এনডিএফের কর্মশালায় বিশেষজ্ঞদের মত
দুর্নীতির লাগাম না টানলে বড় বরাদ্দেও সুফল মিলবে না
মেডিভয়েস রিপোর্ট: ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হলেও কার্যকর বাস্তবায়ন, সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে বলে মনে করেন স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ, চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিকরা। তারা বলেছেন, মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশ এখনো জনগণকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা বহু পরিবারকে আর্থিক ঝুঁকিতে ফেলছে। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালগুলোতে দুর্নীতি, দালালচক্র, প্রশাসনিক অদক্ষতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দীর্ঘদিনের সমস্যা। এসব সংকট কাটিয়ে উঠতে না পারলে স্বাস্থ্য খাতে বাড়তি বরাদ্দেরও প্রত্যাশিত ফল মিলবে না।
আজ বুধবার (১৭ জুন) সকালে রাজধানীর বাংলা মোটরে রূপায়ণ ট্রেড সেন্টারে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ) কার্যালয়ে স্বাস্থ্য বাজেট ২০২৬-২৭ নিয়ে আয়োজিত স্বাস্থ্য সাংবাদিক ওয়ার্কশপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
‘জনগণের অর্থ, জনগণের স্বাস্থ্য’—শীর্ষক এই কর্মশালায় সভাপতির বক্তব্যে এনডিএফের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. এ কে এম ওয়ালীউল্লাহ বলেন, দেশের সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি, দালালচক্র এবং কিছু অসাধু গোষ্ঠীর প্রভাব এখনো বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালের নিম্নস্তরের কর্মচারীদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক প্রশাসনিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে সাধারণ রোগীরা হয়রানির শিকার হন এবং কাঙিক্ষত সেবা থেকে বঞ্চিত হন।
যশোরের চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্যসেবার একটি সফল উদাহরণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্থানীয় জনগণ, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সেখানে একটি কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। একই ধরনের উদ্যোগ জাতীয় পর্যায়েও গ্রহণ করা যেতে পারে।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি কেবল স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি দারিদ্র্য হ্রাস, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বর্তমানে দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশ জনগণকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে একটি অসুস্থতা বহু পরিবারকে আর্থিক সংকটে ফেলে দেয়।
এক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) আদর্শিক মানদণ্ড উল্লেখ করেন রুমানা হক বলেন, সংস্থাটির নির্দেশনা হলো চিকিৎসায় রোগীরা ২০ ভাগ খরচ বহন করবেন, কিন্তু বাংলাদেশে এই ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭৯ ভাগে। অথচ থাইল্যান্ডে ১০ ভাগ ও মালদ্বীপের মতো দেশে ১৮ ভাগ।
তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা জিডিপির ১.০১ শতাংশ এবং জাতীয় বাজেটের ৭.৪ শতাংশ। গত এক দশকের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ বরাদ্দ। বাজেটে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি, টিকাদান কর্মসূচি এবং অসংক্রামক রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ড. রুমানা হক বলেন, এবারের বাজেটের অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো চিকিৎসা ব্যয় কমাতে বিভিন্ন কর ছাড়ের উদ্যোগ। হার্টের রিংয়ের ওপর কর কমানো হয়েছে, ফলে রোগীদের ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমতে পারে। একইভাবে চোখের অপারেশনে ব্যবহৃত লেন্স, কিডনি ডায়ালাইসিসের যন্ত্রপাতি এবং ক্যান্সারের ওষুধ তৈরির কাঁচামালের ওপর কর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাজেটে পাঁচ হাজার চিকিৎসক এবং এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা, ই-হেলথ কার্ড চালু, কেয়ার গিভার প্রশিক্ষণ এবং নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষার সমপ্রসারণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে। তবে বাজেটের বড় একটি অংশ থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে, যা উদ্বেগের কারণ। তার মতে, উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ২৩ হাজার ৫২২ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে। অতীতে দেখা গেছে, ঘোষিত বাজেটের বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়নি কিংবা সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ কমে গেছে। ফলে এবারের বরাদ্দও কতটা বাস্তবায়িত হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
কর্মশালায় অনলাইনে যুক্ত হয়ে ঢাবি স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বড় বরাদ্দ দেওয়া হলেও দুর্নীতি, স্থানীয় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে কাঙিক্ষত ফল পাওয়া যাবে না।
হাসপাতালের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, সক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে চিকিৎসকরা পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। ফলে একদিকে রোগীরা অসন্তুষ্ট হচ্ছেন, অন্যদিকে রোগীর স্বজনদের দ্বারা চিকিৎসকরা নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে এখনো পরিচ্ছন্নতা, ওষুধ সরবরাহ এবং রোগীবান্ধব সেবার ঘাটতি রয়েছে বলে মনে এই স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ। বলেন, হাসপাতাল ব্যবস্থাপকদের আর্থিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় এর ঘাটতি থাকায় তারা এক লাইনের টাকা অন্যখাতে খরচের সুযোগ পান না। এতে বরাদ্দের অনেক অর্থ বছর শেষে অব্যয়িত থেকে যায়। এ ছাড়া সেক্টর কর্মসূচিভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রমের আওতায় অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) না থাকায় বরাদ্দ বাস্তবায়ন করা দুরুহ হবে বলেও মনে করেন তিনি।
একইসঙ্গে ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে জবাবদিহিতা নিশ্চিতের ওপর গুরুত্বারোপ করেন সৈয়দ আবদুল হামিদ।
তিনি বলেন, বাজেটে রাখা বিশাল থোক বরাদ্দ কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হলে দ্রুত প্রকল্প গ্রহণ ও অনুমোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের মধ্যে পরিকল্পনা শুরু না হলে বিপুল পরিমাণ অর্থ অব্যবহৃত থেকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
তিনি মাতৃস্বাস্থ্য, কিডনি, ক্যান্সার ও হৃদরোগীদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা কর্মসূচি চালুরও প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জন্য বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে সরকারি সহায়তা প্রদানের সুপারিশ করেন।
বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ বলেন, স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হলো প্রশাসনিক অদক্ষতা। বর্তমানে অনেক চিকিৎসক স্বাস্থ্য প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করলেও তাদের বড় অংশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। ফলে নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হয়।
তিনি বলেন, ২০২১ সালে উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন হার ছিল মাত্র ৫৮ শতাংশ এবং ২০২২ সালে তা ৭৯ শতাংশে উন্নীত হলেও জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক কম। এই প্রবণতা বন্ধ করতে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
স্বাস্থ্য খাতকে দলীয় রাজনীতির বাইরে রাখার পরামর্শ দিয়ে প্রতীক ইজাজ আরও বলেন, স্থানীয় পর্যায়ের ছোট ছোট সমস্যাই জাতীয় পর্যায়ে বড় সংকটে রূপ নেয়। তাই সংসদ সদস্যসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিজ নিজ এলাকার হাসপাতালগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন।
ন্যাশনাল হেলথ এলায়েন্সের (এনএইচএ) আহ্বায়ক বিশিষ্ট শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সদরুল আলম বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী একটি দেশের স্বাস্থ্য বরাদ্দ মোট বাজেটের ১৫ শতাংশ এবং মোট দেশ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ ভাগ থাকা চাই। কিন্তু আমাদের দেশের এতদিন তা ছিল ১ ভাগেরও কম। প্রস্তাবিত বাজেটে এটা ১.০১ করা হয়েছে। এটা বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ।
বিভিন্ন হাসপাতালে যন্ত্র ব্যবহার করা সম্ভব হয় না জানিয়ে তিনি বলেন, যন্ত্রের ব্যবহার নিশ্চিত না হলে ক্রয়োদ্যোক্তাকে শাস্তির আওতায় আনা উচিত।
এনএইচএ আহ্বায়ক বলেন, ‘বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকরিতে ঢোকার পর চিকিৎসকদের আর কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। তত্ত্বাবধায় সরকারের সময় থেকে অনেক চেষ্টা করে প্রশিক্ষণ বাড়ানোর চেষ্টা করেছি। আমাদের একটি ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাডেমি ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট দরকার। যেখানে চিকিৎসকদের স্বাস্থ্য বরাদ্দ খরচ, ব্যবস্থাপনাসহ সামগ্রিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।’
অনুষ্ঠানে যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ বলেন, স্বাস্থ্য খাতে টেন্ডার ব্যবস্থার সংস্কার অত্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে টেন্ডার বারবার হাতবদল হওয়ায় প্রকল্পের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
তিনি বলেন, চৌগাছা স্বাস্থ্য মডেল দেখিয়েছে যে জনসম্পৃক্ততা থাকলে সীমিত সম্পদ দিয়েও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। ডব্লিউএইচও প্রশংসিত এই মডেলের মূল ভিত্তি হলো জনগণের অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় সমস্যার দ্রুত সমাধান।
ডা. ফরিদ বলেন, হাসপাতালগুলোকে নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে অধিক স্বায়ত্তশাসন দেওয়া, গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং রোগীসেবার ভিত্তিতে অর্থায়ন চালু করা গেলে স্বাস্থ্যসেবার মান আরও উন্নত হবে। তিনি মনে করেন, এসডিজি অর্জনের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।
এনডিএফ অফিস সম্পাদক ডা. একেএম জিয়াউল হকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন সংগঠনের জেনারেল সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন বকাউল।
এমইউ/