ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট: স্বৈরাচার পতনের দ্বিতীয়বার্ষিকী
জাহিদুল হক: আজ ৫ আগস্ট ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ঐতিহাসিক দিন। ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের এই দিনে অবসান ঘটেছিল দীর্ঘ সতেরো বছরের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার তোপের মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
আজকের এই দিনটি ৫ আগস্ট হলেও বিপ্লবীদের কাছে এটি ‘৩৬ জুলাই’। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের এই ঐতিহাসিক অর্জনের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে আজ সারাদেশে জাতীয় দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালিত হয়েছে দিনটি।
দিনটি উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় ছুটি, শাহবাগে জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন, শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং বিশেষ প্রার্থনাসহ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালন করা হয়।
দিনজুড়ে যেসব আয়োজন
‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে দেশজুড়ে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উদ্যোগে ব্যাপক আয়োজন গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—
শ্রদ্ধাঞ্জলি ও প্রার্থনা
ভোর ৬টা এক মিনিটে শাহবাগের জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে সাধারণ নাগরিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ঢল নামে। জোহর নামাজের পর দেশের সকল মসজিদে বিশেষ দোয়া এবং অন্যান্য উপাসনালয়ে প্রার্থনার আয়োজন করা হয়।
জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন
গণভবন প্রাঙ্গণে নির্মিত ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পাশাপাশি দেশের সব সরকারি-বেসরকারি জাদুঘর সবার জন্য বিনা টিকিটে উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল।
রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান
দুপুরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিশেষ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবারের সদস্য এবং আহত জুলাই যোদ্ধাদের বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়।
‘বর্ষা বিপ্লবের গান’: কনসার্ট
রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বিকেল সাড়ে ৩টায় জাতীয় নাগরিক কমিটি ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর আয়োজনে বিশাল উন্মুক্ত কনসার্ট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দেশের শীর্ষ ব্যান্ড দলগুলো বিপ্লবী চেতনা নির্ভর সঙ্গীত পরিবেশন করে।
জাতীয় দিবসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক বিজয়।
তিনি বলেন, এ বিজয় ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের ফসল। এত ত্যাগের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্য রক্ষা করতে হবে এবং বাংলাদেশে আর কখনো স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ, চরমপন্থা কিংবা উগ্রবাদের উত্থান ঘটতে দেওয়া যাবে না।
তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আত্মত্যাগকারী শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি শহীদ পরিবারের কাছে বাংলাদেশ ঋণী। এখন সেই ঋণ পরিশোধের সময়। তার ভাষায়, ১৯৭১ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধ, আর ২০২৪ ছিল স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম। তাই ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদেরও জাতি কখনো ভুলবে না।
আন্দেলনের শুরুটা যেভাবে
২০২৪ সালের ৫ জুন ‘২০১৮ সালের সরকারি পরিপত্র’ বাতিল করে কোটা পুনর্বহালের হাইকোর্টের রায়ের পর থেকে ক্ষোভ জমতে থাকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে। ৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের জন্য মাঠে নেমে রাজপথ অবরোধের ডাক দেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গঠন ও ‘বাংলা ব্লকেড’ (১-১৪ জুলাই)
১ জুলাই: ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ প্লাটফর্ম আত্মপ্রকাশ করে। ঢাবিতে তিন দিনের ছাত্র ধর্মঘট ও ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দেওয়া হয়।
২-৬ জুলাই: দেশব্যাপী ছাত্র ধর্মঘট পালন এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ শুরু করেন।
৭ জুলাই: সারাদেশে প্রথমবারের মতো সর্বাত্মক 'বাংলা ব্লকেড' কর্মসূচি শুরু হয়। ঢাকার শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব, নীলক্ষেত ও মহাখালী অবরুদ্ধ করা হয়।
৮-১০ জুলাই: ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি অব্যাহত থাকে। রেললাইন ও মহাসড়ক অবরোধ করায় ঢাকার সাথে সারাদেশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
১১ জুলাই: ব্লকেড চলাকালীন ঢাকার শাহবাগ এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও চবিতে পুলিশের সাথে শিক্ষার্থীদের প্রথম বড় সংঘর্ষ হয়।
১২-১৪ জুলাই: রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি দেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীরা পদযাত্রা করেন এবং গণসংযোগ কর্মসূচি পালন করেন।
হামলা ও আবু সাঈদের শাহাদাত (১৫-১৭ জুলাই)
১৫ জুলাই: তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর এক মন্তব্যের প্রতিবাদে রাতে ঢাবিতে বিশাল বিক্ষোভ হয়। দুপুরে ঢাবি ও জাবি ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ ও যুবলীগ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ইতিহাসের বর্বরতম হামলা চালায়। এতে ৩০০ এর অধিক শিক্ষার্থী আহত হন।
১৬ জুলাই: হামলার প্রতিবাদে দেশব্যাপী বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের গুলির সামনে বুক পেতে দিয়ে শহীদ হন আবু সাঈদ। একই দিন ঢাকা ও চট্টগ্রামে আরও পাঁচ জন নিহত হন। তড়িঘড়ি করে রাতেই সকল বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা দেয় সরকার।
১৭ জুলাই: হল ছাড়ার সরকারি নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে গায়েবানা জানাজা ও কফিন মিছিল করেন। রাতে জাবিসহ বিভিন্ন ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগকে বিতাড়িত করা হয়।
‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ও রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন (১৮-২ আগস্ট)
১৮ জুলাই: সারাদেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ (সর্বাত্মক অবরোধ) পালিত হয়। উত্তরা, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ীসহ সারাদেশে ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশ ও বিজিবি নির্বিচারে গুলি চালায়। বহু আন্দোলনকারী শহীদ হন। মধ্যরাতে সারাদেশে ইন্টারনেট সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট (বন্ধ) করে দেওয়া হয়।
১৯ জুলাই: রাজপথে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ে। ঢাকাসহ দেশজুড়ে সেনা মোতায়েন ও কারফিউ জারি করা হয়।
২০-২৬ জুলাই: কারফিউর মধ্যে ক্র্যাকডাউন চলে। ডিবি পুলিশ হাসপাতাল ও বাসা থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের তুলে নিয়ে যায় এবং জোরপূর্বক আন্দোলন প্রত্যাহারের বিবৃতি দেওয়ানোর চেষ্টা করে।
২৭-৩১ জুলাই: শিক্ষার্থীরা ডিবি হেফাজত থেকে সমন্বয়কদের মুক্তি এবং দেশব্যাপী হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে মুখে কালো কাপড় বেঁধে ও চোখে লাল কাপড় বেঁধে অনলাইন-অফলাইন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন।
১-২ আগস্ট: সাধারণ নাগরিক, শিক্ষক, আইনজীবী ও অভিভাবকরা ছাত্র-নাগরিক হত্যার প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসেন। ২ আগস্ট দেশের বিভিন্ন স্থানে জুমার নামাজের পর ব্যাপক বিক্ষোভ মিছিল হয়।
সরকার পতনের ১ দফা দাবি
৩ আগস্ট: কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সরকারের পদত্যাগের ‘এক দফা’ দাবি ঘোষণা করে।
৪ আগস্ট: এক দফা বাস্তবায়নে দেশব্যাপী 'সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন' শুরু হয়। রাজধানীসহ প্রতিটি জেলায় ছাত্র-জনতার সাথে আওয়ামী লীগ ও পুলিশের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। একদিনেই শতাধিক মানুষ শহীদ হন। পরিস্থিতি সামলাতে সরকার অনির্দিষ্টকালের জন্য সান্ধ্যআইন (কারফিউ) জারি করে। রাতেই লং মার্চ টু ঢাকা ঘোষণা করে ছাত্র জনতা।
‘লং মার্চ টু ঢাকা’
৫ আগস্ট: পূর্বঘোষিত 'লং মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচির অংশ হিসেবে কারফিউ অমান্য করে ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে লাখ লাখ মানুষ জড়ো হতে থাকেন। দুপুরের দিকে ঢাকার শাহবাগ ও গণভবনের দিকে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক মহাসমুদ্র ধেয়ে আসে। ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব এই গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। অবসান ঘটে ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের।
সেনাপ্রধানের ভাষণ
সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বিকেলে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের ঘোষণা দেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন
৮ আগস্ট: ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের চূড়ান্ত প্রস্তাব দেন, যা বিভিন্ন পক্ষ মেনে নেয়। পরে ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বঙ্গভবনে শপথ নিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
আহত-নিহতের পরিসংখ্যান
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরকারি গেজেট অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ৮৪৪ জন এবং আহত ১৮ হাজারের বেশি। তবে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন ও মানবাধিকার কমিশনের প্রাথমিক প্রতিবেদনে নিহতের সংখ্যা প্রায় ১,৪০০ জনের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের হামলায় ২৫,০০০-এর বেশি মানুষ আহত হন। তাঁদের মধ্যে ৪০০ জনের বেশি মানুষ চিরতরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন এবং শত শত তরুণ পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।
নতুন বাংলাদেশের অঙ্গীকার
২০২৪ সালের সেই রক্তঝরা দিনগুলো কেবল এক স্বৈরাচারের পতন ঘটায়নি, বরং সাধারণ মানুষকে নিঃসঙ্কোচে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং একটি নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। আজ ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস’-এ আমাদের লক্ষ্য কেবল অতীতকে মনে রাখা নয়; বরং শহীদদের মহান আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও স্বনির্ভর দেশ গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
জেএইচ/
-
০৫ অগাস্ট, ২০২৫
-
০৪ অগাস্ট, ২০২৫
-
২৩ ডিসেম্বর, ২০২৪
-
১৪ ডিসেম্বর, ২০২৪
জুলাই গণঅভ্যুত্থান
আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসার খোঁজ নিলেন অধ্যাপক সায়েদুর রহমান