১৫ এপ্রিল, ২০২১ ০৮:৫২ পিএম

ডা. মঈনের আত্মোৎসর্গের এক বছর: করোনাযোদ্ধাদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি

ডা. মঈনের আত্মোৎসর্গের এক বছর: করোনাযোদ্ধাদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি
ডা. মঈন উদ্দিন আহমদ। ছবি: সংগৃহীত

মাহফুজ উল্লাহ হিমু: আজ ১৫ এপ্রিল। বৈশ্বিক মহমারী করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দেশে প্রথম প্রাণোৎসর্গকারী চিকিৎসক ডা. মঈন উদ্দিন আহমদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। আজকের এই দিনে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মঈন।

করোনাকালে যখন সারাদেশ আতঙ্কিত তখন ও চিকিৎসা সেবা প্রদান করছিলেন অকুতোভয় এ সম্মুখযোদ্ধা। করোনার প্রাদুর্ভাবের পরও তিনি হাসপাতাল ও চেম্বারে চিকিৎসা দিয়ে আসছিলেন। করোনা রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা দিতে গিয়ে এক পর্যায়ে নিজেই প্রাণঘাতী ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হন। প্রথমে সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমেদ হাসপাতাল এবং পরে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সর্বশেষে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। সেখানে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় গত বছরের এই দিনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

কেঁপে উঠে চিকিৎসক মহলসহ সারাদেশ

করোনাযোদ্ধা ডা. মঈনের মৃত্যুতে সে দিন চিকিৎসক সমাজে শোকের ছায়া নেমে আসে। কেঁপে উঠে স্বাস্থ্যখাতসহ গোটা দেশ। নিবেদিতপ্রাণ এ চিকিৎসকের মৃত্যুতে শোক প্রকাশের পাশাপাশি স্বজনদের প্রতি সমবেদনা জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর পরিবারের সকল প্রকার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেয় সরকার।

গভীর শোক প্রকাশ করে চিকিৎসকদের অভিভাবক সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনসহ (বিএমএ) বিভিন্ন চিকিৎসক-অচিকিৎসক সংগঠন।

ডা. মঈন জাতির জন্য যে ত্যাগ রেখে গেছেন, তা জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণে রাখবে উল্লেখ করে গত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন,‘আমি ডা. মঈনের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে সাথে সাথেই কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ছুটে গিয়েছি। সেখানে তাঁর মৃতদেহ দেখেছি এবং উনার স্ত্রীর সাথে কথা বলেছি। প্রধানমন্ত্রীও ডা. মঈনের মৃত্যুর খবর শুনে শোক জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তাঁর পরিবারের সকল প্রকার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।’

ডা. মঈনের মৃত্যুতে বিএমএ সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ও মহাসচিব ডা. মো. ইহতেশামুল হক চৌধুরী এক বিবৃতিতে শোক প্রকাশ করেন। বিবৃতিতে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন তাঁরা।

ডা. মঈন চিকিৎসক সমাজসহ বাঙালি জাতির গর্ব উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) তৎকালীন ভাইস-চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, ‘ডা. মঈন উদ্দীন আহমদ নিয়মিত প্রাইভেট প্রাকটিস করতেন এবং সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের হাসপাতালেও দায়িত্ব পালন করতেন। তিনি করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অকুতোভয় বীর সৈনিক। এমন মহান বীরের মৃত্যু নাই। তিনি আমাদের চিকিৎসক সমাজসহ সমগ্র বাঙালি জাতির গর্ব।’

ডা. মঈনের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ

করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সেবায় দায়িত্বরত চিকিৎসক-নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে থাকা মাঠ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও সশস্ত্র বাহিনী এবং প্রত্যক্ষভাবে নিয়োজিত সরকারি কর্মচারীরা দায়িত্ব পালনকালে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

এরপর গত ২৩ এপ্রিল এই বিষয়ে একটি পরিপত্র প্রকাশ করে অর্থ মন্ত্রণালয়। যাতে বলা হয়, করোনা আক্রান্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের বেতন কাঠামো অনুযায়ী ৫ লাখ টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা এবং আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে তার পরিবার ২৫ লাখ টাকা থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাবেন।

এর অংশ হিসেবে তাঁর পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ২৭ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ ডা. মঈনের পরিবারের নামে ৫০ লাখ টাকা করে মঞ্জুরি দিতে প্রধান হিসাব কর্মকর্তার কাছে চিঠি পাঠান। অর্থ বিভাগের ড্রইং অ্যান্ড ডিসবার্সিং অফিসার (ডিডিও) ডা. মঈনের স্ত্রীর কাছে ক্ষতিপূরণের চেক হস্তান্তর করেন।

চিকিৎসকদের প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি

জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘ডা. মঈন উদ্দিন আহমেদ করোনা যুদ্ধে অসমান্য অবদান রাখা একজন ব্যক্তি। তিনি তাঁর জীবন দিয়ে চিকিৎসকদের দায়িত্বশীলতার নিদর্শন রেখে গেছেন। চিকিৎসকরা জীবন বাজি রেখে, পরিবারকে ঝুঁকিতে রেখে কাজ করে যাচ্ছে।’ 

চিকিৎসক প্রণোদনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকারের বাকি সেক্টরগুলোতে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু চিকিৎসকরা পাচ্ছে না, এটি খুবই দুঃখজনক। চিকিৎসকরা ফ্রন্ট লাইন ফাইটার, তাঁদের প্রণোদনা না দেওয়া অন্যায় ও অমানবিক কাজ। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমি জোর দাবি জানাচ্ছি।’

চিকিৎসকদে আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. মো. ইহতেশামুল হক চৌধুরী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘করোনা মহামারীর পর থেকে আজ পর্যন্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ডা. মঈনসহ প্রাণ দিয়েছেন শতাধিক চিকিৎসক। চিকিৎসক সমাজের অকুতোভয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন তা পরবর্তী প্রজন্ম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। তাঁদের প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে থেকেই প্রথম বলেছিলেন। তিনি চিকিৎসকদের মানসিক বল জোগাতেই এ উদ্যোগ নিয়েছেন, তাঁদেরকে এই বার্তা দেওয়ার জন্য যে, সরকার তাদের পাশে আছে।’

‘মৃত চিকিৎসকের পরিবারের সহায়তায় প্রণোদনার অর্থের পরিমাণটা কোনো বিষয় নয়। প্রণোদনা মূলত রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সম্মাননা। চিকিৎসকদের প্রণোদনা প্রদানের জন্য বিএমএ বারবার মন্ত্রণায়কে লিখিতভাবে জানিয়েছে। আমরা মন্ত্রী ও সচিব মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। কিন্তু তা এখনও কার্যকর হয়নি, এটি দুঃখজনক। এটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ব্যর্থতা,’ যোগ করেন বিএমএ মহাসচিব।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশনের  (বিডিএফ) প্রধান সমন্বয়ক ডা. নিরুপম দাশ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘প্রণোদনা বিষয়টি আর্থিক হিসেবে নয়, বরং তা একজন চিকিৎসককে মানসিকভাবে বুস্টআপ করার বিষয়। রাষ্ট্র তাঁর কার্যক্রমকে সাপোর্ট করছে—এই বার্তা দেওয়া। করোনার সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকদের মৃত্যুর ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ডা. মঈন ছাড়া আর কোনো চিকিৎসকের পরিবার ক্ষতিপূরণের অর্থ পেয়েছে বলে জানা নেই।’

‘চিকিৎসকরা কাজ করতে গিয়ে মারা যাচ্ছেন, তাঁদের প্রতি রাষ্ট্রের কোনো দায় নাই, এটা খুবই দুঃখজনক। করোনায় কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য প্রণোদনা হিসেবে দুই মাসের বেতনটা তেমন কিছু নয়, স্বীকৃতিটাই প্রধান’, যোগ করেন বিডিএফের প্রধান সমন্বয়ক। 

এ প্রসঙ্গে ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি, রাইটস এন্ড রেস্পন্সিবিলিটিজের (এফডিএসআর) মহাসচিব ডা. শেখ আবদুল্লাহ আল মামুন মেডিভয়েসকে বলেন, ‘চিকিৎসকদের প্রণোদনা ও ক্ষতিপূরণের বিষয়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিল। সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় ঘোষণার মাধ্যমে বলা হয়েছে চিকিৎসকদের মধ্যে যারা আক্রান্ত হবে তাঁদের গ্রেড অনুযায়ী পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকা প্রদান করা হবে। যাঁরা মৃত্যুবরণ করবেন তাদের গ্রেড অনুযায়ী ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। একইসঙ্গে যারা ডিউটি করবেন তাদের দুই মাসের বেসিকের সমান অর্থ প্রদান করা হবে। আমরা চাই এ ঘোষণা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হোক।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশীদ আলমের বরাত দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এ লক্ষ্যে সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। ধাপে ধাপে চিকিৎসকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।’

প্রসঙ্গত, বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের সংক্রমণের শুরু থেকেই সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন দেশের চিকিৎসকরা। সুরক্ষা সামগ্রীর ঘাটতিসহ নানা কারণে ব্যাপক সংখ্যক চিকিৎসক ভাইরাসটির ছোবলে না ফেরার দেশে পাড়িয়ে জমিয়েছেন, যা বিশ্বের অন্যান্য যে কোনো দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য। তাদের মধ্যে রয়েছেন নবীন থেকে শুরু করে অনেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) তথ্যমতে, মহামারীর সময়ে সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে কাজ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১৪০ জন চিকিৎসক। আর আক্রান্ত হয়েছেন দুই হাজার ৯১০ জন।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি