শিশুদের দিনে কতটুকু চিনি খাওয়া নিরাপদ, অতিরিক্ত মিষ্টিতে যেসব ঝুঁকি
মেডিভয়েস রিপোর্ট: মিষ্টি খাবারের প্রতি শিশুদের আকর্ষণ স্বাভাবিক। চকোলেট, ক্যান্ডি, আইসক্রিম থেকে শুরু করে কেক, বিস্কুট কিংবা মিষ্টি পানীয়, সুযোগ পেলেই এসব খাবার খেতে চায় অনেক শিশু। অনেক অভিভাবকও শিশুকে খুশি করতে বা টিফিনে সহজে দেওয়া যায় বলে এসব খাবার বেছে নেন। তবে নিয়মিত ও অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পুষ্টিবিদদের মতে, শিশুর খাবারে চিনি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন নেই। তবে কতটা চিনি কোথা থেকে আসছে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা জরুরি। বিশেষ করে কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত জুস ও বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবারের মাধ্যমে শিশুরা অনেক সময় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি চিনি খেয়ে ফেলে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পরামর্শ অনুযায়ী, খাবারে যোগ করা বা ‘ফ্রি সুগার’ থেকে পাওয়া ক্যালরি দৈনিক মোট ক্যালরির ১০ শতাংশের নিচে রাখা উচিত। স্বাস্থ্যগত আরও সুবিধার জন্য তা পাঁচ শতাংশের নিচে রাখার পরামর্শ রয়েছে। ফ্রি সুগারের মধ্যে খাবারে যোগ করা চিনি ছাড়াও মধু, সিরাপ ও ফলের রসের মতো উৎসের চিনি অন্তর্ভুক্ত।
ছোট শিশুদের জন্য বাড়তি চিনি নয়
দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের খাবারে বাড়তি চিনি না দেওয়াই সবচেয়ে ভালো বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এ বয়সে শিশুর শরীর ও মস্তিষ্কের দ্রুত বিকাশ ঘটে। তাই মিষ্টি খাবারের পরিবর্তে দুধ, ডিম, মাছ, মাংস, ডাল, শাকসবজি, ফলসহ পুষ্টিকর খাবারকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
দুই বছর বা তার বেশি বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন দিনে সর্বোচ্চ প্রায় ২৫ গ্রাম বা ছয় চা-চামচের মতো বাড়তি চিনি সীমিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে।
তবে এই পরিমাণের অর্থ দিনে ছয় চা-চামচ চিনি আলাদাভাবে খাওয়ানো নয়। বিস্কুট, চকোলেট, কেক, মিষ্টি দই, আইসক্রিম কিংবা অন্যান্য প্যাকেটজাত খাবারে থাকা যোগ করা চিনিও এই হিসাবের মধ্যে পড়ে।
ফলের চিনি আর বাড়তি চিনি এক নয়
শিশুর খাবারে চিনি নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি তৈরি হয় প্রাকৃতিক ও যোগ করা চিনির পার্থক্য নিয়ে। একটি গোটা ফলে থাকা প্রাকৃতিক চিনি সাধারণত আঁশ, ভিটামিন ও খনিজের সঙ্গে থাকে। কিন্তু ফলের রস বা চিনিযুক্ত পানীয়তে আঁশ কমে যেতে পারে এবং অল্প সময়েই বেশি পরিমাণ চিনি গ্রহণ করা সম্ভব হয়। তাই শিশুকে গোটা ফল খাওয়ানো সাধারণত ফলের রস বা মিষ্টি পানীয় দেওয়ার চেয়ে ভালো বিকল্প।
অতিরিক্ত চিনি কেন উদ্বেগের কারণ
শিশুর খাবারে নিয়মিত অতিরিক্ত চিনি থাকলে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়ার সুযোগ কমে যেতে পারে। কারণ মিষ্টি খাবার পেট ভরিয়ে দিলেও এতে অনেক সময় প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ ও আঁশের পরিমাণ কম থাকে।
অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের সঙ্গে কয়েকটি স্বাস্থ্যঝুঁকিও জড়িত
* দাঁতের ক্ষয় ও ক্যাভিটির ঝুঁকি বৃদ্ধি
* অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতার আশঙ্কা
* পুষ্টিকর খাবারের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়া
* রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা তৈরির ঝুঁকি
ভবিষ্যতে টাইপ দুই ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা
বিশেষ করে চিনিযুক্ত পানীয় দ্রুত বেশি পরিমাণে খাওয়া যায়। এতে খাবারের মাধ্যমে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের সম্ভাবনা বাড়ে, অথচ দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকার অনুভূতি তৈরি নাও হতে পারে। শিশু সরাসরি চিনি না খেলেও প্রতিদিনের খাবারের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাড়তি চিনি গ্রহণ করতে পারে।
যেসব খাবারে অজান্তেই বেশি চিনি যাচ্ছে
* কোমল পানীয়
* প্যাকেটজাত ফলের জুস
* চকোলেট ও ক্যান্ডি
* কেক, বিস্কুট ও পেস্ট্রি
* আইসক্রিম
* মিষ্টি বা ফ্লেভারযুক্ত দই
* মিষ্টি সিরিয়াল
* চকলেট বা মিষ্টি স্বাদের স্প্রেড
বিভিন্ন প্যাকেটজাত স্ন্যাকস ও প্রক্রিয়াজাত খাবার
অনেক প্যাকেটজাত খাবারে চিনি সরাসরি ‘সুগার’ নামে না-ও থাকতে পারে। কর্ন সিরাপ, গ্লুকোজ সিরাপ, ফ্রুক্টোজ, সুক্রোজ, মল্টোজ বা বিভিন্ন সিরাপের নামেও চিনি উল্লেখ থাকতে পারে। তাই খাবার কেনার সময় লেবেলের উপাদান তালিকা ও পুষ্টি তথ্য দেখে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
টিফিনে কী দেওয়া যেতে পারে
শিশুর স্কুল টিফিনে প্রতিদিন কেক, বিস্কুট বা চকোলেট দেওয়ার পরিবর্তে পুষ্টিকর ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবার রাখা যেতে পারে। মৌসুমি ফল, ডিম, ঘরে তৈরি স্যান্ডউইচ, বাদাম বা উপযুক্ত অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার ভালো বিকল্প হতে পারে।
তবে কোনো খাবারকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে দিলে শিশুর আগ্রহ আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই মিষ্টি খাবারকে নিয়মিত খাবারের পরিবর্তে মাঝে মধ্যে সীমিত পরিমাণে দেওয়ার অভ্যাস তৈরি করা যেতে পারে।
অভিভাবকদের অভ্যাসেও পরিবর্তন জরুরি
শিশুর খাদ্যাভ্যাস তৈরিতে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাবা-মা যদি নিয়মিত কোমল পানীয় বা অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার খান, তাহলে শিশুর কাছ থেকেও এসব খাবার এড়িয়ে চলার অভ্যাস আশা করা কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, ছোটবেলা থেকেই শিশুকে পানির প্রতি অভ্যস্ত করা, তাজা ফল খাওয়ানো এবং খাবারে বাড়তি চিনি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা। চা, দুধ বা ঘরে তৈরি খাবারেও প্রয়োজনের বেশি চিনি না দেওয়ার অভ্যাস করা উচিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শিশুর প্রতিদিনের মোট খাবারের দিকে নজর দেওয়া। শুধু আলাদা করে চিনি কমালেই হবে না, প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়ের মাধ্যমে কতটা বাড়তি চিনি শরীরে যাচ্ছে সেটিও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।
এনএইচ/