দেশের মেডিকেল শিক্ষায় বাড়ছে বিদেশিদের আগ্রহ, কারণ ও বাস্তবতা
সাখাওয়াত হোসাইন: গত কয়েক বছর ধরে ব্যাপক হারে বাড়ছে বাংলাদেশের মেডিকেল কলেজগুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের সংখ্যা। তাদের অধিকাংশ আসছেন ভারত, নেপাল ও কাশ্মীর থেকে। সার্কভুক্ত দেশ পাকিস্তান, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ ও ভুটান ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইতালিসহ বিশ্বের বিভিন্ন থেকে আসছেন শিক্ষার্থীরা।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি মেডিকেলে পড়তে প্রতি বছর আসছেন প্রায় চার হাজার বিদেশি শিক্ষার্থী। সব মিলিয়ে দেশের বিভিন্ন মেডিকেলে বর্তমানে প্রায় অধ্যয়নরত আছেন ১৫-২০ হাজার বিদেশি।
সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি মেডিকেলে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির হার ২০১১ সালেও ছিল ২৫ শতাংশ। পর্যায়ক্রমে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির হার বাড়ছে। আগ্রহ বাড়তে থাকায় গত বছর দেশের মেডিকেল কলেজগুলোতে ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ভর্তি করার নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।
যে কারণে বিদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ
চার বছর আগে ভারতের মুম্বাই থেকে বাংলাদেশের ডা. সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের পড়তে এসেছেন ওমার কোরাইশী। বর্তমান তিনি এমবিবিএস ফাইনাল ইয়ারে অধ্যয়নরত আছেন। তিনি আসার দুই বছর পর ছোটবোন নাবিলা আনামকেও বাংলাদেশে মেডিকেল শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য ঢাকা কমিনিউটি মেডিকেল কলেজে ভর্তি করান। তাদের উদ্দেশ্য বাংলাদেশ থেকে ডাক্তারি পড়া শেষ করে দেশে চলে যাবেন।
যেখানে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার জন্য উন্নত রাষ্ট্রে যাচ্ছেন, এর বিপরীতে বাংলাদেশে কেন তারা পড়তে আসছেন? জানতে চাইলে ওমার মেডিভয়েসকে বলেন, বাংলাদেশ অনেক কাছের দেশ এবং এই দেশের কালচার ভারতের মতোই। এখানকার মানুষগুলোও ভারতের মতো। যাতায়াত খরচও বেশি লাগে না। আবাসিক খরচও কম।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা হিন্দিতে কথা বললেও বাংলাদেশের মানুষ ভালোভাবে বোঝে, আর আমরা হিন্দিতে কথোপকথন করতে পারি, এটা আমাদের জন্য বিরাট সুবিধা। আর ভারতের মেডিকেল কাউন্সিলে বাংলাদেশের সার্টিফিকেট দেখালে ভালো মূল্যায়ন পাওয়া যায়। বাংলাদেশ থেকে পড়াশোনা শেষ করে ভারতে যাওয়ার পর একটা লাইন্সেস পরীক্ষা দিতে হয়, তাতে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ থেকে আসাদের রেজাল্ট অনেক ভালো হয়।’
কাশ্মীর থেকে আসা আরেক শিক্ষার্থী ইমরান মালিকের কাছে জানতে চাইলে মেডিভয়েসকে বলেন, ‘বাংলাদেশে আমি পাঁচ বছর ধরে আছি। এখানের শিখন পদ্ধতি অনেক ভালো। এই দেশের মেডিকেল শিক্ষার সিলেবাস আমাদের দেশ থেকে উন্নত। বাংলাদেশের মানুষ ও কালচার অনেক ভালো। এই দেশকে অনেক ভালোবাসি। এখানের খাবারগুলো খুব ভালো। বাংলাদেশের পরিবেশও আমাদের জন্য উপযোগী। বাংলাদেশ একটি আরামদায়ক দেশ। ট্রান্সপোর্টেও ব্যাপক সুবিধা রয়েছে।
বাংলাদেশে খরচ কম
এ বিষয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা মোবাশ্বির আলম মেডিভয়েসকে বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, নেপাল, ভুটানের তুলনায় বাংলাদেশে মেডিকেল শিক্ষায় খরচ খুব কম। সরকারি মেডিকেল খরচ নেই বললেই চলে। সেইসাথে হোস্টেল ফি তেমন লাগে না। আর ভারতের বেসরকারি মেডিকেলে পড়তেই খরচ প্রায় ১ কোটি টাকার মতো। থাকা-খাওয়া ও যাতায়াত খরচ তো আছেই। এতে ১ কোটি ২০ লাখ টাকার মতো চলে যায়। আর বাংলাদেশের মেডিকেলের পড়তে লাগে ৩৫ লাখ টাকার মতো। আর ৪০ লাখ টাকার মধ্যে সব কিছু হয়ে যায়। এটা আমাদের জন্য খুবই সুবিধাজনক।
একই কথা জানিয়েছেন ভুটান, মালদ্বীপ ও নেপাল প্রভৃতি দেশ থেকে আসা মেডিকেল শিক্ষার্থীরা। জানতে চাইলে নেপাল থেকে আসা রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ণ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী রবিন মন্ডল মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এই দেশে মেডিকেল শিক্ষায় পড়াশোনার খরচ অনেক কম। সার্টিকেটেরও মূল্য ভালো এবং দেশে গিয়ে লাইন্সেসিং পরীক্ষায় পাস করতে বেগ পেতে হয় না। আমাদের নেপালে এ দেশের মেডিকেল শিক্ষা অনেক সুনাম রয়েছে। আত্মীয়-স্বজন সবাই অনেক প্রশংসা করেন।’
বিদেশিদের মুখে মেডিকেল শিক্ষার মান
ওমার কোরাইশি বলেন, বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষার মান অনেক উন্নত এবং ফলাফল অনেক ভালো হয়। এখানে ডেইলি ডেইলি আইটেম হয়, ভাইভা হয়। এতে ঘাটতিতে থাকা পড়াগুলো ভালোভাবে পড়া হয়ে যায়। বাংলাদেশের মেডিকেল ফি ভারত থেকে অনেক কম, শিক্ষার গুণগত মানও ভালো।’
পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা জামিল হক মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমাদের দেশের চেয়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা অনেক ভালো এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমান। এই দেশের ভাষা বাংলা আর আমার ভাষাও বাংলা। তাই চলাফেরা ও পড়াশোনা সহজ। আমাদের শিক্ষকরা বাংলা আর ইংরেজি মিলিয়ে লেকচার দেন। এতে আমার অনেক সুবিধা হয়। এই দেশের শিক্ষকরা খুব বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করেন। সব কিছু সাজিয়ে-গুছিয়ে পড়ান। রোগীদেরকে ভালোভাবে দেখানো হয়।’
নেপাল থেকে আসা মেডিকেল শিক্ষার্থী বাগেশ্বরী গুপ্তা বলেন, এই দেশের মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের থেকে দেশ থেকেও অনেক উন্নত। শিক্ষকরা অনেক আন্তরিক। প্র্যাক্টিক্যাল ও থিউরিটিক্যাল ক্লাসগুলোতে খুব গুরুত্বের সাথে পড়ানো হয়। এখান থেকে পড়ে দেশে যারা গিয়েছেন, তারা ভালো মূল্যায়ন পেয়েছেন।
বিদেশিদের জন্য সুযোগ-সুবিধা
বিদেশের জন্য বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধার বাইরে আরও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর কথা জানিয়েছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর। জানতে চাইলে অধিদপ্তরের পরিচালক (মেডিকেল শিক্ষা) ডা. মুজতাহিদ রহমান মেডিভয়েসকে বলেন, মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থার অবকাঠামো আরও উন্নয়ন হবে। এ ছাড়া আমাদের দেশের মেডিকেল শিক্ষার মান সামগ্রিকভাবে উন্নয়ন করা হবে। এতে দেশি এবং বিদেশি উভয় শিক্ষার্থীরাই উপকৃত হবে। মেডিকেলে যাতে অধিকতর মেধাবী শিক্ষার্থীরা আসে, এটা আমরা নিশ্চিত করবো। বেসরকারি মেডিকেলের জন্য যে আইন করা হয়েছে, তা বাস্তবায়ন হলে দেশিদের সঙ্গে বিদেশি শিক্ষার্থীরাও উপকৃত হবে। এতে তাদের সুযোগ-সুবিধা আরও বৃদ্ধি পাবে।
তিনি বলেন, আশেপাশের দেশের তুলনায় বাংলাদেশে চিকিৎসা শিক্ষার ব্যয় অনেক কম। বেসরকারি মেডিকেলেরও কম। এটা একটা বিরাট সুবিধা। এ ছাড়া বিদেশ থেকে যারা আসেন, তাদের অধিকাংশের কোয়াটিলি খুব ভালো। একাডেমিক পারফরমেন্স ভালো দেখায় তারা। এসব কারণেই হয়তো তারা বাংলাদেশকে পছন্দ করে।
ডা. মুজতাহিদ আরও বলেন, সার্কভুক্ত দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে ১০০টি সিট আছে, তারা এখানে বিনামূল্যে পড়াশোনা করেন। সার্কের বাইরে আফগানিস্তানের শিক্ষার্থীরাও এ রকম সুবিধা ভোগ করতে পারেন। এ ছাড়া বিদেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীদের টাকা দিয়ে পড়তে হয়।
বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও সংস্কৃতি বিনিময়
দেশে বিদেশি শিক্ষার্থী আসাতে সংস্কৃতিক বিনিময় হয় জানিয়ে তিনি বলেন, বিদেশ থেকে বাংলাদেশে শিক্ষাগ্রহণ আসলে দেশের ফরেইন কারেন্সি (বৈদেশিক মুদ্রা) যোগ হয়। সেইসাথে দেশের অর্থনীতি সচল হতে সহায়তা করে এবং অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হয়।
যেভাবে দেখছে বিএমএ
জানতে চাইলে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী মেডিভয়েসকে বলেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের আসাকে খারাপভাবে দেখার সুযোগ নেই, বরং তাদেরকে স্বাগত জানাই। এটা একটা ভালো লক্ষণ, আমাদের দেশের মেডিকেল শিক্ষার মান এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, বিদেশ থেকে শিক্ষার্থীরাও পড়তে আসে।
তিনি বলেন, দেশের সরকারি-বেসরকারি মেডিকেলে প্রচুর বিদেশি শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে, যা দেশের জন্য মঙ্গলজনক। আর এতে ফরেন কারেন্সি যোগ হবে এবং বিদেশ থেকে শিক্ষার্থীরা আসলে আমরা আর্থিকভাবে লাভবান হই। দেশের ছেলে-মেয়েরা যেমন বিদেশে লেখাপড়া করতে যান, ঠিক একইভাবে বিদেশের ছেলে-মেয়েরাও বাংলাদেশে লেখাপড়া করতে আসছেন।
ডা. ইহতেশামুল হক বলেন, লেখাপড়ার যে কোনো সীমানা নেই, আমরা সে পর্যায়ে পৌঁছে গেছি, দেশের মেডিকেল শিক্ষা ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে। এই মানটা ধরে রাখতে পারলে বিদেশি শিক্ষার্থী আসার প্রবণতাটা আরও বেড়ে যাবে।
এমইউ
-
২১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৩