শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ নিরসনে খুমেকে সাইকোথেরাপি উইং
তারিকুল ইসলাম: মেডিকেল শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্যহীনতায় মানসিক চাপ দিন দিন বাড়ছে। স্বাস্থ্যসেবার আগামীর কারিগরদের এই দুরবস্থা শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কঠিন পড়াশোনা, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া, পারিবারিক দূরত্ব ও সম্পর্কজনিত নানা টানাপোড়েনে অনেক শিক্ষার্থী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। এমন বাস্তবতা বিবেচনায় খুলনা মেডিকেল কলেজে (খুমেক) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ‘স্টুডেন্ট ওয়েল-বিইং সেন্টার ফর মেডিকেল স্টুডেন্টস’।
শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা, চাপ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধানে কাজ করছে এই সেন্টার। এই সাইকোথেরাপি উইং চালুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৫০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী সেবা নিয়েছেন। সেবা পেয়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও একাডেমিক সামগ্রিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। কারও উন্নতির হার ৮০ শতাংশ, কারও ৭০ শতাংশ। তবে মোটের ওপর বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর মধ্যেই ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
এ বিষয়ে মেডিভয়েসের সাথে কথা বলেছেন খুমেক হাসপাতালের সাইকিয়াট্রি বিভাগের প্রধান ডা. এস. এম. সাইফুল ইসলাম। তিন বলেন, ‘আমরা ‘সাইকোথেরাপি উইং’ প্রায় দেড় বছর ধরে চালু করেছি। মেডিকেল শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা করেই এটি শুরু হয়েছে। প্রতি বছরই অনেক মেডিকেল শিক্ষার্থী মানসিক সমস্যায় ভোগে, কেউ কেউ আত্মহত্যার চেষ্টাও করে বা আত্মহত্যা করে। সারাদেশেই এ রকম ঘটনা ঘটে। খুলনাতেও এমন ঘটনা ঘটেছে; খুলনা মেডিকেলে প্রায় পাঁচ-ছয় বছর আগে, সম্ভবত ২০২১ সালের দিকে, এমন একটি ঘটনা ঘটে।
‘আমি ২০১৮ সালে সেখানে যোগদান করি। এরপর থেকে আমরা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে কাজ করছি, কারণ অনেকেই মানসিক চাপ নিতে পারে না। গত বছর আমরা একটি প্রোগ্রাম করেছি, এবারও খুব শিগগিরই করব, যেখানে শেখানো হবে কীভাবে তারা তাদের মানসিক চাপ কমাতে পারে’—যোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যাতে তাদের একাডেমিক চাপ, সামাজিক ও পারিবারিক চাপ—সবকিছু সামলে নিতে পারে, সেই লক্ষ্যেই ‘স্টুডেন্ট ওয়েল-বিইং সেন্টার ফর মেডিকেল স্টুডেন্টস’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আমি এই সেন্টারের সভাপতি। আমাদের মেডিকেল কলেজের ফেজ ওয়ান, ফেজ টু ও ফেজ থ্রি অর্থাৎ বেসিক ও ক্লিনিক্যাল সায়েন্সের শিক্ষকরা এতে যুক্ত আছেন। যদি কোনো শিক্ষার্থীর সমস্যা হয়, তারা আমাদের কাছে এসে শেয়ার করতে পারে।’
কলেজের অধ্যক্ষসহ সংশ্লিষ্টরা এতে যুক্ত আছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করি। এজন্য একটি রেজিস্ট্রার রাখা হয়, যেখানে তাদের আইডি নম্বর ও অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। আমরা ফলোআপও করি, তাদের মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে যোগাযোগ করে খোঁজ নেওয়া হয় যে তাদের সমস্যা সমাধান হয়েছে কিনা।’
শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে সুস্থ রাখাই লক্ষ্য
এখন নতুন সেমিস্টার শুরু হয়েছে। মূল সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে একাডেমিক চাপ, নতুন কারিকুলাম অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ, হোস্টেল পরিবেশ ও আবাসন সমস্যা। এ ছাড়া অনেক শিক্ষার্থী আগে পরিবারে থেকে পড়াশোনা করত। এখন হঠাৎ পরিবার থেকে দূরে এসে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া তাদের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা একবার ৭২টি প্রশ্নের একটি জরিপ করেছিলাম, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা জানিয়েছে এবং দেখা গেছে, অনেক সমস্যাই একে অপরের সাথে মিল রয়েছে। অনেক সময় দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করলেও তারা ঠিকভাবে আউটপুট দিতে পারে না। অর্থাৎ, পরীক্ষার সময় তাদের চিন্তার অসারতা দেখা দেয়, স্মৃতিশক্তি যেন কাজ করে না বা দুর্বল হয়ে যায়।’
এর পেছনে শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু প্রভাব থাকতে পারে মত দিয়ে ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, হয়তো পড়ানোর পদ্ধতি এমন হওয়া উচিত, যাতে তারা বিষয়গুলো দীর্ঘ সময় মনে রাখতে পারে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, পরীক্ষার সময় তারা পড়া ঠিকভাবে মনে করতে পারে না। অনেকে এটাকে একাডেমিক ওভারলোড বলে থাকে। আবার শিক্ষার্থীদের মেমোরাইজ করার ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও একটি বিষয় হতে পারে।
এ ছাড়াও হোস্টেল পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার সমস্যা একটি বড় ফ্যাক্টর। পরিবার থেকে দূরে এসে নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়ানো অনেকের জন্য কঠিন হয়ে যায়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সম্পর্ক বা রিলেশনশিপ। যেহেতু এটি তাদের ইউনিভার্সিটি লাইফের শুরু, তাই নতুন করে ভালো লাগা বা আবেগের সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। কিন্তু অনেক সময় তারা এই সম্পর্ক এবং একাডেমিক লাইফের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে না। ফলে পড়াশোনায় প্রভাব পড়ে। এই বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের গাইড করার চেষ্টা করি, যাতে তারা তাদের ব্যক্তিগত ও একাডেমিক জীবনকে সমন্বয় করে চলতে পারে।
সাইকো থেরাপি ইউংয়ের সভাপতি বলেন, আত্মহত্যার ঘটনা খুব সাম্প্রতিক সময়ে না পেলেও, এমন অনেক শিক্ষার্থী পাওয়া গেছে, যারা শেষ পর্যন্ত ঝরে পড়েছে।
একজন শিক্ষার্থীর পথ হারানোর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সে খুব ভালো শিক্ষার্থী ছিল। খুলনার একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের ফার্স্ট গার্ল ছিল। কিন্তু মেডিকেলে এসে একাডেমিক পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেনি। আমরা তাকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেনি। পরে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। মূলত মেডিকেলের একাডেমিক সিস্টেমের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারার কারণেই এমন হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা বিভিন্নভাবে এই সেবা গ্রহণ করে। অনেককে শিক্ষক বা হল প্রশাসনের মাধ্যমে আমাদের কাছে পাঠানো হয়। আবার অনেকে নিজেরাই আসে। তবে এখনো একটি সামাজিক সংকোচ বা স্টিগমা কাজ করে। অনেকে মনে করে মনোরোগ বিভাগের কাছে গেলে সহপাঠীদের বুলিংয়ের শিকার হতে হতে পারে। তারপরও আমরা বিভিন্ন পর্যায়ে সচেতনতা তৈরির কাজ করছি। প্রথম বর্ষ, তৃতীয় বর্ষ, হল কিংবা ক্লিনিক্যাল ওয়ার্ড প্লেসমেন্ট—সব জায়গায় আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলছি। ফলে ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে এবং এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি শিক্ষার্থী সহায়তা নিতে আসছে।
তিনি আরও বলেন, যেসব শিক্ষার্থীর ওষুধের প্রয়োজন হয়, তাদের ক্ষেত্রে আমাদের সুপারভিশনে চিকিৎসা দেওয়া হয়। বিভাগের অন্যান্য সাইকিয়াট্রিস্টরাও এতে যুক্ত আছেন। যদি দেখা যায় সমস্যা গুরুতর, তখন শিক্ষার্থীর অভিভাবককে ডাকা হয়। অনেক সময় দেখা যায়, শিক্ষার্থী হোস্টেলে মানিয়ে নিতে পারছে না। সম্প্রতি এমন একজন শিক্ষার্থীকে কিছুদিনের জন্য বাসায় পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। পরে তার মা এসে তাকে নিয়ে গেছেন। গুরুতর ক্ষেত্রে আমরা মেডিকেল বোর্ডও গঠন করি, যেখানে মেডিসিন, বেসিক সায়েন্সসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষকরা যুক্ত থাকেন। ওষুধের পাশাপাশি কাউন্সেলিং ও সাইকোথেরাপিও দেওয়া হয়।
গোপনীয়তার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা সব সময় শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করি। কোনো শিক্ষার্থী চাইলে সব তথ্য শেয়ার করবে, না চাইলে করবে না—এটি তার ব্যক্তিগত অধিকার। আমরা কখনো জোর করে তথ্য নিই না। শিক্ষার্থীদের আস্থা ও স্বাচ্ছন্দ্য বজায় রাখাই আমাদের লক্ষ্য।দীর্ঘদিন ধরে এই সেবা দেওয়ার ফলে ইতিবাচক ফলও দেখা যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, এখন শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই বিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে মানসিক সমস্যার জন্য সহায়তা নেওয়ার একটি নিরাপদ জায়গা আছে। তারা জানে, প্রয়োজনে এখানে এসে কথা বলা যায়। ২০২১ সালের দিকে যেসব উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছিল, এখন সেগুলো অনেকটাই কমে এসেছে।
