০৬ মে, ২০২০ ০৯:০৮ পিএম

‘জীবনের প্রশ্নে প্রণোদনা ‍কিছুই না, সেবাই ব্রত’

‘জীবনের প্রশ্নে প্রণোদনা ‍কিছুই না, সেবাই ব্রত’

বিল্লাল হোসেন রাজু: ‘করোনা আক্রান্ত শুনলে সবাই যখন পালিয়ে যায়, তখন চিকিৎসকরা এসব রোগীদের সেবা দিয়ে সুস্থ করে তুলছেন। আমরা দায়িত্ববোধ থেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এ সেবা দিয়ে যাচ্ছি। চলমান করোনা সংকটে চিকিৎসকদের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীরাও। সেবা দিতে গিয়ে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন সহস্রাধিক স্বাস্থ্যকর্মী।’

দেশের প্রথম করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল ‘কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল’। এ হাসপাতালের আইসিইউতে করোনা রোগীদের সেবা দিচ্ছেন সহকারী রেজিস্ট্রার চিকিৎসক ইসমাইল হোসেন রিয়াদ। হাসপাতালে করোনা রোগীদের সেবা দেওয়ার অভিজ্ঞতাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মেডিভয়েসের সাথে এসব কথা বলেন তিনি। 

‘করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে আমরা নিজেরাও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছি। করোনাভাইরাসের ঝুঁকির মধ্যে থেকেই আমরা সেবা দিচ্ছি। জীবনের প্রশ্নে প্রণোদনা ‍কিছুই না, সেবাই আমাদের ব্রত। কিছু না পেলেও আমরা সেবা দিয়ে যাবো। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে করোনায় চিকিৎসা দিতে গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছে বহু চিকিৎসক। যদিও করোনা আক্রান্তদের মধ্যে ৮০ শতাংশই সুস্থ হয়ে যায়। কিন্তু কার ক্ষেত্রে ভাইরাসটি খারাপ হবে, এমনটা বলা সম্ভব নয়। যে কারো ক্ষেত্রেই করোনা মৃত্যু ডেকে আনতে পারে। তাছাড়া আমরা যেহেতেু আইসিইউতে ডিউটি করি, সংক্রমণের ঝুঁকি আমাদের সবচেয়ে বেশি। কেননা এখানে ভাইরাসের সংখ্যা অনেক বেশি থাকে। আসলে একটা করোনা হাসপাতালের অবস্থা বলে বুঝানো সম্ভব নয়। ব্যক্তিগতভাবে চিন্তা করলে আমি আমার পরিবারের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমাকে নিয়ে তারা চিন্তিত। তবুও আল্লাহর উপর ভরসা করে সেবা দিয়ে যাচ্ছি।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের চিকিৎসকদের মধ্যে অনেকেই আছেন, যারা স্বামী স্ত্রী দুইজনই করোনা ইউনিটে দায়িত্ব পালন করায় তাদের শিশু সন্তানকেও খাওয়াতে যেতে পারছেন না। এটাকে কিভাবে দেখবেন আপনারা? তাই বলতে চাই, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের নিশ্বাস আছে, আমরা সেবা দিয়ে যাবো। বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা। এতো এতো অসুস্থ মানুষকে রেখে, আমরা কোনভাবেই বসে থাকতে পারি না। সেবাই আমার মূল উদ্দেশ্যে। এখান থেকে পিছু হাঁটার কোন সুযোগ নেই।’ 

‘অনেকে মনে করছেন করোনাভাইরাস আক্রান্ত হলেও তাদের কিছুই হবে না। প্রকৃত অর্থে প্রতিনিয়তই বদলাচ্ছে করোনা আক্রান্তদের উপসর্গের ধরণ। এখন সব বয়সের ব্যক্তিই করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন এবং অনেকে মারাও যাচ্ছেন। ফলে কে আক্রান্ত হবে, আর কে আক্রান্ত হবে না, তা বলা যাচ্ছে না। তাই সবার উদ্দেশ্যে বলতে চাই, নিজের পরিবারের কথা চিন্তা করে হলেও অন্তত বাসায় থাকেন। কোভিড-১৯ যে কোন বয়সের জন্যই মরণঘাতী। কোন  মানবিক মানুষ কখনোই অন্যদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারেন না।’

নিজ পরিবারকে নিয়ে ডা. রিয়াদ বলেন, ‘পরিবারের সদস্যদের কাছে আমিই সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। আমার লস তাদের জন্য সবোর্চ্চ। মানুষ মনে করে চিকিৎসকদের শুধুই কাজ চিকিৎসা দেওয়া। কিন্তু আমরাও তো কারো সন্তান, কারো ভাই, কারো বোন কিংবা কারো স্বামী। এতো ঝুঁকির মধ্যেও তারা আমাদের কাজে আসতে দেয়। তাদের ত্যাগটা কোন অংশেই কম নয়।’

‘প্রকৃতঅর্থে সবাই নিজের জীবনকেই বেশি ভালোবাসে। প্রত্যাকটা মানুষ কামনা করে স্বজনরা কাছে আসবে, মৃত্যুর পর মাটি দিবে। কিন্তু করোনার মৃত্যুও আপনজনদের দূরে সরিয়ে দেয়। চিকিৎসক হিসেবে আমাদের ভয়টা আমাদের জন্য নয়, বরং পরিবারের জন্য।’ 

‘জীবনের প্রয়োজনে বহু মানুষকেই বাসার বাইরে যেতেই হচ্ছে, তাই তাদের যথেষ্ট সচেতন থাকতে হবে। করোনা মোকাবেলায় সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সমাজের বৃত্তবানদের এগিয়ে আসার আহবান জানান তিনি।’

উল্লেখ্য, ডা. ইসমাইল হোসেন রিয়াদ ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সমাপ্ত করেন। পরে লন্ডনের ইউনিভার্সিটি অব নটিংহাম থেকে এমআরসিপি ও এমএসসি (ব্রেইন ইমেইজিং) ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ৩২ তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে বর্তমানে ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে সহকারী রেজিস্ট্রার চিকিৎসক  হিসেবে কর্মরত আছেন। 

  ঘটনা প্রবাহ : করোনাভাইরাস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি