান্ত শিশুরা পানিতে ডুবে মারা যাওয়া আশঙ্কা অনেক বেশি।
হঠাৎ খিঁচুনি দিয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঝোঁক আছে—এমন শিশুদের পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার ঘটনা একেবারেই কম নয়। খিঁচুনি আমাদের দেশে সাধারণভাবে এটা মৃগীরোগ নামে পরিচিত। গবেষকরা বলছেন, মৃগীরোগে আক্রান্ত শিশুরা পানিতে পড়ে গেলে দ্রুত জ্ঞান হারানোর আশঙ্কা বেশি। আর যাদের মৃগীরোগ নেই, তাদের ঝুঁকি অপেক্ষাকৃত কম।
এ বিষয়ে ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, মৃগী রোগে আক্রান্ত শিশুরা যাতে পানিতে নেমে গোসল করতে না পারে, সেজন্য অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে। তাদেরকে পানি তুলে গোসল করাতে হবে। কারণ, সাঁতার কাটার সময় বা নদীতে নামার পর যদি মৃগি রোগটা দেখা দেয়, তাহলে সে অজ্ঞান হয়ে পানির নিচে ডুবে যাবে।
জানতে চাইলে বারডেম জেনারেল হাসপাতালের শিশুরোগ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা মেডিভয়েসকে বলেন, ঈদের ছুটিসহ যে কোনো ছুটিতেই শহরের শিশুদের নিয়ে যখন গ্রামে গঞ্জে যাবেন, তখন স্বাভাবিকভাবে গ্রামে খোলামেলা জায়গা পেয়ে শিশুরা দৌড়াদৌড়ি ও ছুটে বেড়ায়। শহরের বন্দি জীবন থেকে একটু যখন মুক্ত হয়, তখন শিশুরা আনন্দে মেতে উঠে। এ সময় বাড়ির ছাদ ও গাছের ওপর উঠে যায় তারা। নেমে যায় ডোবা, নদী বা জলাশয়ে। ফলে যেহেতু তারা এগুলোতে অভ্যস্ত নয়, তাই ছাদ বা গাছে থেকে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হয় এবং অনেক সময় পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করে।
তিনি বলেন, নদী-মাতৃক আমাদের দেশে মারা যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ পানিতে ডুবা। বিশেষ করে বৃষ্টির সময় বাড়ির আশপাশের ছোট ডোবা, নর্দমা, পুকুর ও খানাখন্দ পানিতে ভরা থাকে। এ জন্য ছোট শিশুরা সহজে পানিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে শিশুরা শুধু নদী, পুকুর ও জলাশয়ে ডুবে মারা যায়, এমন নয়। বাথরুমে ঢাকনাবিহীন বালতিতে রাখা পানিতে পড়েও মৃত্যুবরণ করতে পারে। অর্থ্যাৎ শিশুরা ঘরের পানির মধ্যে মারা যেতে পারে, আবার বাইরেও মারা যেতে পারে।
তিনি পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার কয়েকটি কারণ বলেছেন। সেগুলো হলো:
১. বেশিরভাই শিশুই সাঁতার না জানার কারণে পানিতে ডুবে মারা যায়। বিশেষ করে শহরের শিশুরা তো সাঁতার জানেই না। এখন শহরে গ্রামে সব জায়গায় ঘরের ভেতর সব ব্যবস্থা করা হয়, ফলে শিশুদের সাঁতার শিখার আর সুযোগ থাকে না।
২. পানির প্রতি শিশুদের একটি আকর্ষণ রয়েছে। বাড়ির আশপাশের ডোবা বা পুকুরে পানি দেখতে গিয়ে হঠাৎ পা পিছলে পড়ে যায়।
৩. বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুকুর চার পাশে কোনো বেড়া থাকে না। সুতরাং যে কোনো জায়গা দিয়ে বাচ্ছা পানিতে পড়ে যেতে পারে।
এ প্রখ্যাত শিশু বিশেষজ্ঞ বলেন, এখন বৈশাখ মাস, কোথাও তেমন পানি নেই। এজন্য বাইরে দুর্ঘটনার শঙ্কা কম। তবে ঘরের ভেতরে বাথ রুমে যে পানি ভর্তি বালতি থাকে, সে বালতির ওপরে কোনো কাভার না থাকলে দেখা গেল এক বছরের একটি শিশু মাথা ডুবে দিলে এবং উল্টো হয়ে গেলো, আর উঠতে পারছেন না—এ অবস্থায় মারা গেল। তাই এসব দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে শিশুদের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে শিশুদের জলাশয় ও বাথরুমে বালতির ধারে যেতে না দেওয়া। যারা শিশুদের নিয়ে বাড়িতে যাবেন, তারা বাড়ির পাশে থাকা পুকুর ও জলাশয়ের চারপাশে বেড়া দিবেন এবং ঘাটের কাছে দরজার ব্যবস্থা করবেন।
এ বিষয়ে মাতুয়াইল শিশু মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. তানিয়া ইসলাম মেডিভয়েসকে বলেন, রাজধানীসহ জেলাশহরগুলোতে পানি বেষ্টিত জায়গা খুব কম। যেমন পুকুর, নদী এগুলো একটু কমই থাকে। গ্রামে সাধারণত নদী, খাল-বিল নর্দমা পুকুর বেশি থাকে। ঈদের সময় যেহেতু সবাই গ্রামে বাড়ি যায়, তখন যাদের বাড়ির পাশে পুকুর, ছোট জলাশয় ও ডোবা থাকে, সেগুলোতে শিশুরা নেমে পড়ে। এ সময় সাঁতার না জানার কারণে তারা দুর্ঘটনার শিকার হয়।
ডা. তানিয়া বলেন, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার গ্রামাঞ্চলেই বেশি। তবে শহরে যে একেবারেই কম, তা নয়। বালতিতে ধরে রাখা পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার সংখ্যাও কম নয়। গোসলখানায় ধরে রাখা পানির পাত্রে পড়ে প্রাণ হারায় অনেক শিশু। যারা মারা যায়, তাদের সবাই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
তিনি আরও বলেন, সাঁতার না জানা থাকলে সব বয়সী মানুষেরই পানিতে পড়ে মারা যাওয়ার ঝুঁকি বেশি। তবে চার বছরের কম বয়সী শিশুদের ঝুঁকি বেশি। পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার জন্য সাঁতার না জানা একই সঙ্গে দায়ী অভিভাবকদের অসচেতনতা। অভিভাবকরা যদি অসচেতন থাকি, তাহলে দুর্ঘটনা হতে পারে।
এসব দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে করণীয় সম্পর্কে এ শিশু বিশেষজ্ঞ বলেন, শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব। এ জন্য সবচেয়ে জরুরি সচেতনতা। যেমন-বাড়ির পাশে পুকুর ও জলাশয়ের চারপাশে বেড়া দেওয়া। ছোট শিশুদের চোখে চোখে রাখা। যেসব শিশু মোমুটি হাঁটতে পারে, তাদের কোমরে বা পায়ে ঘণ্টা পরিয়ে দেওয়া। যাতে শিশু যেদিকে যায়, আওয়াজটা মায়ের কানে পৌঁছায়। এতে মা সহজে খেয়াল রাখতে পারবে। শিশুরা যদি পানিতে নামে, বড় একজন সাথে থাকতে হবে। ঘরে ছোট শিশু থাকলে বালতিতে পানি রাখা যাবে না।
সর্বোপরি শিশুদের নিয়ে ঈদের ছুটিতে গ্রামে গেলে তাদেরকে চোখে চোখে রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতিবছর পৃথিবীতে ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৪০০ ব্যক্তি পানিতে ডুবে মারা যায়, যাদের ২০ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের কম। এজন্যই বিশ্বজুড়ে পানিতে ডুবে মৃত্যুকে ‘নীরব মহামারি’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশে এক থেকে চার বছর বয়সি শিশুদের মোট মৃত্যুর ৬৭ শতাংশের জন্য দায়ী পানিতে ডুবে মারা যাওয়া।
এ ছাড়াও ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ১৭ হাজার শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। মৃত্যুর এ সংখ্যা বিশ্বে সর্বোচ্চ।
গবেষণায় দেখা গেছে, এক থেকে পাঁচ বছর বয়সিদের জন্য ‘শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র’ পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু রোধ করতে পারে ৮২ শতাংশ। অন্যদিকে ৬-১০ বছর বয়সি শিশুদের সাঁতার শিখিয়ে তা প্রতিরোধ করা যায় ৯৬ শতাংশ। পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে এ দুই উদ্যোগকে স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
এমইউ
-
২৭ মার্চ, ২০২৫
-
১৭ অক্টোবর, ২০২৪
-
০১ এপ্রিল, ২০২৪
-
১৮ এপ্রিল, ২০২৩
-
১৮ এপ্রিল, ২০২৩
-
১৪ মে, ২০২০