২৪ ডিসেম্বর, ২০২১ ০৩:০৮ পিএম

টিকা আবিষ্কারের অজানা অধ্যায়

টিকা আবিষ্কারের অজানা অধ্যায়
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব সাধন করা টিকার ইতিহাস মাত্র আড়াইশ বছরের। বর্তমানে পৃথিবীতে দুই ডজনের বেশি রোগের টিকা চালু রয়েছে। ছবি: মেডিভয়েস

যে জৈব মিশ্রণ দেহে অ্যান্টিবডি তৈরি করে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা (ইমিউনিট) বাড়াতে সাহায্য করে তাকেই টিকা বলে। আধুনিককালে মানবজাতিকে টিকিয়ে রাখতে রক্ষাকবচ হিসেবে ভূমিকা রেখে চলেছে এ টিকা। টিকা আবিষ্কারের আগের অধ্যায়টা ছিল অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। রোগের প্রতি অবৈজ্ঞানিক ধ্যান-ধারণা মানুষকে আরো অসহায় করে তুলেছিল।

ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়, মহামারি নিয়ে মানুষের মনে নানা কুসংস্কার আর বিশ্বাস কাজ করতো। অনেক অঞ্চলে রোগের জন্য দায়ী করা হতো নারীদের। মনে করা হতো, খারাপাত্মা তাদের উপর ভর করে মড়ক ছড়িয়ে দেয়। এ বিশ্বাসের কারণে বহু নারীকে নিগ্রহের শিকার হতে হয়েছে। কোথাও কোথাও মহামারি দেব-দেবীদের অসন্তোষের ফল বলে বিশ্বাস করা হতো। তাদের সন্তুষ্ট করার জন্য মড়ক চলাবস্থায়ও তাই দেব-দেবীদের পূজা-অর্চনা করতো মানুষ।

টিকা আবিষ্কারের ইতিহাস 

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব সাধন করা টিকার ইতিহাস মাত্র আড়াইশ বছরের। বর্তমানে পৃথিবীতে দুই ডজনের বেশি রোগের টিকা চালু রয়েছে। 

টিকার আদিরূপ

প্রাচীনকালে চীনের বৌদ্ধ মঙ্করা সাপে কাটার প্রতিষেধক হিসেবে সাপের বিষ পান করতেন। সমর্থিত একাধিক সূত্র মতে, ১০ম শতাব্দীতে চীনে প্রথম টিকার ধারণা তৈরি হয়। 'ভ্যারিওলেশন' নামে ওই চিকিৎসা পদ্ধতিতে অসুস্থ রোগীর দেহ থেকে টিস্যু নিয়ে সেটা সুস্থ মানুষের দেহে বসিয়ে দেওয়া হতো। এটিকে অনেকটা টিকার আদিরূপ বলা যায়। 

গুটিবসন্তের টিকা 

১৭৯৬ সালে ব্রিটিশ চিকিৎসক এডওয়ার্ড অ্যান্টনি জেনার আবিষ্কার করেন গুটিবসন্তের টিকা। সে সময় বসন্ত ছিল এক মারাত্মক আতঙ্কের নাম। এই রোগের ভাইরাস ভেরিওলা মেজর একবার সংক্রমিত হলে উজাড় হয়ে যেত একেকটি লোকালয়। জেনারের টিকা সেই মহামারি নির্মূল করে। 

ড. জেনারের এই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয় ১৭৯৮ সালে। বিশ্ব এই প্রথম ভ্যাকসিন শব্দটার সাথে পরিচিত হলো। 'ভ্যাকসিন' শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ 'ভ্যাক্সা' থেকে যার অর্থ গরু। 

১৭৯৬ সালের মার্চে সারা নেলমস নামের এক তরুণ গোয়ালিনীর গায়ের গোবসন্তের তাজা ক্ষত থেকে জেনার টিকার উপাদান সংগ্রহ করেন। এ উপাদান ব্যবহার করে তৈরি টিকা সর্বপ্রথম জেমস ফিপস নামের আট মতান্তরে তেরো বছর বয়সী এক শিশুর গায়ে পুশ করেন। ফলাফল ইতিবাচক আসে। জুলাই মাসে আবারো শিশুটিকে দ্বিতীয় ধাপে টিকা দেন জেনার। জেনার এ পরীক্ষা অব্যাহত রাখেন এবং আশানুযায়ী ফল পান। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে সংক্রামক রোগ প্রতিরোধী টিকার বুনিয়াদ এভাবেই গড়ে দেন এই চিকিৎসা বিজ্ঞানী। এ জন্য এই জীবাণু গবেষককে 'ফাদার অব ইমিউনোলোজি' বা রোগ প্রতিরোধবিদ্যার জনক বলা হয়। এরপর যত রোগের টিকা তৈরি হয়েছে এটিকে অনুসরণ করেই হয়েছে।

১৯৭৭ সালে পৃথিবী থেকে নির্মূল হয়ে গেছে কালান্তক গুটিবসন্ত। ভয়ঙ্কর মহামারিটি নির্মূল হয়েছে বলে ১৯৮০ সালে ঘোষণা দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। 

গুটিবসন্তের টিকা আবিষ্কার নানা জীবাণুঘটিত রোগের বিরুদ্ধে মানুষের সুস্থ থাকার লড়াইকে এক অন্য মাত্রা দিয়েছিল।

জলাতঙ্ক রোগের টিকা

১৮৮৫ সালের ৬ জুলাই লুই পাস্তুরের গবেষণাগারে পাগলা (সংক্রমিত) কুকুরে কামড়ানো ৯ বছরের শিশুকে নিয়ে আসেন এক মা। সন্তানের প্রাণনাশের ভয়ে আতঙ্কিত ওই মায়ের মুখ দেখে অনেকটা বাধ্য হয়েই ওই শিশুর গায়ে নিজের উদ্ভাবিত প্রতিষেধক প্রবেশ করান লুই। পরবর্তী কয়েক দিনে নির্দিষ্ট মাত্রার প্রতিষেধক টিকা প্রয়োগ করে বালকটিকে সুস্থ করে তোলেন তিনি। আবিষ্কার হয় জলাতঙ্কের কার্যকর প্রতিষেধক টিকা, মুক্তি মেলে আরেকটি অতি ভয়ংকর ভাইরাসঘটিত রোগ থেকে।

ফ্রান্সের ডোলে শহরে ১৮২২ সালে জন্ম নেওয়া এই রসায়ন বিজ্ঞানী ১৮৮৫ সালে জলাতংকের টিকা আবিষ্কার করেন। 

কলেরা ও প্লেগের টিকা আবিষ্কার 

জীবাণু নিয়ে লুই পাস্তুরের গবেষণার সূত্র ধরে পরবর্তীতে কলেরা ও প্লেগের মতো ভয়ঙ্কর দুটি সংক্রামক রোগের আবিষ্কার করেন ওয়াল্ডেমার হফকিন। কোটি কোটি মানুষকে মৃত্যুর মুখে ফেলা ঘাতক এই রোগ দুটির লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয়।

অণুজীব বিজ্ঞানী লুই পাস্তুরের গবেষণাগারে কাজের প্রতি আগ্রহ নিয়ে তরুণ বয়সে ফ্রান্সে পৌঁছেন বিজ্ঞানী ওয়াল্ডেমার হফকিন। এক পর্যায়ে পাস্তুরের গবেষণাগারে কাজের সুযোগ পেলে কলেরার টিকা উদ্ভাবনের জন্য পূর্ণ মনোযোগ দেন। খরগোশের উপর কলেরার টিকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে আগ্রহজাগানিয়া ফলাফল পেলেন। ১৮৯২ সালের ১৮ জুলাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রথমবার নিজের উপর কলেরার টিকার পরীক্ষা চালালেন সাহস করে। ফলাফল ইতিবাচক। সামান্য পার্শ্বতিক্রিয়া ছাড়া বিস্ময়কর সাফল্যের দেখা পেলেন। এবার একদল স্বেচ্ছাসেবকের দেহে পরীক্ষা চালালেন। কিন্তু টিকার কার্যকারিতার উপর পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার জন্য প্রয়োজন আরো ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষার। এ জন্য দরকার মানবদেহ।

ভারতবর্ষে ওয়াল্ডেমার হফকিনের আগমন

কলেরায় তখন এশিয়া ও ইউরোপের টালমাটাল দশা। ভারতে লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে কলেরায়। হফকিন স্থির করলেন টিকার কার্যকারিতা আরো ভালোভাবে বোঝার জন্য ভারতবর্ষে টিকার ব্যবহার করবেন। প্যারিসের ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের সাহায্যে ১৮৯৩ সালে পা রাখলেন কলকাতায়। এখানকার দারিদ্র্য আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ কলেরার জন্য উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছিল। 

হফকিন তার সহকর্মীদের নিয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করলেন। হফকিনের টিকা উতরে গেল। কলেরা নিয়ন্ত্রণে আনার দুঃসাধ্য কাজটি সাধন হলো অবশেষে। 

প্লেগের টিকার 

১৮৯৬ সাল। কলেরার ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই ভয়ঙ্কর বুবোনিক প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে বোম্বে (মুম্বাই) শহরে। এই বুবোনিক প্লেগে মধ্যযুগে শুধু ইউরোপেই মারা গিয়েছিল দুইশ’ মিলিয়ন মানুষ। কলেরা নিয়ন্ত্রণে অসামান্য অবদান রাখায় ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক এবার বোম্বেতে ডাক পড়ে হফকিনের। মহামারির ভয়ে রাস্তাঘাটে আতঙ্কিত পলায়নপর মানুষের ছুটে চলা। ৭ অক্টোবর কলকাতা থেকে বোম্বেতে আসেন মাত্র ৩৬ বছর বয়সের তরুণ বিজ্ঞানী ওয়াল্ডেমার হফকিন। 

গ্র্যান্ট মেডিকেল কলেজের করিডোরে একটি অস্থায়ী ল্যাব বা গবেষণাগারে টিকা উদ্ভাবনের কাজ শুরু করেন। টানা তিন মাস বিরামহীন চেষ্টার পর মানবদেহে পরীক্ষা করার মতো টিকা তৈরি করা সম্ভব হয়। সীমাহীন পরিশ্রমের কারণে তার তিন সহকর্মীর দুইজন ইতোমধ্যে টিকতে না পেরে মাঝপথে সটকে পড়েন। আরেকজনের শরীর-স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। এবারও মানবদেহে টিকার উপযোগিতা পরীক্ষা করার জন্য নিজেকেই বেছে নিতে হয়। সবশেষে ১৮৯৭ সালের ১০ জানুয়ারি নিজের শরীরে টিকার পরীক্ষা চালান। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় জ্বর ও ব্যথায় কাহিল হয়ে পড়লেও ফলাফল আসে দুর্দান্ত। বোম্বের কয়েদিদের মাঝে এর প্রয়োগ করে সাফল্য পাওয়া যায়। খুব দ্রুত এ টিকা ব্যবহার করে পুনা, পালামপুর, সিন্ধু ও হায়দ্রারাবাদে অসামান্য সুফল আসে।

ডিপথেরিয়া ও ধনুস্টকারের টিকা

ডিপথেরিয়া চিকিৎসার প্রতিষেধক সিরাম থেরাপি উদ্ভাবন করে ১৯০১ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন জার্মান বিজ্ঞানী অ্যাডলফ এমিল ফন বেহরিং (১৮৫৪-১৯১৭)। ডিপথেরিয়া এন্টিটোক্সিন আবিষ্কার করে চিকিৎসা বিজ্ঞানে তিনিই প্রথম নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। তার এ আবিষ্কারের জন্য ইতিহাসে তিনি ‘সেভিয়ার অব চিলড্রেন’ হিসেবে পরিচিতি পান। 

তার পরে জাপানি চিকিৎসক শিবাসাবুরো কিতাসাতো ডিপথেরিয়া এবং ধনুষ্টংকারের টিকা আবিষ্কার করেন। 

পোলিওর টিকা

১৯৫৫ সালে মার্কিন বিজ্ঞানী জোনাস এডোয়ার্ড সক (১৯১৪-১৯৯৫) পোলিওর প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কার করেন। এই রোগের টিকা আবিষ্কার হওয়ার আগে অসংখ্য আক্রান্ত মানুষ মারা গেছে। 

ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৮ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসে প্রায় ৫ কোটি মানুষ মারা যায়। ইতিহাসে এটি স্প্যানিশ ফ্লু নামে পরিচিত। ১৯৫৭-১৯৫৮ সালে এশিয়ায় ইনফ্লুয়েঞ্জার সংক্রমণ ঘটলে প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ মানুষ মারা যায়। এশিয়ান ফ্লু নামে এই মহামারি চিহ্নিত হয়ে আছে। 

১৯৪৫ সালে সামরিক ব্যক্তিদের মাঝে ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা প্রয়োগের প্রথম অনুমোদন দেয় যুক্তরাষ্ট্র। পরের বছর সর্বসাধারণের মাঝেও এ টিকা প্রয়োগ করা হয়। টমাস ফ্রান্সিস জুনিয়র, জোনাস এডোয়ার্ড সক—যারা পোলিও টিকা আবিষ্কার করেছিলেন। তারাই ছিলেন এ টিকা তৈরির গবেষকদলের মূল ব্যক্তি। 

১৯৫৭ সালে হংকং থেকে ছড়িয়ে পড়া এশিয়ান ফ্লু মহামারি আকার ধারণ করার শুরুতেই মার্কিন বিজ্ঞানী মরিস হিলম্যান তার সহকর্মীদের নিয়ে ভ্যাকসিন তৈরি করে প্রস্তুত হয়ে থাকেন। এই মহামারিতে প্রায় ৭০ হাজার মার্কিন নাগরিক প্রাণ হারায়। গবেষকদের ধারণা, হিলম্যানের টিকা না থাকলে অন্তত ১ মিলিয়ন মার্কিন নাগরিক মারা যেত। স্বাস্থ্য গবেষকরা জীবন রক্ষার এ কৃতিত্ব হিলম্যানের টিকাকে দেন। 

এমন সব অসাধারণ ইতিহাস রয়েছে টিকা নিয়ে। সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় জানা যায়, ১৯৫৩ সালে জোনাস সকের পোলিও ভাইরাসের নিরাপদ ও কার্যকর প্রতিষেধক আবিষ্কার প্রাণঘাতী রোগটি থেকে মানুষকে বিভীষিকামুক্ত করেছিল। মূলত বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ফলে টিকা উদ্ভাবনের এ করকম বিস্ফোরণ ঘটে। 

এ ছাড়া ১৯১৪ সালে হুপিং কাশি, ১৯২৬ সালে ডিফথেরিয়া), ১৯৩৮ সালে টিটেনাস ও ১৯৪৮ সালে মাম্পসের বিভীষিকা থেকে রক্ষা পায় মানুষ। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, এ পর্যন্ত ২৫টি রোগের টিকা আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মাঝে কলেরা, প্লেগ, অ্যানথ্র্যাক্স, হাম, রুবেলা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ডিপথেরিয়া, মাম্পস, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস এ এবং বি, যক্ষ্মা, টাইফয়েড, পোলিও, জলাতঙ্ক ইত্যাদি রোগ রয়েছে। 

তবে এখনো বহু রোগের টিকা আবিষ্কার করতে পারছেন না বিজ্ঞানীরা। জিকা ভাইরাসের সংক্রমণের তিয়াত্তর বছর হতে চলল এখনো এর টিকা উৎপাদন করা সম্ভব হয়নি। সার্স, মার্স বা এইডসের মতো ঘাতক ব্যধির টিকা এখনো অধরাই রয়ে গেছে।

গ্রন্থনা: আবু নাঈম মনির 

 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত