১১ অগাস্ট, ২০২৬ ০৩:৩৬ পিএম
ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে এমপিওভুক্ত শিক্ষক নিয়োগ

রেজ্যুলেশনের অংশবিশেষে বিভ্রান্তি হয়ে আন্দোলন: শিক্ষামন্ত্রী

রেজ্যুলেশনের অংশবিশেষে বিভ্রান্তি হয়ে আন্দোলন: শিক্ষামন্ত্রী
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে এমপিওভুক্ত শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের একটি বৈঠকের রেজল্যুলেশনের অংশবিশেষ বাদ দিয়ে প্রকাশিত চিঠির অংশ দেখে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্দোলন শুরু করা হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বার্ক) মিলনায়তনে 'সমৃদ্ধ অর্থনীতির বিনির্মাণে শিক্ষা: দক্ষতা, ভাষাগত সক্ষমতা ও বৈশ্বিক গতিশীলতা' শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন তিনি।

মন্ত্রী বলেন, ‘গতকাল রাতে আবার শুনলাম, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল হচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল হচ্ছে। কিসের মিছিল? বিষয়টি হলো—এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ম্যানেজমেন্ট কমিটিতে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কে এই সিদ্ধান্ত দিয়েছে?’

‘একটি মিটিংয়ের রেজ্যুলেশনের আলোচনার অংশ বাদ দিয়ে মন্ত্রণালয় থেকে কেউ একজন শুধু আলোচনার একটি অংশ কেটে দিয়েছে। অথচ তার নিচে বলা হয়েছে, মাননীয় মন্ত্রী বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন এবং এরপর প্রজ্ঞাপন জারি হবে। অর্থাৎ, বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিল না; চিঠিতেই সেই বিষয়টি উল্লেখ ছিল। কিন্তু ওই অংশটুকু বাদ দিয়ে চিঠিটি পত্রিকায় প্রকাশ করা হলো এবং সেটিকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা মিছিল শুরু করল।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি বিষয়টি বুঝতে পারছি না। কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হলে প্রথমে আলোচনা হবে, আলোচনার পর রেজ্যুলেশন হবে এবং সেই রেজ্যুলেশন আমার কাছে আসবে। সেই রেজ্যুলেশনের সিদ্ধান্ত কি মন্ত্রীর সিদ্ধান্ত? এটি কি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত? এটি কি প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত? নাকি এটি দলীয় সিদ্ধান্ত? বিষয়টি একবারও বিবেচনা করা হলো না।’

‘চিল কান নিয়ে গেছে—এ কথা শুনে চিলের পেছনে দৌড়ানো হচ্ছে; অথচ একবারও নিজের কানে হাত দিয়ে দেখা হচ্ছে না যে কানটি আসলে আছে কি না। এটি একটি অদ্ভুত পরিবর্তন। আমি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলাম। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ ধরনের উস্কানিতে এভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়ত না। আজ পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে; শিক্ষার্থীরা উস্কানিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে’—মন্তব্য শিক্ষামন্ত্রীর। 

এনটিআরসিএ প্রতিষ্ঠায় নিজের সম্পৃক্ততার দাবি করে ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘২০০৪ সালে শিক্ষকদের মর্যাদা ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করার জন্য আমি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে আলোচনা করে নিজ উদ্যোগে এনটিআরসিএ প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। এই ধারণাটি আমি যুক্তরাষ্ট্র থেকে পেয়েছিলাম।’

তিনি বলেন, ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একজন শিক্ষক হিসেবে সার্টিফিকেট পাওয়া যায় এবং সেই সার্টিফিকেটের মেয়াদ তিন বছর। এর উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষকদের যোগ্যতা ও শিক্ষার মান নিশ্চিত করা। কারণ কেউ দীর্ঘদিন কোনো বিষয়ে পড়াশোনা বা চর্চার বাইরে থাকলে সেই বিষয়ের জ্ঞান আগের মতো থাকবে না। যেমন, আমি যদি রসায়নের ছাত্র হয়ে পরবর্তীতে দীর্ঘদিন সেই বিষয়ে চর্চা না করি, তাহলে রসায়নের সব তত্ত্ব কি আমার মনে থাকবে? একইভাবে পদার্থবিজ্ঞান ও গণিত পড়লেও দীর্ঘদিন চর্চার বাইরে থাকলে সেগুলো যথাযথভাবে পড়ানো সম্ভব নয়।’

এই বিষয়টি বিবেচনা করেই আমরা এনটিআরসিএ প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল অযোগ্য বা অনুপযুক্ত ব্যক্তিদের শিক্ষকতায় প্রবেশ ঠেকানো, শিক্ষার মান নিশ্চিত করা এবং যোগ্য শিক্ষক তৈরি করা। 

পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকার এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ শুরু করে জানিয়ে তিনি বলেন, তারা ১২তম নিবন্ধন থেকে নিয়োগ দিতে পারছে না। অনেকেরই বয়স পার হয়ে গেছে। তারা চাকরির দাবিতে আন্দোলন করছেন; এমনকি রাস্তায় গাড়ি চালানোর সময়ও অনেকে গাড়ির সামনে এসে নিজেদের জীবন বিপন্ন করছেন।

তিনি বলেন, ১৮তম নিবন্ধনে প্রায় ১০,০০০ শিক্ষককে এনটিআরসিএ লাইসেন্স ও সার্টিফিকেট দিয়েছে, কিন্তু তাদের চাকরি দেওয়া হয়নি। তাদেরও বয়স পার হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে প্রায় ৭৭,০০০ শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে।

‘এর পাশাপাশি আগে যে নিয়োগগুলো দেওয়া হয়েছিল, সেখানেও নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে। যেমন—নোয়াখালীর একজন শিক্ষককে কুষ্টিয়ায়, কুষ্টিয়ার একজনকে রংপুরে, রংপুরের একজনকে খাগড়াছড়িতে এবং খাগড়াছড়ির একজনকে লালমনিরহাটে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে’—বলেন তিনি।

তিনি বলেন, এই বদলি বা ট্রান্সফারের কাজটি অত্যন্ত জটিল। টেলিটকের কাছ থেকে এ জন্য একটি প্রয়োজনীয় প্রোগ্রাম তৈরি করতেও সময় লাগছে। তারা প্রতি সপ্তাহে ট্রান্সফার সংক্রান্ত প্রোগ্রাম দিচ্ছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় কাজ করতে সময় লাগে; এটি বেসরকারি খাতের মতো নয় যে আজ সিদ্ধান্ত নিলে কালই কাজ হয়ে যাবে।

তারপরও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই ট্রান্সফারের সমস্যার সমাধান করতে হবে এবং ৯,০০০ শিক্ষককে নিয়োগ দিতে হবে। এরপর ৭৭,০০০ শূন্য পদের মধ্য থেকে ৯,০০০ পদ বাদ গেলে অবশিষ্ট প্রার্থীদের রেকর্ড যাচাই করতে হবে এবং পরবর্তী সময়ে তাদের পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। এনটিআরসিএ’র পর্যাপ্ত জনবল নেই—এটিও একটি বড় সমস্যা।

এ ছাড়াও মন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই পিএসসির কাছে প্রতিদিন চিঠি ও পিএসসির চেয়ারম্যানের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছেন বলে জানান তিনি। বলেন, ‘আমি বারবার বলছি, আমার শিক্ষক প্রয়োজন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সম্ভবত ২০০ জন শিক্ষকও দেওয়া সম্ভব হয়নি। এটি একটি বড় সমস্যা। 

তিনি বলেন, এর মধ্যেই হঠাৎ বলা হচ্ছে, ৭৭,০০০ শিক্ষকের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে। অথচ আগে তাদের সার্টিফাইড করতে হবে। এরপর কোন ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের নিয়োগ দেওয়া সবচেয়ে কার্যকর হবে, সেটি নির্ধারণ করতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী বা প্রার্থী যখন শিক্ষকের সার্টিফিকেট পাবেন, তখন তাকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। এখানে কোনো ধরনের দুর্নীতি চলবে না, প্রতিষ্ঠান যে ধরনেরই হোক না কেন।

তিনি বলেন, ‘যদি ৭৭,০০০ শূন্য পদ থেকে ৯,০০০ পদ বাদ দেওয়া হয়, তাহলে অবশিষ্ট থাকে ৬৮,০০০ পদ। অর্থাৎ, আমি ৬৮,০০০ নির্দিষ্ট পদের বিপরীতে সার্টিফিকেট দেওয়ার ব্যবস্থা করছি।’

তবে পাঁচ মাস বয়সী একটি সরকারের বিরুদ্ধে ঘনঘন আন্দোলন করা সমীচীন নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের বলব, আমরা তোমাদের দায়িত্ব নিয়েছি এবং তোমাদের জন্যই কাজ করছি। তাই ভেবেচিন্তে আন্দোলন করো। যদি মনে করো আন্দোলন করা প্রয়োজন, তাহলে একবার আমার সঙ্গে আলোচনা বা বিতর্ক করে নিতে পারো। তোমাদের ফোরামে আমাকে আমন্ত্রণ জানাও, আমি তোমাদের প্রশ্নের উত্তর দেব। বিনা কারণে হৈচৈ করে অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা উচিত নয়। এভাবে একটি রাষ্ট্রকে কখনো এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।’

তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত রাজনীতি শুরু হয়েছে। একটি সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই মিথ্যা অজুহাত তুলে যারা রাজনীতি করে, তারা মূলত দেশের উন্নতি চায় না; তারা দেশের অধঃপতন চায়। অতএব, তাদের নেতৃত্ব জনগণ কখনো মেনে নেবে না।’

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত