২৭ অক্টোবর, ২০২২ ০৩:১৬ পিএম

স্ট্রোকের হার বেড়েছে ৪ গুণ, অধিক ঝুঁকিতে পুরুষ

স্ট্রোকের হার বেড়েছে ৪ গুণ, অধিক ঝুঁকিতে পুরুষ
ডা. মো. সুমন রানা বলেন, দেশে স্ট্রোকে আক্রান্তের হার চার গুণ বেড়েছে।

মেডিভয়েস রিপোর্ট: দেশে স্ট্রোকে আক্রান্তের হার চার গুণ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সুমন রানা। তিনি বলেন, ২০১৯ ও ২০২০ সালে স্ট্রোকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে এক বছরের ব্যবধানে স্ট্রোকে আক্রান্তের হার বেড়েছে দ্বিগুণ।

বিশ্ব স্ট্রোক দিবস উপলক্ষে বুধবার (২৬ অক্টোবর) ঢামেক হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের আয়োজনে বৈজ্ঞানিক ওয়ার্কশপ ও সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরেন তিনি।

এক বছরে আক্রান্তের হার দ্বিগুণ 

অনুষ্ঠানে ‘স্ট্রোকের চিত্র: বাংলাদেশ ও বিশ্ব’ শীর্ষক আলোচনায় ডা. মো. সুমন রানা বলেন, ‘রোগাক্রান্ত হয়ে সারা বিশ্বে যত মানুষ পঙ্গুত্ববরণ করেন, তার মধ্যে স্ট্রোক প্রথম। দেশে ও বিশ্বে পঙ্গুত্ববরণের প্রথম কারণ স্ট্রোক। বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০১৯ সালে স্ট্রোকে আক্রান্ত ছিল ৪৫ হাজার ৫০২ জন। ২০২০ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৫ হাজার ৩৬০ জনে। প্রতি বছরই স্ট্রোকের মাত্রা বাড়ছে, এটা আমাদের জন্য উদ্বেগজনক।’

উচ্চরক্তচাপ স্ট্রোকের প্রধান কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের সমবয়সী সহকর্মী হঠাৎ করে স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছেন। একই বয়সী হিসেবে আমিও তাহলে ঝুঁকিতে আছি।’
 

প্রধান কারণ উচ্চরক্তচাপ

ডা. সুমন রানা বলেন, আন্তর্জাতিক গবেষণায় বলা হচ্ছে, স্ট্রোকের জন্য উচ্চ রক্তচাপ ৫০ শতাংশ দায়ী। বাংলাদেশের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৮৯ শতাংশ স্ট্রোকের রোগীদের উচ্চ রক্তচাপ ছিল। বিশ্বে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করেন, কিন্তু আমাদের দেশে নিয়ন্ত্রণ করে কম। অনেকেই নিয়মিত ওষুধ খান না। উচ্চরক্তচাপ হলেই স্ট্রোক করে। দেশের জন্য বড় ঝুঁকি উচ্চরক্তচাপ।

প্রতি হাজারে স্ট্রোকে আক্রান্ত ১২
 
সাম্প্রতিক এক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, দেশে প্রতি হাজারে ১১ দশমিক ৩৯ অর্থাৎ ১২ জন করে স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। ২০১১ সালের গবেষণায় দেখা যায়, হাজারে তিন জন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন। অর্থাৎ এই ১০ বছরে স্ট্রোকের রোগী চারগুণ বেড়ে গেছে।

ময়মনসিংহে স্ট্রোকের হার বেশি

এক গবেষণার বরাত দিয়ে ঢামেক হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের এই সহকারী অধ্যাপক বলেন, দেখা গেছে, দেশে ময়মনসিংহের মানুষের মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্তের হার বেশি। বিপরীতে রাজশাহীতে সবচেয়ে কম। এ ছাড়া স্ট্রোকে আক্রান্তের দিক থেকে খুলনা মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে।

ষাটোর্ধ্বদের স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি

তিনি বলেন, বয়সের কথা চিন্তা করলে ৬০ বছরের পর স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। বর্তমানে ৪০ থেকে ৬০ বছরের মানুষের মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি । এক গবেষণায় দেখো গেছে, ৪০ থেকে ৬০ বছরের মানুষের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের আক্রান্তের মাত্রা ২৬ শতাংশ। আর এই ২৬ শতাংশ মানুষের মধ্যে ২১ শতাংশ স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। এর মানে উচ্চরক্তচাপ স্ট্রোকের বড় কারণ।