তিনি আরও জানান, শুধু খুলনা মেডিকেল কলেজ নয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)-এর শিক্ষার্থীরাও এই সেবা নিচ্ছে। কুয়েটে আত্মহত্যার ঘটনা আগের তুলনায় কমেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। এখনো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সরাসরি এখানে এসে সহায়তা নিচ্ছে। অর্থাৎ, এই সেবা শুধু মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়; অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও চাইলে এই সহায়তা নিতে পারে।
মানসিক চাপ কাটিয়ে উঠতে শিক্ষার্থীদের প্রতি বার্তা
মানসিক চাপে থাকা মেডিকেল শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘জীবনে চাপমুক্ত মানুষ বলে কেউ নেই। মেডিকেল শিক্ষার্থীরা অনেক সময় মনে করে তাদের ওপর চাপ বেশি, কিন্তু এই যাত্রাপথে সহজে ভেঙে পড়লে চলবে না। আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হবে এবং ইতিবাচক মনোভাব রাখতে হবে। আমি পেরেছি, আবারও পারব।’
শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বাড়ানোই কাজ
তিনি বলেন, কোনো সমস্যা সাময়িকভাবে জীবনে আসতেই পারে। কিন্তু সমস্যা সমাধান হয়ে গেলে সেটিও কেটে যায়। তাই শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে শক্ত হওয়া এবং নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। অনেক শিক্ষার্থী এসে বলে, তারা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না। তখন আমরা বোঝার চেষ্টা করি, আসলে মনোযোগ অন্য কোথাও চলে যাচ্ছে কি না। কারণ মনোযোগের বিচ্যুতির পেছনে কোনো না কোনো কারণ থাকে। সেই কারণটি খুঁজে বের করে আবার পড়াশোনায় ফোকাস ফিরিয়ে আনাই আমাদের কাজ।
খুমেক হাসপাতালের সাইকিয়াট্রি বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. মো. মেহেদী হাসান বলেন, ‘অনেক শিক্ষার্থী আমাদের কাছে আসে, যাদের একাডেমিক বিভিন্ন সমস্যা থাকে। কোনো কারণে তাদের পরীক্ষা আটকে যায় বা তারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে না। এসব ক্ষেত্রে আমরা তাদের সেবা দিই। পাশাপাশি তারা যে বিষয় বা ফেজে সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে—প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় বর্ষ বা অন্য যেকোনো পর্যায়, সেসব বর্ষের সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের সঙ্গেও আমরা আলোচনা করি, যাতে শিক্ষার্থীকে কীভাবে সহায়তা করা যায় তা নির্ধারণ করা যায়। এর ফলে যারা একাডেমিকভাবে পিছিয়ে পড়ছিল, তাদের অবস্থার উন্নতি হয় এবং অর্জনও ভালো হয়।
তিনি বলেন, ‘আমরা শিক্ষার্থীদের মোটিভেশন দিই, কাউন্সেলিং করি এবং যাদের প্রয়োজন হয় তাদের ওষুধও দেওয়া হয়। মূলত যারা একাডেমিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে, তাদের ক্ষেত্রে আমরা সমস্যার কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করি। কারণ প্রত্যেক শিক্ষার্থীর সমস্যার পেছনে আলাদা কারণ থাকে। কারও ডিপ্রেশন, কারও উদ্বেগ, আবার কারও নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার সমস্যা থাকে।
তিনি আরও বলেন, ‘মূল সমস্যার চিকিৎসা শুরু হলে একাডেমিক ক্ষেত্রেও স্বাভাবিকভাবেই কিছু উন্নতি দেখা যায়। এরপর আমরা কলেজের সঙ্গেও সমন্বয় করে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করি। অনেক সময় এমন হয়েছে, কোনো শিক্ষার্থী মানসিক সমস্যার কারণে পরীক্ষার দিন উপস্থিত থাকতে পারেনি। পরে আমরা তাদের কাউন্সেলিং করেছি এবং বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে আলাদা করে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছি। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো, কোনো শিক্ষার্থী যেন পিছিয়ে না পড়ে এবং তারা যেন স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে।’
‘শুনো বলি মনের কথা’ সেন্টারে সাধারণের সাইকোথেরাপি
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাইকিয়াট্রি বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. মো. মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমাদের আউটডোরে গড়ে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ জন রোগী আসে। তবে সবার সাইকোথেরাপি প্রয়োজন হয় না। যাদের প্রয়োজন হয়, তাদের আমরা পরামর্শ দিই।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুনো বলি মনের কথা’ নামে আমাদের একটি রুটিনভিত্তিক সাইকোথেরাপি কার্যক্রম রয়েছে। প্রতি রবি, সোম ও মঙ্গলবার এই সেবা দেওয়া হয়। যাদের সাইকোথেরাপি প্রয়োজন, তাদের নির্দিষ্ট দিনে আসতে বলা হয় এবং এভাবেই তাদের নিয়মিত ফলোআপ করা হয়। মূলত আউটডোর ও ইনডোর—উভয় বিভাগের রোগীদের মধ্য থেকে যাদের প্রয়োজন হয়, তাদের এই সেবা নিতে পরামর্শ দেওয়া হয়।
ডা. মেহেদী হাসান বলেন ‘যেসব রোগী সাইকোথেরাপির জন্য বেশি আসেন, তাদের মধ্যে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, আত্মহত্যাপ্রবণতা, ব্যক্তিত্বজনিত সমস্যা উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া অনেকেই দাম্পত্য বা পারিবারিক সমস্যার কারণে থেরাপি নিতে আসেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকেই একাডেমিক চাপ, পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা কিংবা নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে না পারার সমস্যায় ভোগেন। আবার অনেক রোগী কাজের প্রতি মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন। এসব সমস্যার ক্ষেত্রেই আমরা সাইকোথেরাপির পরামর্শ দিয়ে থাকি।’
রোগীকে সুস্থ করে তোলার প্রক্রিয়া
ডা. মেহেদী হাসান বলেন, সাইকোথেরাপি একটি দীর্ঘ ও বিস্তারিত প্রক্রিয়া। প্রত্যেক মানুষের চিন্তার ধরন আলাদা। সাইকোথেরাপির মাধ্যমে মূলত একজন মানুষের চিন্তা-ভাবনার ধরন পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়। আর চিন্তার পরিবর্তনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তার আচরণেও পরিবর্তন আসে।
তিনি বলেন, ‘যখন একজন মানুষের চিন্তার ধরন ইতিবাচকভাবে বদলাতে শুরু করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার আচরণেও পরিবর্তন দেখা যায়। আবার অনেকের মধ্যে একই কাজ বারবার করার প্রবণতা থাকে। এসব ক্ষেত্রে আমরা চিন্তা ও আচরণ দুই দিক নিয়েই কাজ করি। তবে শুরুটা হয় মূলত চিন্তার ধরন পরিবর্তনের মাধ্যমে। কারণ চিন্তার পরিবর্তনই একজন মানুষের আচরণ ও জীবনযাপনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।’
উপকৃত মেডিকেল শিক্ষার্থীর বক্তব্য
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মেডিকেল শিক্ষার্থী বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমার ঘুম কম ছিল। তবে তখন এত বেশি সমস্যা হতো না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্যাটা আরও প্রকট হতে থাকে। বিশেষ করে গত তিন-চার বছর ধরে আমি তীব্র ঘুমের সমস্যায় ভুগছিলাম। রাতে ঘুমাতে যেতে যেতে ১২টা-১২টা ৩০ বেজে যেত, কিন্তু ঘুম আসত ভোর ৪টার দিকে। আবার সকালে কলেজে যেতে হতো, ফলে ঘুম ঠিকভাবে পূর্ণ হতো না। সারাদিন খুব ক্লান্ত, দুর্বল ও অস্বস্তি লাগত।’
তিনি বলেন, ‘আমি সাধারণত দুপুরেও ঘুমাই না। ফলে দিনে মাত্র তিন-চার ঘণ্টা ঘুম হতো, যা আমার জন্য খুব কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একদিন আমি বিষয়টি এক বন্ধুকে বলি। তখন সে আমাকে পরামর্শ দেয় সাইকিয়াট্রি বিভাগের একজন শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। পরে আমি স্যারের কাছে যাই। তিনি আমার সমস্যার কথা শুনে কাউন্সেলিংয়ের জন্য পাঠান। সেখানে একজন কাউন্সেলর আমাকে ‘স্লিপ হাইজিন’ সম্পর্কে বিভিন্ন পরামর্শ দেন এবং কিছু নিয়ম মেনে চলতে বলেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরে স্যার আমাকে কিছু ওষুধ দেন, যা আমি নিয়মিত খেয়েছি। এখন প্রায় ২৬ দিন চলছে। আল্লাহর রহমতে আমি অনেকটাই সুস্থ আছি। আগের তুলনায় এখন ঘুম অনেক ভালো হচ্ছে। যদিও মাঝে মাঝে একটু দেরিতে ঘুম আসে, তবে আগের মতো তীব্র সমস্যা আর নেই। এক মাসের ডোজ শেষ হলে আবার স্যারের কাছে যাব, তখন পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ নেব।’
এমইউ