চলতি মাসে দুই মেডিকেল শিক্ষার্থীসহ ৮ চিকিৎসকের বিদায়
আসাদুল ইসলাম দুলাল: চলতি মাসে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন দুই মেডিকেল শিক্ষার্থীসহ ৮ জন চিকিৎসক। জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত সময়ে তারা মারা যান। এর মধ্যে হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন রোগে ছয়জন মারা যান, আর আত্মহত্যা করেছেন তিনজন। এসব ঘটনায় শোক জানিয়েছেন স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা।
বিদায় নেওয়া চিকিৎসকরা হলেন: সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের (সিওমেক) পেডিয়াট্রিক সার্জারি বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. শামছুর রহমান ময়না, রাজশাহী মেডিকেল কলেজের (রামেক) অ্যানাটমির শিক্ষক ডা. শামসুন্নাহার স্বপ্না, রাজধানীর ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাসিনা মমতাজ, বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের (শজিমেক) ডা. খোকন সাহা, ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস বন্যা, বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের কার্ডিওলজি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. জাহিদ হাসান, ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজের ৮ম ব্যাচের শিক্ষার্থী মানিক বাড়ৈ ও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ২৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ফারহানা ইয়াসমিন পিনন।
রামেকের ডা. শামসুন্নাহার স্বপ্নার বিদায়
গত সোমবার (৬ জুন) রাজশাহী মেডিকেল কলেজের (রামেক) অ্যানাটমির শিক্ষক ডা. শামসুন্নাহার স্বপ্না মারা যান। গত ৬ জুন ভোর রাত ৫টায় অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসে আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন তিনি। ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিঊন।
ডা. খোকন সাহার আত্মহত্যা
একই দিন (৬ জুন) বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের (শজিমেক) ডা. খোকন সাহা মারা যান। শজিমেক’র ২০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ডা. খোকন সাহা আত্মহত্যা করেছেন।
তুখোর মেধাবী ডা. খোকন সাহা এরই মধ্যে এফসিপিএস পার্ট-১ সম্পন্ন করেছেন। তিনি ৩৮তম ও ৩৯তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডার হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। তিনি সুনমাগঞ্জের জগন্নাথপুরে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে প্রেষণে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে অনকো-সার্জারি এমএস ফেজ-এতে অধ্যয়নরত ছিলেন ডা. খোকন সাহা।
মানিক বাড়ৈ’র আত্মহত্যা
ডা. খোকন সাহা মৃত্যুর চার দিন পর গত ১১ জুন রাত ১০টার দিকে চিরকুট লিখে আত্মহত্যা করেন ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজের ৮ম ব্যাচের শিক্ষার্থী মানিক বাড়ৈ।
রাত ১০টার দিকে চিরকুট লিখে আত্মহত্যা করেন তিনি।
চিরকুটে মানিক লিখেছেন, ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি ব্যক্তিগত হতাশার কারণে আত্মহত্যা করতেছি। আমি মেডিকেলে ফেল করেছি এবং লেখক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি। তাই আমি আত্মহত্যা করছি। আমি কারো দ্বারা প্রভাবিত নই।’
গলায় ফাঁস দিয়ে ডা. বন্যার আত্মহত্যা
মানিক বাড়ৈ’র মৃত্যুর তিন দিনের মাথায় গত ১৪ জুন ‘পারিবারিক কলহের জেরে’ সিলিংফ্যানের সঙ্গে গলায় ঝুলে আত্মহত্যা করেন ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস বন্যা।
ওই দিন রাত সাড়ে ৯টায় গাজীপুর টঙ্গীর মাছিমপুরের নিজ বাসায় আত্মহত্যা করেন তিনি। বিষয়টি মেডিভয়েসকে নিশ্চিত করেছেন ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজের সাবেক একাধিক শিক্ষার্থী।
জানা গেছে, একটি পোশাক কারখানায় চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস। কয়েক মাস ধরে পারিবারিক বিষয়াদি নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায় ঝগড়া চলছিল। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ফের স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া হয়। এরই জের ধরে নিজ ঘরের সিলিংফ্যানের সাথে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন। ঝুলন্ত অবস্থায় ডা. জান্নাতুল ফেরদৌসকে উদ্ধার করে টঙ্গীর শহিদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
টঙ্গী পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাবেদ মাসুদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গৃহবধূর লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতল মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় মামলার প্রক্রিয়া চলছে।’
মৃত্যুকালে ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস বয়স হয়েছিল ৩০ বছর। তিনি ছিলেন ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেলের ৫ম ব্যাচের শিক্ষার্থী।
কুমিল্লা মেডিকেলের পিননের মৃত্যু
গত ১৫ জুন মারা যান কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ২৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ফারহানা ইয়াসমিন পিনন। গত ১৫ জুন ভোর ৫টায় চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি মেডিকেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিঊন।
ফারহানা ইয়াসমিন মেডিকেলের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া।
ফারহানার সহপাঠী ও একই ব্যাচের শিক্ষার্থী আহমেদ ইমরুল কায়েস রাবিন মেডিভয়েসকে জানান, মৃত্যুর দুই দিন আগে ফুড পয়জনিংয়ে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন ফারহানা ইয়াসমিন। অবস্থার অবনতি হলে ১৪ জুন তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। পরে পর দিন ভোরে কার্ডিয়াক এরেস্ট হয়ে মারা যান তিনি।
৩৯ এর ডা. জাহিদ হাসানের মৃত্যু
ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ৩৯তম বিশেষ বিসিএস’র ডা. জাহিদ হাসান। ১৫ জুন রাতে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। ইন্না লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন।
ডা. জাহিদ হাসান দীর্ঘদিন ধরে ব্লাড ক্যান্সার, নিউমোনিয়া এবং সেপসিসে ভুগছিলেন৷ মৃত্যুর কিছু দিন আগে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। এরপর থেকে গত এক সপ্তাহ ধরে ওই হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।
ডা. জাহিদ হাসান ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন। তিনি ছিলেন কে-৬৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী।
তিনি বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের কার্ডিওলজি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
ডা. জাহিদ হাসানের মৃত্যুতে চিকিৎসক মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মেধাবী এ চিকিৎসকের মৃত্যুতে শোক জানানোর পাশাপাশি তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করেছেন বন্ধু, স্বজন, সহকর্মীরা।
ডা. জাহিদের স্মৃতিচারণ করে তার সহকর্মী ডা. বাপ্পা আজিজুল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে বলেন, ‘প্রিয় সহকর্মী ডা. জাহিদ হাসান আর নেই! ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। ঢামেকের মেধাবী ছাত্র ডা. জাহিদকে ৩৯তম বিসিএসে কলিগ হিসেবে পেয়েছিলাম। কোভিডের মধ্যে হুট করে একদিন জানতে পারি সে AML এ আক্রান্ত, ট্রিটমেন্ট নিচ্ছে, এখন ভালোর পথে। এভাবেই দুই বছর তার সাথে পার করে দিলাম। অসম্ভব মিশুক, অমায়িক, ডিসেন্ট একটা ছেলে। দারুণ স্মার্ট আর মাল্টি ট্যালেন্টেড। এর মধ্যে উপজেলায় থেকে হালকা-পাতলা পড়াশোনা করে এফসিপিএস পার্ট-১ করে ফেলল এবং শজিমেকে কার্ডিওলজি বিভাগে ট্রেনিং শুরু করলো। আজ সন্ধ্যায় শুনলাম আইসিইউতে। আর এইমাত্র জানলাম আর নেই! আল্লাহ তায়ালা তাকে ক্ষমা করে দিন। জান্নাত নসিব করুন। তার বাবা-মাকে শোক সইবার শক্তি দিন। সবর করার তৌফিক দিন। আমিন।’
সিওমেক’র ডা. শামছুর রহমানের মৃত্যু
ডা. জাহিদর মৃত্যুর চার দিন পর ২০ জুন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের (সিওমেক) পেডিয়াট্রিক সার্জারি বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. শামছুর রহমান ময়না মারা যান। ওই দিন সকালে নিজ বাসায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন।
সহযোগী অধ্যাপক ডা. শামছুর রহমান ময়নার মৃত্যর খবরটি মেডিভয়েসকে নিশ্চিত করেন বাংলাদেশ পেডিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) সিলেট বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মুজিবুল হক।
মৃত্যুকালে এক ছেলে, এক মেয়ে ও আত্মীয়-স্বজনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে গভীর দুঃখ ও শোক প্রকাশ করেছেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা।
প্রসঙ্গত, তিনি বাংলাদেশ পেডিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ) সিলেট শাখার আজীবন সদস্য ছিলেন।
একই দিন সোমবার (২০ জুন) শরীরের উচ্চ রক্তচাপে মারা যান রাজধানীর ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাসিনা মমতাজ।
ওই দিন রাজধানীর ধানমণ্ডিতে ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। মৃত্যুকালে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, ছাত্র-ছাত্রীসহ অসংখ্যা গুণগ্রাহী রেখে গেছেন তিনি।
তাঁর মৃত্যুতে গভীর দুঃখ ও শোক জানিয়েছে চিকিৎসক সমাজ। চিকিৎসকরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনার পাশাপাশি শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছে।
ডা. হাসিনা মমতাজের মৃত্যু
একই দিন (২০ জুন) শরীরের উচ্চ রক্তচাপে মারা যান রাজধানীর ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাসিনা মমতাজ।
ওই দিন রাজধানীর ধানমণ্ডিতে ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন।
ডা. মমতাজ বেগম ছিলেন ইব্রাহিম মেডিকেলের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। মৃত্যুকালে তিনি বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, ছাত্র-ছাত্রীসহ অসংখ্যা গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
ডা. হাসিনার মৃত্যুতে গভীর দুঃখ ও শোক জানিয়েছে চিকিৎসক সমাজ। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনার পাশাপাশি শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছে চিকিৎসকরা।
এমইউ
-
১৯ মে, ২০২৬
-
০৪ মে, ২০২৬
-
২৯ এপ্রিল, ২০২৬
-
২০ এপ্রিল, ২০২৬
-
০৮ এপ্রিল, ২০২৬
-
২৬ মার্চ, ২০২৬
-
২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