নারীদের তুলনায় পুরুষরা অধিক ঝুঁকিতে

পুরুষদের স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার মাত্রা বেশি উল্লেখ করে তরুণ এ নিউরোসার্জন আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে পুরুষদের বেশি সামাজিক দায়বদ্ধতার মুখোমুখী হতে হয়। তাদেরকে অনেক চাপে থাকতে হয়। এজন্য তাদের মধ্যে উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, অনিয়ন্ত্রিত জীবন পদ্ধতিসহ সব কিছুই বেশি থাকে। আর এতে পুরুষরা স্ট্রোকে বেশি আক্রান্ত হয়। স্ট্রোকের হার পুরুষদের মধ্যে ৭১ শতাংশ আর নারীদের ২৯ শতাংশ।

পেশাগতভাবে অধিক ঝুঁকিতে চাকরিজীবী-ব্যবসায়ীরা 

তিনি বলেন, পেশাগত দিক থেকে চিন্তা করলে, চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্ট্রোকের হার সবচেয়ে বেশি। শিক্ষার্থীদে মধ্যে এই রোগের হার কম।

কম ঝুঁকিতে শ্রমজীবী মানুষ

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, শ্রমিকজীবীদের মধ্যে স্ট্রোকের হার সবচেয়ে কম, মাত্র তিন শতাংশ। তার মানে যারা কায়িক শ্রম করেন তাদের স্ট্রোকের হার সবচেয়ে কম। অধিক মাত্রায় পরিশ্রম করার ফলে তাদের শরীরে চর্বি বলে কিছু থাকে না। এ কারণে চর্বিমুক্ত দেহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষ অধিক ঝুঁকিতে

ডা. সুমন রানা বলেন, ‘আমরা অনেক সময় বলি, শহরের মানুষের বেশি স্ট্রোক হয়, গ্রামে হয় না। কথাটা ঠিক না। অনেক সময় দেখা যায়, ৫৩ শতাংশ গ্রামের মানুষেরই স্ট্রোক হয়ে যাচ্ছে। 

তিনি বলেন, ‘পরিবারের উপার্জনকারী ব্যক্তিদের মধ্যে ৬৪ শতাংশ আর অন্যরা ৩৬ শতাংশ স্ট্রোকে আক্রান্ত হচ্ছেন। আমাদের ৩২ থেকে ৪৫ বছরের সময়ই ৬৪ শতাংশ স্ট্রোকে আক্রান্তের ঝুঁকি রয়েছে। 

স্ট্রোকের চিকিৎসা

বৈজ্ঞানিক কর্মশালায় জানানো হয়, ৮০ শতাংশ রক্তক্ষরণ ও ২০ শতাংশ রক্ত চলাচল বন্ধজনিত কারণে স্ট্রোক হয়।

ডা. সুমন রানা বলেন, স্ট্রোকের রোগীদের আমরা কিছু ওষুধ ও থেরাপি দিচ্ছি। কিন্তু স্ট্রোকের আধুনিক চিকিৎসা দুইটা। একটা হলো, রক্তের শিরা পথে ইনজেকশন দিয়ে রক্তের দলা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। এজন্য স্ট্রোক করার সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে আসতে হবে। দ্বিতীয়টা হলো, ক্যাথল্যাবে নিয়ে সর্বোচ্চ আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করা। 

তিনি বলেন, ‘স্ট্রোকের আধুনিক চিকিৎসার জন্য রোগীকে চিকিৎসকের কাছে সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যেই আসতে হবে। তাহলে আমরা রক্তের শিরা পথে এক ধরনের ওষুধ দেই, সেই ওষুধে রক্তনালী বন্ধের দলা ব্রাশ হয়ে রক্তের স্বাভাবিক চলাচল প্রতিস্থাপিত হবে। আর স্ট্রোকের আট ঘণ্টা মধ্যে আসলে স্প্যাসিফিক একটা জালের মতো স্পেশাল স্টেন্টের মাধ্যমে রক্তের নালীর ভিতর দিয়ে অপারেশন ছাড়া ওই রক্তের দলাটাকে বের করে আনা সম্ভব।’

‘দেখা যায়, মেডিকেল ব্যবস্থাপনা অর্থাৎ কিছু ওষুধ ও থেরাপির মাধ্যমে স্ট্রোকের চিকিৎসা করার কারণে ১৯ শতাংশের পঙ্গু হয় ৫২ ভাগ আর ভালো হচ্ছে ২৯ ভাগ। আর স্ট্রোকের আধুনিক চিকিৎসা করলে ৫৩ শতাংশ ভালো হয়ে যাচ্ছে। আর ১৯ শতাংশের পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয় ৩৭ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার আগে ছিলো ১৯ এখন ১০ শতাংশ। অর্থাৎ গতানুগতি স্ট্রোকের চিকিৎসার পরিণতি খারাপ। অন্যদিকে আধুনিক চিকিৎসার পরিণতি ভালো’, যোগ করেন প্রতিশ্রুতিশীল এ  নিউরোসার্জন।

টিআই/এমইউ

 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : স্ট্রোক
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক