২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২২ ০৬:৫৮ পিএম

স্বাস্থ্য সচেতনতার মাধ্যমে নারীদের কষ্ট দূর করতেই লেখালেখি

স্বাস্থ্য সচেতনতার মাধ্যমে নারীদের কষ্ট দূর করতেই লেখালেখি
ডা. ছাবিকুন নাহার বলেন, যেকোনো অর্জনই আনন্দের। সে ক্ষেত্রে নতুন একটি বই প্রকাশিত হওয়া লেখকের জন্য বিশাল ব্যাপার।

মো. মনির উদ্দিন: চিকিৎসা দিতে গিয়ে নারীদের জটিল রোগগুলো নিয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার লক্ষ্যে নিয়মিতই লিখতেন ডা. ছাবিকুন নাহার। সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে নিজের ওয়ালে এবং পরে বিভিন্ন পোর্টালে প্রকাশিত জীবনঘনিষ্ট এসব লেখা লুফে নেয় সাধারণ পাঠক। নারী স্বাস্থ্য বিষয়ক লেখাগুলো নিয়ে এবারের অমর একুশে বইমেলায় তাঁর একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। ‘রোগী কথন’ শিরোনামে এ চিকিৎসকের বইটি বাজারে এনেছে পেন্সিল নামে একটি পাবলিকেশন্স।

নিজের লেখা প্রথম বইয়ের নানা তথ্য তুলে ধরে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের (শেবাচিম) ১৯৯৮-৯৯ সেশনের এ শিক্ষার্থী জানালেন, মেলায় আসার প্রায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে বইটির প্রথম সংস্করণ শেষ হয়েছে। বইয়ের অভাবনীয় চাহিদায় উচ্ছ্বসিত এ গাইনি বিশেষজ্ঞ বলেন, সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব সাড়া মেলায় লেখালেখির প্রতি তাঁর দায় বেড়ে গেছে। 

বই প্রকাশের অনভূতি

বই প্রকাশের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. ছাবিকুন নাহার মেডিভয়েসকে বলেন, ‘যেকোনো অর্জনই আনন্দের। সে ক্ষেত্রে নতুন একটি বই প্রকাশিত হওয়া লেখকের জন্য বিশাল ব্যাপার। আমি যখন লেখা শুরু করি, তখন আসলে এমন চিন্তাই করিনি যে, আমার একটি বই প্রকাশিত হবে। এর কল্যাণে মানুষ আমাকে চিনবে কিংবা বড় কিছু হবো—এসব মোটেও ভাবিনি। দৈনন্দিন কাজের অংশ হিসেবে চিকিৎসা দিতে গিয়ে যেসব রোগীর স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো মনে হয়েছে যে, এগুলো মানুষকে জানানো দরকার; সেগুলো একটু একটু করে আমার ফেসবুক ওয়ালে দেওয়া শুরু করেছিলাম।’

তিনি আরও বলেন, ২০০৬ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পুরো পথপরিক্রমায় গাইনি বিষয়েই সময় অতিবাহিত হয়েছে। এ বিষয়ে মায়েদের, মেয়েদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে যে জিনিসটি আমার কাছে মনে হয়েছে, রোগীরা অনেক কষ্ট পাচ্ছে, তাদের ভোগান্তি হচ্ছে। একটু সচেতন হলে হয় তো এত কষ্ট করতে হতো না।  

ডা. ছাবিকুন নাহার বলেন, ‘এরই ধারাবাহিকতায় পাঠকদের কাছ থেকে সাড়া পেয়ে এতদূর এগুনো। বেশ কিছু দিন ধরেই আমার সঙ্গে বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে যোগাযোগ করা হয়। এরই মধ্যে পেন্সিল নামে একটি পাবলিকেশন্স আমার সঙ্গে কথা বলে, ফেসবুকে যাদের বিশাল একটি গ্রুপ আছে। তাদের সদস্য সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখ। তারা দীর্ঘদিন ধরেই বই প্রকাশের কথা বলছিলেন। তবে আমার কাছে মনে হতো, আরেকটু সময় নেওয়া উচিত। এ নিয়ে আসলে তাড়াহুড়োর কিছু নেই। এ ছাড়া সে রকম প্রস্তুতিও ছিল না। কিন্তু এ বছর তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে জানালেন, আপনার কাছে যে লেখা তৈরি আছে, এটি দিয়েই একটি চমৎকার বই হতে পারে এবং বইটি ভালো হবে, এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকেন। তারপরও খানিকটা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল। শেষ পর্যন্ত রাজি হলাম। আলহামদুলিল্লাহ, প্রকাশের পর এখন পর্যন্ত বুঝতে পারছি, পাঠক ভালোই গ্রহণ করছেন। বইটির প্রথম মুদ্রণ শেষ।’

