মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন
এডিটর প্রফেশনাল ম্যাগাজিন
বাংলাদেশ নার্সেস এসোসিয়েশন
জাতীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ
০৭ এপ্রিল, ২০২৬ ০৬:৪৭ পিএম
বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ও নার্সদের ভাবনা
আজ ৭ এপ্রিল, বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। পৃথিবীর প্রতিটি দেশেই নানা আয়োজনে পালিত হচ্ছে দিবসটি। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম ছিল না। এই বছরের প্রতিপাদ্য বিষয়টি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এবং সময় উপযোগী যে, টুগেদার ফর হেলথ্ স্টেন্ড ইউথ সাইন্স, অর্থাৎ স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সেবার মান।
আমাদের দেশের মানুষের মধ্যে এমনকি স্বাস্থ্যসেবার সাথে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরাও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত স্বাস্থ্যের প্রকৃত সংজ্ঞা অনুধাবন করতে পুরোপুরি সচেষ্ট নন। আমাদের ধারণা রোগমুক্ত থাকার নামই হলো স্বাস্থ্য, যাকে আমরা মূলত সুস্থ হিসেবে বিবেচনা করি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একজন মানুষের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক অবস্থার কথা বলেছে এবং শুধুমাত্র রোগমুক্ত নয়, তাকে অর্থনৈতিকভাবে কর্মক্ষম হওয়ারও কথা বলেছে।
আমরা বর্তমানে স্বাস্থ্যকে ওষুধ এবং কিছু প্রযুক্তির মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেছি।
এটা সত্য যে, চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নত সাধনের সাথে সাথে মানুষের জীবনের মানোন্নয়ন ঘটেছে, বৃদ্ধি হয়েছে গড় আয়ু। এর বিপরীত চিত্রটি চিন্তা করলে দেখা যাবে চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে বহু পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অবস্থা মূলত রোগমুক্ত থাকার সাথেই সম্পৃক্ত নয়, বরং এখানে সামাজিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়ও সম্পৃক্ত।
হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে অনেককেই পেয়েছি, যারা পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম ব্যক্তি। এমন মানুষ অসুস্থ হলে তাদের মূল চিন্তা হয়ে যায়, আমার কিছু হলে পরিবার বা ছেলে-মেয়ের কী হবে? তারা কীভাবে চলবে?
পরিবারের সদস্যদের চিন্তা চলে আসে আমাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম অসুস্থ, আমরা টাকার অভাবে টেস্ট করাতে পারছি না, ওষুধ কিনতে পারছি না বা আরো ভালো জায়গায় চিকিৎসা করাতে পারছি না; এমন অনেককেই পেয়েছি, যিনি অত্যন্ত ধার্মিক, কিন্তু বারবার অসুস্থ হচ্ছেন—তখন তার মন-মেজাজ খারাপ হয়ে যায়।
আবার বাংলাদেশের পেক্ষাপটে আমরা দেখেছি, স্বাস্থ্যব্যস্থার অন্যতম মূল চালিকা শক্তি হলেও স্বাস্থ্যের নীতি নির্ধারণে নার্সরা উপেক্ষিত। যেহেতু বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের প্রায় ৫০% নার্স, তাই তাদেরকে যথাযথ মূল্যায়ন জরুরি।
আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নীতি নির্ধারণ মূলত চিকিৎসক নির্ভর, এখান থেকে বের হয়ে আসতে হবে এবং স্বাস্থ্যব্যস্থার সাথে সম্পৃক্ত সকল পেশাজীবীকে সমহারে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সম্পৃক্ত করতে হবে।
বিগত সকার একটি স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল, সেখানে স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বড় পেশাজীবী নার্সরা ছিলেন উপেক্ষিত।
বর্তমান হামের প্রাদুর্ভাবে একই ঘটনা লক্ষ্য করছি। হাম সংক্রান্ত যে সকল নীতিনির্ধারণী মিটিং বা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের মিটিং হয়ছে, তাতে নার্স এবং নার্স পেশাজীবী সংগঠনকে মূল্যায়ন করা হয়নি।
আমরা এই সকল বিষয় যখন সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারবো তখন সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া সহজ হবে।
এজন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আজকের দিবসে যেই কথাটি বলেছে, তা হলো—টুগেদার ফর হেলথ্। এই টুগেদার ফর হেলথ্। এর সঠিক মর্মার্থ বুঝতে হবে।
এক্ষেত্রে গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের জন্য বিশেষ করে অসংক্রামক রোগ (এনসিডি) নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যখাতের সকল বিভাগ এক সাথে কাজ করার বিষয়ে ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছে। ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট ঘোষিত যুগান্তকারী ওই যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করে ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। কিন্তু এর বাস্তবায়ন চোখে পড়ে না।
এ ছাড়া আমাদের দেশে এখনো অনেক অপচিকিৎসা হয়। ধারণাবশত চিকিৎসা তো নিত্য-দিনের ঘটনা। স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞানের প্রয়োগ যদি নিশ্চিত করা না যায় তাহলে চিকিৎসা সেবা হুমকির মধ্যে পড়বে।
এ রকম অপচিকিৎসার ফলে বহু রোগীর ভোগান্তির প্রেক্ষাপটে দেশের স্বাস্থ্যসেবায় তৈরি হয়েছে অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা। মূলত বিজ্ঞান ভিত্তিক চিকিৎসা নিশ্চিতের মাধ্যমেই এটা কাটাতে হবে।
আবার বাংলাদেশের চিকিৎসকরা যতটুকু বিজ্ঞান নির্ভর সেবা দেন, নিত্য-নতুন তথ্যের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারায় নার্সরা এদিক থেকে অনেকটাই পিছিয়ে আছে।
তারা ওষুধ দেওয়া ছাড়া আর কোনো কিছুতেই খুব একটা গুরুত্ব দেন না এবং যতটুকু দেন তার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানভিত্তিক হয় না।
আমরা মনে করি, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে অবশ্যই সমন্বিত বিজ্ঞান নির্ভর সেবাকে এগিয়ে নিতে হবে এবং জনশক্তিকে কর্মক্ষম রাখতে হবে।
এমইউ/