উচ্চঝুঁকির ৩০ উপজেলায় হামের টিকাদান শুরু, প্রথম ধাপে পাবে ১২ লাখ ৩ হাজার শিশু
মেডিভয়েস রিপোর্ট: হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় ১৮ জেলার ঝুঁকিপূর্ণ ৩০ উপজেলা ও পৌর এলাকায় শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হাম-রুবেলার জরুরি টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আজ রোববার (৫ এপ্রিল) সকাল ৯টা থেকে নির্ধারিত কেন্দ্রগুলোতে একযোগে এ কার্যক্রম শুরু হয়।
শনিবার (৪ এপ্রিল) সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছিলেন, দেশজুড়ে হামের উচ্চ সংক্রমণ বিবেচনায় প্রথম ধাপে প্রায় ১২ লাখ ৩ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে সরকার।
মন্ত্রী বলেন, ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সি (৫৯ মাস পর্যন্ত) সব শিশুকে এই টিকার আওতায় আনা হয়েছে। তারা আগে টিকা নিয়ে থাকুক বা না থাকুক, সবাই টিকা পাবে। এর পাশাপাশি শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলও খাওয়ানো হবে। তবে যেসব শিশু অসুস্থ শুধু তারাই ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলটি পাবে।
আজ রোববার প্রথম ধাপে যেসব উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কার্যক্রম শুরু হবে সে তথ্য তুলে ধরে সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে জাতীয় টিকাদানবিষয়ক কারিগরি পরামর্শক কমিটি (এনআইটিএজি) একটি জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম গ্রহণের সুপারিশ করেছে। কার্যক্রমটি একটি সমন্বিত প্রতিরোধ পরিকল্পনার অংশ, যার লক্ষ্য দ্রুত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা এবং ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ‘৬ মাস থেকে ৫৯ মাস মানে পাঁচ বছরের চেয়ে এক মাস কম, এই গ্রুপটাকে আমরা রোববার শুরু করছি। তবে প্রথমে ৩০টা উপজেলা শুরু করা মানে কার্যক্রম শেষ না। যেহেতু এখানে প্রবল আকার ধারণ করেছে। এটাকে আমরা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বাকিগুলোতে কাজে অগ্রসর হব। প্রথম পর্যায়ে ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ‘হটস্পট’ এলাকায় কর্মসূচি শুরু হবে। পরে রোগের পরিস্থিতি ও মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতির ভিত্তিতে তা ধাপে ধাপে আরও বিস্তৃত করা হবে। মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্য, ২১ মের মধ্যে এই জরুরি কার্যক্রম শেষ করা।
ত্রিশ উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপিত তালিকা অনুযায়ী, ৩০টি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার নমুনা নিয়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হামের রোগী পাওয়া গেছে ২৭৫। এর মধ্যে ৫ বছরের কম বয়সি শিশু ২২৪ জন, ৫ বছর থেকে ১০ বছরের কম বয়সি ২৩ জন এবং ১০ বছরের বেশি বয়সি ২৮ জন।
আজ শুরু হওয়া হামের জরুরি টিকাদান কর্মসূচিতে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত ৩০ উপজেলাগুলো হলো—বরগুনা পৌরসভা ও সদর, চাঁদপুরের সদর ও হাইমচর, কক্সবাজারের মহেশখালী ও রামু, গাজীপুর সদর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর, শিবগঞ্জ ও ভোলাহাট, পাবনার ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া ও বেড়া, নেত্রকোনার আটপাড়া, ময়মনসিংহের সদর, ত্রিশাল ও তারাকান্দা, রাজশাহীর গোদাগাড়ী, বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ ও বাকেরগঞ্জ, নওগাঁর পোরশা, যশোর সদর, নাটোর সদর, মুন্সীগঞ্জের লৌহজং, সদর ও শ্রীনগর, মাদারীপুর সদর, ঢাকার নবাবগঞ্জ, ঝালকাঠির নলছিটি ও শরীয়তপুরের জাজিরা।
টিকাদান সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, রোববার সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত টিকাদান কার্যক্রম চলবে। স্কুল, মাদ্রাসা, শ্রমঘন এলাকা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতেও টিকা দেওয়া হতে পারে।
আগে টিকা নেওয়া শিশুরাও এই জরুরি কর্মসূচির আওতায় আসবে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘৬ মাস থেকে ৫৯ মাসের ভেতরে যারা আছে, আগে পাক বা না পাক, সবাই পাবে। টিকা নিলে ক্ষতির আশঙ্কা নেই।’
আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, সরকার সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ব্যবহৃত টিকা নিরাপদ ও কার্যকর। আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই, তবে সবাইকে সচেতন ও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।’
আক্রান্তদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হাম আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল দেওয়া হবে। তবে টিকা নিতে আসা সুস্থ শিশুদের এটি দেওয়া হবে না।
হামে আক্রান্তদের ভিটামিন ‘এ’ দেওয়া হবে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘প্রত্যেক হাসপাতালে রোগীদের এটা খাইয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু যাদের টিকা দেওয়া হচ্ছে সুস্থ, তাদের ভিটামিন ‘এ’ দেওয়া হবে না। এ ছাড়া যেসব শিশুর জ্বর আছে বা বর্তমানে অসুস্থ, তাদের এ সময় হামের টিকা দেওয়া হবে না। তারা সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার পর টিকা গ্রহণ করবে।’
আইসিইউ চাপে, বিকল্প ভাবছে সরকার
শিশু হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) সংকট নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘রোগী বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যমান সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। আইসিইউ সংকট বলতে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে, আইসিইউ তো দৈনিক বাড়ানো যায় না। আমাদের যে আইসিইউ সক্ষমতা আছে সেটা পূর্ণ হয়ে গেছে। এর মধ্যে যদি কারও আইসিইউর প্রয়োজন পড়ে, আমরা বিকল্প ব্যবস্থা করবো।’
২০২৫ সালে টিকাদান কমে যাওয়া নিয়ে তদন্ত হবে কিনা, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমরা এখন কাজ করতে চাই। ওই অতীতের তদন্ত করে কাউকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলিয়ে লাভ নেই, আমাকে আমার মানুষকে বাঁচাতে হবে, আমার শিশুদের বাঁচাতে হবে।
এমইউ/