ডা. রীপা চক্রবর্তী

ডা. রীপা চক্রবর্তী

এম এস সি পাব্লিক হেলথ (অন কোর্স)

লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন এন্ড ট্রপিকাল মেডিসিন

লন্ডন, যুক্তরাজ্য।


৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০১:২৪ পিএম

করোনা প্রতিরোধে মুখ ও দাঁতের যত্ন নেয়া কেন জরুরি?

করোনা প্রতিরোধে মুখ ও দাঁতের যত্ন নেয়া কেন জরুরি?

প্রাণঘাতি করোনাভাইরাসের প্রথম ও প্রধান আশ্রয়স্থল আমাদের মুখের ভেতরভাগ। চিকিৎসকরা বলছেন, মুখের ভেতরে থাকা লালাগ্রন্থিতে কোভিড-১৯ ভাইরাস চুপচাপ বসে থাকে। সেই সময়টাতে আক্রান্তের কোনোরকম উপসর্গই থাকে না, অর্থাৎ অ্যাসিম্পটোম্যাটিক অবস্থায় থাকে। হাঁচি, কাশি, কথা বলার সময় ড্রপলেটের মাধ্যমে অসুখ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি খুব বেশি। এ অবস্থায় ওরাল হাইজিন অর্থাৎ মুখের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে কোভিড-১৯ ভাইরাসকে কিছুটা প্রতিহত করা যায়।

ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘Prevention is better than cure’ অর্থাৎ প্রতিষেধক অপেক্ষা প্রতিরোধ উত্তম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থ্যা, দ্য ন্যাশনাল রিসোর্স কাউন্সিল অব ইউএসএ, দ্য ন্যাশনাল হেলথ অব সায়েন্স (ইউএসএ), দ্য ইউএস পাবলিক হেলথ সার্ভিস, দ্য আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোশিয়েশনের বিভিন্ন প্রতিবেদন ভিন্নভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যার চুম্বক অংশ নিম্নে সবার জন্য তুলে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

মহামারির এ সময় বাড়িতে বসে অন্য রোগের মতো মুখ এবং দাঁতের যত্ন এভাবে নিতে পারেন-

১. করোনাভাইরাস পরিস্থিতির মধ্যে অবশ্যই ব্যক্তিগত সুরক্ষাব্যবস্থা মেনে, ছয় মাসে একবার রেজিস্টার্ড ডেন্টাল প্র্যাকটিশনারের কাছে গিয়ে মুখ এবং দাঁতের পরীক্ষা করা, বিশেষ করে যাদের দাঁতে ক্যালকুলাস বা প্লাক পড়ে এবং যাঁদের হার্ট, বহুমূত্র, অধিকন্তু লিভার সমস্যা আছে।

২. করোনাভাইরাস বিস্তারে মুখ অন্যতম একটি মাধ্যম সুতরাং পূর্ণভাবে বাড়িতে মুখ এবং দাঁতের যত্ন নিতে হবে, অবশ্যই দিনে দুবার দাঁত ব্রাশ করা উচিত। বিশেষ করে সকালে এবং রাতে খাবারের পরে, সফট টুথ ব্রাশ দিয়ে দাঁত এবং জিব পরিষ্কার করা উচিত।

উল্লেখ্য যে, আমরা যারা দাঁত ব্রাশ করি, কিন্তু সাধারণত জিব ব্রাশ করি না বা পরিষ্কার করি না, এই জিবের ওপরে সাধারণত সবচেয়ে বেশি ময়লা পড়ে। আমাদের জিবের ওপরে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র আছে, এখানে হাজার হাজার খাদ্যকণা জমে, এগুলো জমে জমে ‘Volatile Sulfur Compounds’ নামে একধরনের গ্যাস তৈরি করে, এই গ্যাসই মূলত দুর্গন্ধের জন্য দায়ী, সুতরাং মাড়ি এবং দাঁত পরিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে জিবও পরিষ্কার করা উচিত। এ ক্ষেত্রে বাজারে ভালো ব্র্যান্ডের ফ্লোরাইড টুথপেস্ট ব্যবহার করা যেতে পারে এবং অবশ্যই আপনার টুথব্রাশ ৩ থেকে ৪ মাস পর পর পরিবর্তন করতে হবে এবং বাজারে জিব পরিষ্কার করার অনেক উপকরণ আছে, তা ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে সাময়িকভাবে দাঁত মাজার ব্রাশ দিয়েও পরিষ্কার করা যেতে পারে।

৩. অনেকের দেখা যায় দাঁত ব্রাশ করলে বা এমনি এমনি মাড়ি হতে রক্ত বের হয়। এটা দুটো কারণে হয়, স্থানীয় কারণ, যেটাকে আমরা বলি ডেন্টাল প্লাক, এটা স্কেলিং দ্বারা সারানো যেতে পারে, আরও একটি হলো অজানা কারণ, যেমন কারও রক্তে প্লাটিলেট কমে গেলে বা দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিস থাকলে সুতরাং সঠিক ডায়াগনোসিস দ্বারা বোঝা যাবে এর কারণ এবং সে অনুসারে রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে।

সাধারণ কারণের জন্য আমরা যে ধরনের ট্রিটমেন্ট দিয়ে থাকি তা হলো: বাজারে অনেক ধরনের মাউথওয়াশ পাওয়া যায়, এগুলো সাধারণত মানুষ ব্যবহার করে থাকে, যার বেশির ভাগই অ্যালকোহল যুক্ত। আমার পরামর্শ হলো, এগুলো বর্জন করে বাসায় তৈরি অল্প গরম লবণ মিশ্রিত পানি দিয়ে গারগেল করা যেতে পারে এবং কুলি করা যেতে পারে। এতে মুখ এবং জিবগহ্বরে ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে না, ফলে রোগীর অন্য কোনো সমস্যা না থাকলে দাঁত থেকে রক্ত পড়া আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যায় এবং করোনা রোগীদের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত কার্যকরী হিসেবে পৃথিবীতে প্রমাণিত হয়েছে। এখানে অবশ্যই একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে আপনার মাড়িতে বা মুখে ঘা আছে কি না, যদি থাকে তবে অবশ্যই পরীক্ষা করে আপনার যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

৪. প্রত্যেক মানুষকে অবশ্যই করোনাকালীন সুষম খাদ্য গ্রহণ করা উচিত, বিশেষ করে সবুজ শাকসবজি, ভিটামিন সি এবং প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে জ্যাঙ্ক ফুড পরিহার করতে হবে। সঙ্গে আমার পরামর্শ হলো সব ধরনের চিনি–জাতীয় খাবার বর্জন করা উচিত। বিশেষ করে যাদের মুখগহ্বর শুষ্ক থাকে এবং মুখে পর্যাপ্ত লালা জমে না, সাধারণত তাদের, দাঁতের রোগের সঙ্গে সঙ্গে মুখে দুর্গন্ধ হয়। এ থেকে বাঁচার জন্য সাময়িকভাবে সুগারলেস চুইংগাম বা লজেন্স খাওয়া যেতে পারে বা মুখে এলাচি বা লবঙ্গ চিবানো যেতে পারে। 

৫. তামাকের সঙ্গে ফুসফুসের ক্ষতি এবং এর সঙ্গে করোনা রোগের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে সুতরাং সম্পূর্ণরূপে পান, সুপারি, জর্দা এবং নিকোটিন পরিহার করতে হবে। এগুলোর ফলে দাঁতে ও জিবে নিকোটিন জমে, উক্ত কারণে মুখে পর্যাপ্ত লালা জমতে বাধা দেয় এবং দাঁতের নানা রোগ হয় সুতরাং পান, সুপারি, জর্দা এবং নিকোটিন এগুলো সম্পূর্ণরূপে পরিহার করা উচিত।

৬. নারীরা যখন গর্ভবতী হন, তখন আমরা সাধারণত পরামর্শ দিই পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণের জন্য, কারণ গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের হাড় এবং দাঁতের ভিত্তিরচিত হয়, সুতরাং অনাগত বাচ্চার সুস্থ এবং স্বাভাবিক হওয়ার জন্য মায়ের বিশেষ যত্ন নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

৭. শিশুর ৬ মাস বয়সেই দুধ দাঁত আসতে থাকে কোনো কারণে যদি এটি না আসে এবং ৬ থেকে ৭ বছরে এই দুধদাঁত পরে স্থায়ী দাঁত আসে এই চক্র যদি না সম্পূর্ণ হয়, তবে দেরি না করে অবশ্যই একজন ডেন্টাল সার্জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত।

৮. বাংলাদেশের অনেক মানুষের পেটে আলসার, গ্যাস এবং বদহজমের সমস্যা রয়েছে এবং যাদের কোষ্ঠকাঠিন্য আছে, তাদেরও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা চিকিৎসা প্রয়োজন, কারণ এসব রোগের সঙ্গে দাঁতের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণায় এও দেখা গেছে যারা রেগুলার ক্যাফেইন এবং অ্যালকোহল ব্যবহার করে, তাদের মুখের এবং দাঁতের বিভিন্ন অসুখের জন্য এগুলো দায়ী, সুতরাং এগুলো বর্জন করতে হবে।

৯. গর্ভাবস্থায় মা যদি কোনো কারণে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে থাকেন, তাঁদের বাচ্চার দাঁতে সমস্যা হতে পারে, সুতরাং যাঁরা এই সমস্যায় পড়ে গেছেন, তাঁদের জন্য আমার পরামর্শ হলো, আধুনিক চিকিৎসা দ্বারা সম্পূর্ণভাবে এই সমস্যাগুলো ভালো করা যায়। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড ডেন্টিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করুন এবং আপনার সমস্যার সমাধান করুন।

১০. অনেকে আমার কাছে আসেন দাঁতের হলুদ বর্ণের সমস্যা নিয়ে, যেটি ব্লিচিং দ্বারা সম্পূর্ণরূপে সাদা করা সম্ভব, সুতরাং নানা ধরনের ডেন্টাল চিকিৎসা দ্বারা বৈজ্ঞানিক উপায়ে এই সমস্যা থেকে সম্পূর্ণরূপে ভালো হওয়া সম্ভব।

১১. এখন পৃথিবীব্যাপী করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব হয়েছে এবং তার ওপরে যুক্ত হয়েছে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া সুতরাং চিকনগুনিয়া বা ডেঙ্গু হলে রক্তে প্লাটিলেট কমে, অতএব এটি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত দাঁত বা মাড়ি হতে রক্ত পড়তে পারে এই অবস্থায় প্লাটিলেট স্বাভাবিক হওয়ার চিকিৎসা করতে হবে এবং এরপর যাদের দাঁতের সমস্যা আছে তারা দাঁতের চিকিৎসা করতে পারেন।

সর্বোপরি মেডিকেল এবং ডেন্টাল বিশেষজ্ঞ হিসেবে বলতে পারি, দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম দিতে হবে। কারণ দাঁতের সঙ্গে শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গভীর এবং সুস্পষ্ট যোগাযোগ রয়েছে। সুতরাং দাঁত ভালো থাকলে দেহের প্রবেশপথ ভালো থাকবে এবং করোনাভাইরাস ও প্রবেশ করতে পারবে না। তাই উন্নত বিশ্বে বলা শুরু হয়ে গেছে, ‘Celebration of Birthday once in a year but go to dentist twice in a year’। বছরে দুবার তাই ডেন্টিস্ট দ্বারা মুখ ও দাঁতের পরীক্ষা করে সুস্থ জীবন যাপন করা সম্ভব। এখন ডেন্টিস্টের কাছে গেলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষা মেনে যেতে হবে।

একজন মেডিকেল প্র্যাকটিশনার হিসেবে এই মহামারির সময় আমার পরামর্শ হলো, ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরামর্শ মেনে চলুন, ঘরে থাকুন, আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হোন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন, বিষোদগার কিংবা ঘৃণা-বিদ্বেষ না ছড়িয়ে বরং করোনা মোকাবিলায় যাঁরা ফ্রন্টলাইনে আছেন, তাঁদের সমর্থন করুন, সহায়তা করুন। আপনার সুস্থতা আপনার কাছেই, তাই নিজে বাঁচুন, পরিবার ও প্রতিবেশীকে বাঁচান এবং উপরিউক্ত পরামর্শগুলো মেনে চলুন।

করোনার সংক্রমণ প্রতিরোধের অংশ হিসেবে জরুরি ও মারাত্মক কোনো মুখ ও দাঁতের সমস্যা ব্যতিত অন্য কোনো সমস্যার ক্ষেত্রে ডেন্টাল সার্জনরা সরাসরি চিকিৎসা নেয়া থেকে রোগীদের নিরুৎসাহিত করেছেন। ডেন্টাল সার্জন ও ডেন্টাল স্টাফরা রোগীর সবচেয়ে বেশী কাছাকাছি থেকে চিকিৎসা প্রদান করে থাকেন বিধায় করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি।

আবার দন্ত চিকিৎসা পদ্ধতির বেশিরভাগই এরোসেল জেনারেট করে থাকে। যেহেতু করোনা ভাইরাস ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়ায় তাই ডেন্টাল চেম্বারের আবদ্ধ পরিবেশে করোনা আক্রান্ত কারো থেকে জীবাণুটি বায়ুতে এবং সংস্পর্শে আসা কোনো বস্তু ও ব্যাক্তি থেকে যে কাউকে সংক্রমিত করতে পারে। আর এর মাধ্যমে ডেন্টাল সার্জন, তার ডেন্টাল অফিসের স্টাফ, রোগী, রোগীর স্বজন -সবাই স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

  ঘটনা প্রবাহ : করোনাভাইরাস
স্বাস্থ্য প্রশাসনে অন্য ক্যাডার

কর্মসূচিতে যাওয়ার হুমকি পেশাজীবী চিকিৎসক নেতাদের

জামাই-শ্বশুর মিলে ভুয়া চিকিৎসা

তৃতীয় শ্রেণি পাস করেই ‘বিশেষজ্ঞ’ চিকিৎসক

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে