১৭ অগাস্ট, ২০২৬ ০৩:২৮ পিএম

নবাব সলিমুল্লাহর স্মরণে ডাকসুর ‘ইশারাত মনজিল’ স্মারক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন

নবাব সলিমুল্লাহর স্মরণে ডাকসুর ‘ইশারাত মনজিল’ স্মারক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন
মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে অতিথিরা। ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: নবাব সলিমুল্লাহ’র ১৫৪তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে স্মারক গ্রন্থ ‘ইশারাত মনজিল’র মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে। রোববার (১৬ আগস্ট) বিকেল ৩টায় সলিমুল্লাহ মুসলিম হল অডিটোরিয়ামে এ মোড়ক উন্মোচন হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) উদ্যোগে স্মারক গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জিএস এস. এম. ফরহাদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডাকসু ভিপি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এই অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া মানুষের সন্তানদের শিক্ষিত করে তোলা, যাতে তারা সমাজ, জাতি এবং বিশ্বব্যাপী নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। প্রতিষ্ঠার পর এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই বাংলাদেশের বিভিন্ন আজাদি আন্দোলনের সূত্রপাত হয়।

তিনি বলেন, ‘যারা এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি শিক্ষিত, নেতৃত্বদানে সক্ষম ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মুসলিম সমাজ গড়ে তোলা। কিন্তু পরবর্তীতে বারবার সেই উদ্দেশ্য থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভিন্ন পথে পরিচালিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। মুসলমানদের জন্য প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ে হিজাব পরার কারণে নারীদের ক্রিমিনালাইজ করা হয়েছে, ট্যাগ দেওয়া হয়েছে। কখনো কখনো শ্রেণিকক্ষেও শিক্ষকদের দ্বারাও বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বটতলায় কুরআন তেলাওয়াতের আয়োজন করার কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং তাদের বহিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল—এমন অভিযোগও রয়েছে। রমজান মাসে ‘প্রোডাক্টিভ রমাদান’ শীর্ষক একটি কর্মসূচিতে রোজাদার শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ, যুবলীগের কর্মী ও বহিরাগতদের হামলার ঘটনাও ঘটেছে। হামলার পর হামলাকারীদের উল্লাসও আমরা দেখেছি। ফ্যাসিবাদী সময়ে ইসলামের বিভিন্ন প্রতীক ও সংস্কৃতিকে নানা সময়ে ট্যাগিং, ক্রিমিনালাইজ এবং বিভিন্নভাবে অপরায়ণের চেষ্টা করা হয়েছে।’

জুলাই বিপ্লবের পর একটি নতুন গণতান্ত্রিক পরিবেশ পেয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই পরিবর্তনের পর আমাদের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো—এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে যেসব ব্যক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল, তাদের যথাযথ স্বীকৃতি এবং অবদানকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করা। সেই জায়গা থেকেই ডাকসুতে নির্বাচিত হওয়ার পর আমরা প্রথমে নবাব সলিমুল্লাহর কবর জিয়ারত করেছি। মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের কবর জিয়ারত করেছি এবং ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের শহীদদেরও স্মরণ করেছি।’

ঐতিহাসিক নায়কদের স্মরণ ও তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর চেষ্টা করেছি, নবাব সলিমুল্লাহসহ নবাবদের অবদানকে একটি স্মারকের মাধ্যমে আমরা তুলে ধরবো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫ বছরের ইতিহাসে যা কেউ করেনি, সেটা করে ইতিহাসের একটি দলিল হিসেবে রেখে যাবো এই লক্ষ্য ছিল। ডাকসুর সাহিত্য সম্পাদক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মুহাম্মদ রাত-দিন এক করে ইশারত মনজিল স্মারক মোড়ক উন্মোচন পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। এখানে আমাদের একটি চমৎকার টিম কাজ করেছে।’

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ডাকসু জিএস এস. এম. ফরহাদ বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও কখনো কখনো ভুলে যান, তারা কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করেন এবং এই বিশ্ববিদ্যালয় কী উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের এসব বিষয় মনে করিয়ে দেওয়া আমাদের দায়িত্ব নয়, তবুও ডাকসুর পক্ষ থেকে আমরা মনে করেছি, শুধু আলোচনা সভা, সেমিনার কিংবা বক্তৃতার মাধ্যমে নবাব সলিমুল্লাহকে স্মরণ করাই যথেষ্ট নয়। তাঁর অবদানকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করার মতো একটি কাজ করা প্রয়োজন।’

স্মারক গ্রন্থের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের মনে হয়েছে, বাংলা ভাষা যতদিন বেঁচে থাকবে, এই বইটিও ততদিন নবাব সলিমুল্লাহর অবদানের একটি উজ্জ্বল স্মারক হিসেবে টিকে থাকবে। ডাকসুর পক্ষ থেকে এমন একটি কাজ করতে পেরেছি, এটি আমাদের জন্য স্বস্তি ও আনন্দের বিষয়।’

তিনি বলেন, ‘একটি বছর খুবই অল্প সময়। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বঞ্চনা ও শূন্যতার সমাধান করতে হয়েছে। জিমনেসিয়াম নেই, সমাধান করতে হয়েছে; ক্যালেন্ডারে প্রয়োজনীয় ছুটির ব্যবস্থা নেই, সমাধান করতে হয়েছে; মাতৃত্বকালীন ছুটি নেই, ব্যবস্থা করতে হয়েছে; হলের রিডিং রুমের অবস্থা খারাপ, উন্নয়ন করতে হয়েছে; খাবারের মান নিয়ে সমস্যা—সেটিও সমাধানের চেষ্টা করতে হয়েছে। অর্থাৎ, দীর্ঘদিনের অনেকগুলো সমস্যার সমাধান এক বছরের মধ্যে করতে হয়েছে।’

ডাকসু জিএস বলেন, ‘আজকের এই উদ্যোগের সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, নবাব সলিমুল্লাহর অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করার মতো পর্যাপ্ত উপকরণ হয়তো আমাদের হাতে নেই, কিন্তু আমরা অন্তত এমন একটি বই রেখে যেতে পেরেছি, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাঁর অবদানকে লিখিতভাবে তুলে ধরবে। তারা বইটি পড়বে এবং জানতে পারবে, নবাব সলিমুল্লাহ কী করেছিলেন এবং তাঁর কী ধরনের প্রচেষ্টা ছিল।’

‘এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ইট, প্রতিটি বালুকণা, প্রতিটি মাটি, প্রতিটি হল ও ভবন নবাব সলিমুল্লাহর অবদানের স্মারক এবং তাঁর সংগ্রামের প্রতীক। আমরা সেই সংগ্রামের প্রতীকগুলো ধারণ করতে চাই। তাঁর এবং তাঁর মতো যারা এই বিশ্ববিদ্যালয় ও মানুষের জন্য লড়াই করেছেন, তাদের অসমাপ্ত লড়াই পরবর্তী প্রজন্মের নেতৃত্বের কাছে এগিয়ে দিতে চাই’–যোগ করেন তিনি।

এই বই প্রকাশই সফলতার চূড়ান্ত মানদণ্ড নয় উল্লেখ করে এস. এম. ফরহাদ বলেন, ‘সফলতা তখনই আসবে, যখন এই তরুণরা বুঝতে পারবে নবাব সলিমুল্লাহ তাঁর সময়ের সমাজের সমস্যাগুলো কীভাবে চিহ্নিত করেছিলেন, সেগুলোর কারণ কীভাবে বিশ্লেষণ করেছিলেন এবং কীভাবে সেগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। একই সঙ্গে এই সময়ে ইনসাফ নিশ্চিত করতে আর কী কী লড়াই প্রয়োজন, সেটিও তাদের খুঁজে বের করতে হবে।’

‘এই পথেই আমরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম লড়াই করে যাব, এটাই আমাদের অঙ্গীকার। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরও অনেক নবাব সলিমুল্লাহ তৈরি হবে। তাঁরা বারবার জন্ম নেবেন এবং এই জনপদের মানুষের মুক্তি ও কল্যাণের জন্য কাজ করে যাবেন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা ও প্রতিশ্রুতি।’

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, নবাব সলিমুল্লাহ শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে জড়িত একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব নন, তিনি এ অঞ্চলের শিক্ষা ও অনগ্রসর মুসলিম ও হিন্দু সমাজের অগ্রগতির অন্যতম পথিকৃৎ। তার অবদান ও চিন্তাধারাকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার দায়িত্ব আমাদের সবার। ‘ইশারাত মনজিল’ স্মারক গ্রন্থের মাধ্যমে নবাব সলিমুল্লাহর জীবন, কর্ম ও ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা আরও গভীরভাবে জানতে পারবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে তার অবদান অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ডাকসু ভবিষ্যতেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও শিক্ষার্থীদের মাঝে তা ছড়িয়ে দিতে এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে।

কার্যনির্বাহী সদস্য সাবিকুন্নাহার তামান্না বলেন, ‘নবাব সলিমুল্লাহর জীবন ও কর্ম আমাদের ইতিহাসের এমন এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা নতুন প্রজন্মের কাছে আরও বেশি করে তুলে ধরা প্রয়োজন। তাঁর দূরদর্শী চিন্তা ও শিক্ষাবিস্তারে ভূমিকা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। ‘ইশারাত মনজিল’ স্মারক গ্রন্থটি নবাব সলিমুল্লাহর অবদানকে জানার পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক পথচলার সঙ্গেও শিক্ষার্থীদের নতুনভাবে পরিচিত করবে। ডাকসুর এই উদ্যোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য ও ইতিহাসচর্চাকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রিয়াদুল ইসলাম জুবার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য ও ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য সাবিকুন্নাহার তামান্না, ডাকসুর স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মিনহাজ, ক্রীড়া সম্পাদক আরমান হোসেন, সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল সংসদের ভিপি জায়েদুর হক, এফ আর হল ভিপি রফিকুল ইসলাম সহ ডাকসু, হল সংসদ ও হলটির বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত