স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে গুরুত্ব দিতে হবে: অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক
করোনাভাইরাস মহামারীর এক বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। এই সময়ে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। আর করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। ফলে অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার তারিখ। স্বাস্থ্য শিক্ষাসহ নানা বিষয় নিয়ে মেডিভয়েসের মুখোমুখি হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাখাওয়াত আল হোসাইন।
মেডিভয়েস: দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে আপনার ভাবনা জানতে চাই।
অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক: দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কিছু কিছু জায়গা আছে, যা সংস্কার প্রয়োজন। করোনার এ সংকটে আমরা তা উপলদ্ধি করেছি। সরকারও তা উপলদ্ধি করছে। জনগণের মৌলিক সেবার জায়গা দুটি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। আমাদের চিকিৎসাবিদরা ভালো বলতে পারবেন। সবসময় সবকিছু এককভাবে থাকে না, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবকাঠামোগত কিছু দুর্বলতা রয়েছে তা দূর করার জন্য গুরুত্ব দিতে হবে।
মেডিভয়েস: জেলা পর্যায়ের অনেক হাসপাতালে যথাযথ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?
অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক: বিভিন্ন সময় দেখা যায়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জেলা পর্যায় যেতে আগ্রহবোধ করেন না। এছাড়াও নানা সমস্যা রয়েছে, জেলায় সেই ধরনের সুযোগ-সুবিধাও নেই। চিকিৎসা শাস্ত্রে যাদেরকে দক্ষ করে তোলা হচ্ছে তাদেরও সাধারণ মানুষের প্রতি একটা দায়িত্ব রয়েছে। এটা সমন্বিত বিষয়, সরকারের ওপর এককভাবে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।
মেডিভয়েস: চিকিৎসকদের অনেকেই বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডার বাদ দিয়ে অন্য ক্যাডারে চলে যাচ্ছেন, এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন।
অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক: লেখাপড়ার বিষয়টা আমরা একভাবে নির্দিষ্ট করি। দেখা গেছে, লেখাপড়ার ক্ষেত্রে আগ্রহ আছে চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। কিন্তু লেখাপড়া শেষ করে যদি তারা মনে করে যে, প্রজাতন্ত্রকে অন্যভাবে সবচেয়ে বেশি সেবা দিতে পারবে; এটা দোষের কিছু নয়। তবে ভেতরে দেশপ্রেম থাকতে হবে, চেতনাবোধ থাকতে হবে। একজন ভালো ছাত্র সে যেখানেই যাক না কেন সে সবখানেই ভালো করবে। তার মধ্যে সেই ধরনের আকাঙ্ক্ষা ও আগ্রহ থাকতে হবে।
মেডিভয়েস: আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ছিলেন। আপনার অভিভাবকত্বে ঢাকা বিভাগের সব মেডিকেল পরিচালিত হয়েছে। দেশের মেডিকেল শিক্ষা কারিকুলাম কতটুকু যুগোপযোগী? আপনার ভাবনা কী?
অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক: এগুলো হলো ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। বহুদিন ধরে এ শিক্ষা কার্যক্রমটা চলছে। এটা আমরা আধুনিক করার চেষ্টা করেছি। সবকিছু আধুনিক করতে পেরেছি এমনটা নয়। যারা প্রশাসনে আছে, তাদের এ বিষয়গুলো ধারাবাহিকভাবে দেখা উচিত। তবে উন্নত বিশ্বের মেডিকেল শিক্ষা কার্যক্রমে সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। কিছু কিছু বিষয়ে আছে প্রাচীন সে বিষয়গুলোর মধ্যে যা অপ্রয়োজন তা বাদ দিতে হবে। আমার মধ্যে কখনও শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে আত্মসন্তুষ্ট ছিল না, সবসময় শিক্ষা ব্যবস্থা উন্নত করার চেষ্টা চালিয়েছি। আর ছাত্র-ছাত্রীদের লেখাপড়ার জায়গাটা বাড়াতে হবে। সেই সুযোগ আমাদের আছে।
মেডিভয়েস: অনেকেই মেডিকেল কারিকুলামে বাংলা মিডিয়াম যুক্ত করার কথা বলছেন। এ নিয়ে চিকিৎসকদের পক্ষে-বিপক্ষে মতামত রয়েছে। একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে আপনার মতামত কী?
অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক: বাংলা ভাষা অত্যন্ত সমৃদ্ধ ভাষা। সেই ভাষাকে আমরা সঠিকভাবে ব্যবহার করছি না। আজকে জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স এসব দেশ তারা তাদের নিজ ভাষায় শিক্ষা অর্জন করছে। বঙ্গবন্ধু আমাদেরকে সেই স্বপ্ন দিয়ে গেছেন যে উচ্চ শিক্ষার সর্বস্তরে বাংলার প্রচলন করতে হবে। শিক্ষার সব মাধ্যম হবে বাংলা। এখনও আদালতে বাংলা ভাষার প্রচলন করতে পারিনি। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জা ও দুঃখজনক। শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রে নয়, আমাদের উচিত সবখানে বাংলা ভাষার ব্যবহার করা। এছাড়া নোবেল পুরস্কার যারা পায়, তাদের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই-তারা নিজ ভাষায় শিক্ষা অর্জন করেছে। তাই তাদের ভিত্তি খুবই মজবুত, এজন্য তারা আমাদের চেয়ে বেশি এগিয়ে আছে।
মেডিভয়েস: দেশের নার্সিং শিক্ষা কতটুকু যুগোপযোগী?
অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক: আমাদের দেশের নার্সিং শিক্ষা উন্নত বিশ্বের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। সারাবিশ্বে নার্সদের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে ছিলাম তখন নার্সিং শিক্ষা নিয়ে কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছি। ঢাবির অধীনে আলাদা একটি নার্সিং প্রতিষ্ঠান করে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য উন্নত দেশের নার্সিং শিক্ষার সাথে তালমিলিয়ে চলার মতো যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছি। অনেকেই রয়েছেন যারা দক্ষ নার্স হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। এখন পদক্ষেপ নিতে হবে নার্সিং শিক্ষাটা সম্মানিত পেশায় উন্নীত করা।
মেডিভয়েস: নার্সিং শিক্ষা কি শুধু বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা নিবে?
অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক: নার্সিং শিক্ষার মধ্যে কলা বাণিজ্য ও বিজ্ঞানের কোনো বিভাজন করা ঠিক হবে না। এ পেশায় যারা যাবে, তাদের শুধু সাধারণ যোগ্যতা দেখা উচিত। উন্নত দেশে (মাধ্যমিক/ উচ্চমাধ্যমিক বিভাগে) কে কোন বিভাগে পড়াশোনা করে সেটা দেখে না। যার যে বিষয়ে আগ্রহ আছে তাকে সেটাই করতে দেওয়া উচিত। কেউ বিজ্ঞান পড়তে পারেনি বলে তাকে এ পেশার জন্য পড়তে দেওয়া হবে না এটা করা উচিত হবে না। বরং, নার্সিং পেশায় বিজ্ঞানের যতটুকু অংশটা শিক্ষার্থীদের জানা খুবই জরুরি সেটা নার্সিংয়ের সিলেবাসের সঙ্গে সংযুক্ত করে নিলেই হয়।
মেডিভয়েস: করোনার এক বছরে শিক্ষা ব্যবস্থায় যে ক্ষতি তা পোষানো কি সম্ভব?
অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক: সময়ের দিক থেকে আমরা কখনো পেছনের দিকে যেতে পারি না। এক বছরের বেশি সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে, এ সময়টা কিন্তু আমাদের জীবন থেকে চলে গেছে। এটা শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রে নয়; সর্বক্ষেত্রে গোটা পৃথিবী পিছিয়ে গেছে। পেছনের দিনগুলো নিয়ে হাহুতাশ বা আক্ষেপ করে কোনো লাভ নেই। আমাদেরকে দেখতে হবে সামনের দিনগুলো কিভাবে অর্থপূর্ণ করা যায়। অর্থাৎ আমাদের করোনা সংক্রমণ কতদ্রুত নিয়ে আনতে পারি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কত দ্রুত খোলা যায়। কত দ্রুত আমাদের জীবন থেকে এক বছর হারিয়েছে, সেটা পোষাতে পারি। সময়টা কখনো ফিরিয়ে আনা যাবে না। তবে ক্ষতিগুলো এইভাবে পূরণ করা সম্ভব যে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার সাথে সাথে অতিরিক্ত ক্লাস নিতে হবে। পরিশ্রম করতে হবে।
মেডিভয়েস: সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক: আপনাদেরও ধন্যবাদ। মেডিভয়েসের পাঠকদের জন্য শুভেচ্ছা রইল।
-
০৮ জুলাই, ২০২৫
-
২৪ জুন, ২০২৫
-
২৩ জুন, ২০২৫
-
১৯ জুন, ২০২৫
-
১৮ জুন, ২০২৫
-
১৪ জুন, ২০২৪
-
০৭ জুন, ২০২৪
-
০৩ জুন, ২০২৪