কলেরা প্রতিরোধে দেশজুড়ে নতুন টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী
মেডিভয়েস রিপোর্ট: দেশে কলেরা প্রতিরোধে প্রথমবারের মতো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রোগ প্রতিরোধমূলক মুখে খাওয়ার কলেরা টিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নগর ভবন মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন’ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে নতুন করে ম্যালেরিয়া, এইচআইভি ও এইডসের মতো বিভিন্ন সংক্রামক রোগের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। এসব রোগ মোকাবিলায় চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রশাসনের সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
তিনি বলেন, অসচেতনতা, অপরিচ্ছন্নতা ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের কারণে মানুষ অনেক সময় প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকিতে পড়ছে। করোনাকালীন হাত ধোয়া, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের মতো অভ্যাস নিয়মিত চর্চা করা গেলে সংক্রামক রোগের বিস্তার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, রোগ প্রতিরোধে টিকাদানের পাশাপাশি সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, নিরাপদ পানি ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে জনগণকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
শনিবার থেকে প্রথম ডোজ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, শনিবার থেকে নির্ধারিত এলাকাগুলোতে কলেরার মুখে খাওয়ার টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হবে। দ্বিতীয় ডোজ দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হবে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর।
কর্মসূচির আওতায় মোট ৫১ লাখ ৭৫ হাজার ২৫ জনকে দুই ডোজ করে মোট এক কোটি তিন লাখ ৫০ হাজার ৫০ ডোজ টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোট ১৪টি এলাকায় এই টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
এক বছরের বেশি বয়সীদের জন্য
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ জানান, এক বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিদের এই টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে টিকা গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে।
অন্তঃসত্ত্বা নারী, তীব্র সংক্রমণে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং টিকার কোনো উপাদানে গুরুতর অ্যালার্জির ইতিহাস রয়েছে এমন ব্যক্তিদের টিকা না নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে কলেরাজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যু ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। এ জন্য দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
হালিমুর রশিদ আরও বলেন, টিকা কলেরার জীবাণুর বিরুদ্ধে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরিতে সহায়তা করে। তবে শুধু টিকাদানের মাধ্যমে কলেরা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। নিরাপদ পানি, উন্নত স্যানিটেশন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পাঁচ বছর ধরে চলবে কার্যক্রম
অনুষ্ঠানে আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী অধ্যাপক ফিরদৌসী কাদরী বলেন, বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রোগ প্রতিরোধমূলক কলেরা টিকাদান কার্যক্রম শুরু হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে কলেরা ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, এর আগে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম এবং ২০২২ সালের কলেরার প্রাদুর্ভাবের সময় দেশে প্রায় এক কোটি ডোজ কলেরা টিকা দেওয়া হয়েছিল। তবে এবারই প্রথম নিয়মিত ও পরিকল্পিতভাবে রোগ প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে এই টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। কর্মসূচিটি ধারাবাহিকভাবে পাঁচ বছর চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় জোর
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, রোগ প্রতিরোধকে গুরুত্ব দিয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে তৃণমূল পর্যায়ে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি কর্মসূচি সফল করতে নির্ধারিত বয়সী সবাইকে টিকাদান কেন্দ্রে গিয়ে টিকা নেওয়ার আহ্বান জানান।
কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক টিকাদান জোট গ্যাভি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ, আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশন এবং আইসিডিডিআরবি সহযোগিতা করছে।
পরিচ্ছন্নতা নিয়ে ডিএসসিসির সতর্কতা
অনুষ্ঠানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, জনসচেতনতা ছাড়া সরকারের কোনো উদ্যোগই কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। বিভিন্ন এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর পরও নির্মাণাধীন ভবনে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
এ ধরনের ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করার কথা জানান ডিএসসিসি প্রশাসক। একই সঙ্গে রাজধানীর বায়ু ও শব্দদূষণ কমানো এবং পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে নাগরিকদের সহযোগিতা চান তিনি।
স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত না হলে স্ট্রিট ফুড বিক্রির ক্ষেত্রেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান আবদুস সালাম। ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে নাগরিকদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা ও বেশি করে গাছ লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি আহমেদ জামশীদ মোহাম্মেদ, ইউনিসেফের ডেপুটি রিপ্রেজেন্টেটিভ পিটার জর্জ এল মাইস, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মহাসচিব মো. হাবিবুর রহমান খানসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
এনএইচ/