জুলাই অভ্যুত্থানে বদলি, এবার ওএসডি: ‘ছাত্রবান্ধব’ শিক্ষক-চিকিৎসকের সংযুক্তি কুর্মিটোলায়
মেডিভয়েস রিপোর্ট: জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্রদের পক্ষ নেওয়ায় ঢাকার বাইরে ভিন্ন বিষয়ে বদলি করা ঢাকা মেডিকেল কলেজের স্পাইন সার্জন ডা. মো. শহীদুল ইসলাম আকনকে এবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁকে সংযুক্ত করা হয়েছে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে, যেখানে এই শিক্ষক-চিকিৎসকের বিশেষায়িত জ্ঞান ও দক্ষতা প্রয়োগের সুবিধা নেই।
আজ সোমবার (১৩ এপ্রিল) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জারি করা এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ইনসিটু অধ্যাপক হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজে কর্মরত স্পাইন সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপককে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বিশেষ ওএসডি এবং কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে সংযুক্ত করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের পার-২ শাখা থেকে যুগ্মসচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই আদেশের আরও বলা হয়েছে, ওই কর্মকর্তা আগামী ৩ কর্মদিবসের মধ্যে পদায়নকৃত কর্মস্থলে যোগদান করবেন। অন্যথায় পরবর্তী কর্ম দিবসে বর্তমান কর্মস্থল থেকে তাৎক্ষণিক অব্যাহতি মর্মে গণ্য হবেন।
শিক্ষক-চিকিৎসক-শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ
ঢাকা মেডিকেল কলেজের ডা. ফজলে রাব্বি হল ছাত্রাবাসের সহকারী প্রভোস্ট ডা. মো. শহীদুল ইসলাম আকনের বদলির আদেশে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিক্ষক, চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক মেডিভয়েসকে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে স্পাইন সার্জারির সহযোগী অধ্যাপককে বদলি করা হয়েছিল বায়োক্যামিস্ট্রি বিভাগে একটি নন-ক্লিনিক্যাল সাবজেক্টে। বর্তমানে তাঁকে এমন একটি হাসপাতালে ওএসডি করে পাঠানো হয়েছে, যেখানে তার স্পেশালিটি পড়ানোর মতো শিক্ষার্থী নেই, আবার সেখানে সার্জারি করারও তেমন সুযোগ নেই। বদলি যদি একান্ত করতেই হয়, তাহলে তাঁর স্পেশালিটির যোগ্যতা অনুযায়ী বদলি করা যেত নিটোরে বা এর সমপর্যায়ের কোনো ইনস্টিটিউটে, যেখানে তিনি নিয়মিত অস্ত্রোপচার করতে পারবেন।
একজন শিক্ষার্থী বলেন, ঢামেকের শিক্ষার্থীরা যেকোনো সমস্যায় পড়লে বিদ্যুৎ গতিতে একজন মানুষ সাড়া দিতেন। আফসোস! আমরা গুণীমানুষের কদর করতে পারলাম না।
ছাত্রাবাসের সমস্যায় ত্বরিত সহযোগিতা বন্ধের শঙ্কা
তাঁর বদলির ফলে ছাত্রাবাসের যেকোনো সমস্যায় ত্বরিত সহযোগিতাও বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন শিক্ষার্থীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডা. ফজলে রাব্বি হলের এক শিক্ষার্থী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘স্যার অনেক ছাত্রবান্ধব ছিলেন। আমাদের যে কোনো সমস্যায় খুব দ্রুত সাড়া দিতেন। এ রকম একটি মানুষকে এভাবে অপমানজনক বদলি করা হলে কেউ শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে সাহস পাবে না।’
তারা বলছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় স্পাইন সার্জারির সহযোগী এই অধ্যাপককে তড়িঘরি করে ঢাকার বাইরের একটি প্রতিষ্ঠানে বায়োকেমিস্ট্রিতে বদলি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ফলে সরকার সেই নোটিশ বাতিল করে। আজকে বর্তমান সরকার আবারও সেই স্পাইন সার্জারির অধ্যাপক ডা. শহীদুল ইসলাম আকন স্যারকে ওএসডি করেছে এবং এমন একটি হাসপাতালে সংযুক্ত করে দিয়েছে, যেখানে এই শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষকের পড়ানোর মতো ছাত্র-ছাত্রী নেই এবং তাঁর বিভাগের সার্জারি করার মতো সুবিধাও নেই।
ঢামেকের একজন ইন্টার্ন চিকিৎসক তাঁর ওয়ালে লেখেন, ‘জুলাইয়ের সেই কঠিন সময়গুলোতে আহত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কারণে শ্রদ্ধেয় আকন স্যারকে পতিত সরকার সুনামগঞ্জে ট্রান্সফার করে দেয়। কত শত মানুষের জীবন বাঁচাতে স্যার ভূমিকা রেখেছেন তা আমরা জানি না। তবে আশা রাখি, আখিরাতে স্যার পূর্ণ প্রতিদান পাবেন, ইনশাআল্লাহ। হলের যেকোনো শিক্ষার্থীর যেকোনো প্রয়োজনে, যেকোনো সময় স্যার সবসময় অগ্রগামী ছিলেন। স্যার ছাত্রদের ওউন করতেন, পড়াতে ভালোবাসতেন। স্টুডেন্টদের মোটিভেট করতেন দেশে থাকার জন্য। আজ শুনলাম, স্যারকে এমন এক জায়গায় ওএসডি করা হয়েছে, যেখানে ছাত্রই নাই।’
‘যেকোনো মূল্যে স্যারকে ডিএমসিতে চাই’
ঢামেক হাসপাতালের আরেক ইন্টার্ন চিকিৎসক বলেন, ‘জুলাইয়ে অবদানের জন্য যাকে বদলি করে হয়রানি করা হলো, সেই যোদ্ধাকে এখন ডিএমসি থেকে সরানো কি এতোই গুরুত্বপূর্ণ ছিল? কাঁধে হাত রেখে ভাই বলে আশ্বাস দেওয়া মানুষটা আমাদের ছেড়ে চলে যাক এটা কখনই চাই না। যেকোনো মূল্যে স্যারকে ডিএমসিতে চাই।’
হলে অবস্থানরত এক শিক্ষার্থী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘হলের চারতলার ছাদ যখন ভেঙে পড়ছিল প্রতিদিন, তখন হলে এসে প্রায়ই খোঁজ নিতেন তিনি। সম্ভবত আগস্টের পর কোনো স্যারকে দেখছি কোনো সমস্যায় রুমে এসে খোঁজ নিতে। ইভেন রুম ডিস্ট্রিবিউশনের জন্যও সকাল থেকে দুপুর হল অফিসে লিস্ট বানিয়েছেন আমাদের জন্য। খাওয়ার সমস্যা, মান নিয়ে ক্যান্টিনের কাজ থেকে শুরু করে হল ফিস্টসহ সবকিছুর জন্যই রেসপন্স করেছেন। ওএসডি হয়ে তাঁর চলে যাওয়ার পর হয়তো আর গ্রুপটা এভাবে চলবে না, আমরা মনে করবো ক্ষণকালের জন্য একজন আমাদের স্টুডেন্টদের জন্য ছিলেন।’
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আহতদের চিকিৎসা দেওয়ায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের স্পাইন সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শহীদুল ইসলাম আকনকে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজে বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগে বদলি করা হয়। ওই বছরের ২৮ জুলাই জারি করা আদেশটি পরে বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার। এর প্রায় দুই বছর পর আবারও বদলি আদেশ পেলেন সেই চিকিৎসক।
এমইউ/