বাড়লো দায়বোধ

বই প্রকাশের পর ব্যাপক সাড়া পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে শেবাচিমের সাবেক এ শিক্ষার্থী বলেন, ‘দায় ছাড়া যখন কোনো কাজ সম্পাদিত হয়, তখন মনে হবে করলে করলাম, না করলে নাই। ভালো লাগলে লিখলাম, না লাগলে নাই। যখন প্রকাশ হলো এবং পাঠক গ্রহণ করলো, তখন মনে হয়—পাঠক এ ধরনের ঘটনা জানতে চায়। আর যেহেতু সচেতনতামূলক লেখা, জীবনঘনিষ্ট লেখা; এই লেখার মাধ্যমে যদি মানুষের সামান্য পরিমাণ উপকার হয়। তবে শত ব্যস্ততার মধ্যেও কিছু সময় করে লিখে যাওয়া তো অনেক ভালো কাজ, খুবই সন্তোষজনক ব্যাপার।’ 

‘যদিও দ্বিধায় ছিলাম, কিন্তু পাঠক যেহেতু এটা নিচ্ছে। তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আমার চিন্তা থাকবে, এটা অব্যাহত রাখতে। যদিও আমি যেসব ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছি, তা মেডিকেল শিক্ষার দুই ভাগও না। এটা যদিও মানুষের কাছে যায়। এ রকম যত ঘটনা আছে, যেগুলো মানুষের কাছে বলা দরকার, মানুষের জানা উচিত কিংবা যদি মনে হয়, লিখলে ভালো হবে, মানুষের কাজে লাগবে। তাহলে লিখবো। সেই অর্থে দায়বদ্ধতা খানিকটা বাড়লোই’, যোগ করেন এ গাইনি বিশেষজ্ঞ।

লেখার সূচনা যেভাবে

ডা. ছাবিকুন নাহার বলেন, ‘আমরা যারা গাইনি বিষয় নিয়ে কাজ করি, তাঁদের রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা জরুরি বিষয় নিয়ে কাজ করতে হয়। নারীদের এমন কিছু জরুরি অবস্থা হয়ে যায়, যখন তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা কিংবা অপারেশনে যাওয়া না গেলে জীবন-মরণের প্রশ্ন চলে আসে। সন্তান প্রসবের সময় মাত্রাতিরিক্ত রক্তপাত, সন্তান মরে যাওয়া—এ জাতীয় সমস্যাগুলো খুবই গুরুতর। এর সাথে জীবন কিংবা সংসার জড়িয়ে যায়। জটিল এসব বিষয় অনেক সময় চিকিৎসকরাও জানেন না, বিশেষ করে যারা গাইনি বিশেষজ্ঞ না। সুতরাং সাধারণ মানুষ তো আরো অন্ধকারে। এখন এ জাতীয় দুর্ঘটনা বা ঝুঁকিপূর্ণ ঘটনা যদি তাঁর জীবনে কিংবা স্বজনদের জীবনে যদি আসে, তাহলে সে কীভাবে সামাল দেবে? কিংবা সে সাহায্য চাইবে কিভাবে, বা কার কাছে গিয়ে চাইবে? যদি তার সমস্যা সম্পর্কে জানতে পারেন, তাহলে সে হয়ত বুঝবেন, এই সমস্যা সমাধানের জন্য আমি অমুক ব্যক্তির কাছে গেলে সমাধান পাবো।’ 

তিনি আরও বলেন, এমন কিছু রোগী দেখেছি, যারা চিকিৎসকের কাছে এসেছে অনেক বিলম্বে; যথাসময়ে আসলে যেভাবে ব্যবস্থা নেওয়া যেতো, পরে আসার কারণে সম্ভব হয়নি। চিকিৎসকরা নিরুপায় হয়ে যায়। এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় আমার কাছে মনে হয়েছে, মানুষ যদি না জানে, তাহলে তো সে তার প্রয়োজনীয় সাহায্যটুকুও নিতে পারবে না।’

লেখায় বহুজনের কাছে বার্তা পৌঁছানো সম্ভব

ডা. ছাবিকুন নাহার বলেন, ‘তাদেরকে কিভাবে জানানো যায়? আমার কাছে মনে হয়েছে, আমরা যারা এসব বিষয় নিয়ে কাজ করি, তারা কথা বলবো। আর লেখালেখি তো দালিলিক বিষয়, এটা তথ্য আকারে থেকে যাবে। উন্নত বিশ্বে এ বিষয়ে অনেক লিফলেট পাওয়া যায়, ডাক্তারের চেম্বার অথবা হাসপাতালে। কিন্তু আমাদের দেশে তা অপ্রতুল। আমাদের দেশে এ সংস্কৃতি ভালোভাবে শুরু হয়নি। আমার কাছে অনুভূত হতো, বিষয়গুলো বলা দরকার। তাই একটু একটু করে বলেছিলাম। কিন্তু এতো সুদূরপ্রসারী চিন্তা থেকে নয়। ক্ষুদ্র প্রয়াসটুকুই আজকে বইয়ে রূপ নিল।’

তিনি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হতো, যে বিষয়টি আমি জানি, যা নিয়ে একটু কথা বললেই মানুষের উপকার হয়। সেই চিন্তা থেকেই লেখালেখির সূচনা ছিল। চেম্বারে রোগীদের সতর্ক করলে হয় তো, সারাজনমে হাজার মানুষের কাছে বার্তাগুলো দেওয়া যেতো। লেখালেখির কারণে স্বল্প সময়েই কোটি মানুষের কাছে চলে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে।’

পরিকল্পিত উপায়ে লেখালেখির চিন্তা

ডা. ছাবিকুন নাহার বলেন, ‘একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে যেহেতু আমার পরিধি বেড়েছে, অভিজ্ঞতাও বাড়বে। ওখান থেকে কিছু তুলে ধরতে পারবো। একজন গাইনোকোলজিস্ট এমনিতেই অনেক ব্যস্ত থাকেন। তাঁর সময়ের ব্যাপক সংকট। সন্তান, পরিবারের পাশাপাশি আমি একটি ছোট্ট বাগানের পরিচর্যাও করি। সব মিলিয়ে সময়ের সংকট তো আছেই। এত দিন আমার একান্ত সময়টুকু কিংবা রাতে ঘুমানোর আগের সময়টা কাজে লাগাতাম। এটা চলবে। সেই সঙ্গে যেহেতু বিষয়গুলো সম্পর্কে একটু একটু ধারণাও তৈরি হয়েছে, হয় তো আরেকটু পরিকল্পিত উপায়ে কাজ করবো। বৃহত্তর স্বার্থে একটু ছাড় দিতেই হবে। সেটা নিজের সময়টুকু থেকেই দেবো।’

লেখক হিসেবে স্বজনদের কাছে মূল্যায়ন

লেখালেখির বিষয়ে স্বজন ও বন্ধু-সহকর্মীদের সহযোগিতার কথা তুলে ধরে এই গাইনি বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘লেখালেখির ক্ষেত্রে প্রথমত পরিবারের সহযোগিতাই বেশি জরুরি। এর পর আমার সহকর্মী। এদিক থেকে আমি ভাগ্যবতী যে, আমার পরিবার আমাকে নানাভাবে সহযোগিতা করে আসছে। এমনকি আমার লেখার প্রুফ দেখেন আমার স্বামী। কোনো কোনো লেখা পড়ে তিনি বলেন, তোমার এই লেখাটা ভালো হয়েছে। অনেক সময় তাঁকে কাঁদতেও দেখেছি। আমার সন্তানরাও আমার লেখা পড়ে। আরেকজনের কথা না বললেই নয়, আমার সব সময়ের বন্ধু ডা. সোহানা সুলতানা, আমার বইয়ে যার কথা তুলে ধরেছি। অনেক সময় হাঁটতে হাঁটতে লিখতে গিয়ে তাঁদেরও বিরক্তির উদ্রেগ হয়। কিন্তু ডা. সোহানা সুলতানা আমার এই বিষয়টিকে সব সময় ইতিবাচকভাবে নেন, প্রশংসা করেন। কখনো সংশোধনীও দিতেন। সহযাত্রীর কাছ থেকে এই ধরনের সহযোগিতা পাওয়া বিশাল ব্যাপার। প্রথম দিকে সারাদিন বাইরে কাজ করে আসার পর বাসায় গিয়ে মোবাইল নিয়ে বসে থাকলে তো সবারই বিরক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা (স্বামী) শেষ পর্যন্ত যখন দেখলো যে, বিষয়টি আসলে ভালো পরিণতির দিকেই যাচ্ছে, তখন খুব স্বস্তি ও খুশি বোধ করতেন। সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ভালো কাজ করেছো, কষ্ট করেছো। জনকল্যাণমূলক কাজের সহযাত্রী হিসেবে তাঁদের সবাই এখন খুশি। একটা কিছু হচ্ছে ভেবে বেশ উৎফুল্ল।’

শিক্ষা ও কর্মজীবন

ডা. ছাবিকুন নাহারের জন্ম ১৯৮১ সালে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার হোগলাকান্দি গ্রামের শিকদার বাড়িতে। বাবা রবি মিঞা শিকদার। গ্রামের বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিকের পাঠ চুকান ছাবিকুন নাহার। এর পর ভবেরচর ওয়াজের আলী বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৯৬ সালে এসএসসি ও গজারিয়া থানা কলিমুল্লাহ কলেজ থেকে ১৯৯৮ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। পরে ১৯৯৮-৯৯ সেশনে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে (শেবাচিম) ভর্তি হন। ২০০৪ সাল থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন।

২০০৮ সালে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্সেস (বিসিপিএসে) থেকে এফসিপিএস প্রথম পর্ব পাস করেন। এফসিপিএস প্রশিক্ষণ নেন সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে। ২০১২ সালে ৩০তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডার হিসেবে যোগ দেন সরকারি চাকরিতে। ২০২১ সালে জুলাই মাসে গাইনিতে এফসিপিএস সম্পন্ন হয়। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : অমর একুশে বইমেলা
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স
জীবাণু সংক্রমণ প্রতিরোধে অসামান্য অর্জন

আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স