১৭ জানুয়ারী, ২০২৬ ১১:১৮ পিএম

গভীর সংকটে ওষুধ খাত, ৪০ ভাগ কোম্পানি বন্ধের পথে: বাপি সভাপতি

গভীর সংকটে ওষুধ খাত, ৪০ ভাগ কোম্পানি বন্ধের পথে: বাপি সভাপতি
‘বাংলাদেশ ফার্মা ইন্ডাস্ট্রি : প্রেজেন্ট চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড ফিউচার প্রসপেক্টস’ শীর্ষক কর্মশালা। ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে দাবি করেছেন বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির (বাপি) সভাপতি, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মুক্তাদির। কয়েকটি শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশ ওষুধ কোম্পানি আর্থিকভাবে টিকে থাকার লড়াইয়ে হেরে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, অবনতিশীল প্রবৃদ্ধির কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, কেউ বন্ধ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে।

আজ শনিবার (১৭ জানুয়ারি) দুপুরে ‘বাংলাদেশ ফার্মা ইন্ডাস্ট্রি: প্রেজেন্ট চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড ফিউচার প্রসপেক্টস’ শীর্ষক কর্মশালায় এসব কথা বলেন তিনি।

দেশের রোগীদের ওষুধপ্রাপ্যতা হুমকিতে

বাপি সভাপতি বলেন, রাষ্ট্রীয় নীতি ও দীর্ঘদিনের অবহেলায় ওষুধ শিল্পের স্বাভাবিক বিকাশধারা থমকে গেছে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকিতে পড়ার পাশাপাশি দেশের রোগীদের ওষুধপ্রাপ্যতা এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানির স্বপ্নও হুমকির মুখে পড়ছে। এই বাস্তবতায় শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ নয়, সহায়তার মাধ্যমে স্বাভাবিক গতিতে চলতে দেওয়া জরুরি।

ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, বাংলাদেশে যদি একশ ওষুধ কোম্পানি হিসাবে নিয়ে তাদের অবস্থার খোঁজ নেন যে, তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কেমন? আপনাদের চোখের সামনে জ্বলজ্বল করবে যে, মাত্র ১০-২০ কোম্পানি ছাড়া ৮০ ভাগ কোম্পানি অবনতিশীল প্রবৃদ্ধিতে এবং ৪০ ভাগ কোম্পানি বন্ধ হয়েছে, না হয় বন্ধ হয়ে যাবে। 

‘আপনাদেরকে আমি উদাত্ত আহ্বান জানাবো, আপনারা ইনসেপ্টা, ডেল্টা, হেলথকেয়ার, স্কয়ার কিংবা, অন্যান্য কোম্পানির সঙ্গে কথা বলেন—এর বাইরে আপনারা চাইলে তালিকা দিয়ে দেবো, ১০০তম কোম্পানি থেকে পঞ্চাশ নম্বর কোম্পানি, নিচের দিক থেকে পঞ্চাশ ভাগ কোম্পানি পরিদর্শন করুন এবং তাদের অবস্থা কেমন, তারা কিসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আপনারা ভাবুন, এই কোম্পানিগুলো যদি ওঠে না আসে তাহলে আমাদের দেশের রোগীদের যেসব ওষুধ এখন পর্যন্ত দিয়ে যাচ্ছি, এটা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আর পাবে না। এসব কোম্পানি উঠে না আসলে দেশের জন্য এবং গোটা পৃথিবীতে ওষুধ রপ্তানির যে স্বপ্ন তা বাস্তবায়ন হবে না’—যোগ করেন আব্দুল মুক্তাদির।

অনেক ওষুধ ১৯৯০ সালের দামে বিক্রি

তিনি বলেন, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের চিত্র হলো, তারা ১০০-২০০টি ওষুধ বানায়। এর বেশিরভাগের দাম বাড়েনি। ১৯৯০ সালে যে ওষুধের দাম দুই টাকা ছিল, ২০২৬ সালে ওই জায়গাতেই আছে। সরকার এগুলোর দাম বাড়াতে দেয়নি, তাদেরকে কোনো রকমের সাহায্য-সহযোগিতা করেনি। কোম্পানগুলো বন্ধ হতে হতে এই পর্যায়ে আছে। এর পর এখন আবার নতুন নিয়ম চালু করা হচ্ছে।

শিল্পকে নিজস্ব ধারায় চলতে দেওয়ার আহ্বান

সমস্ত সহযোগিতা দিয়ে শিল্পকে নিজস্ব গতিধারায় চলমান রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তাহলে শিল্পের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়বে, মূল্য কমানোসহ বিভিন্ন বিষয়ে নজর দিতে পারবে। তারপর একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থায় এসে দুটি বিষয়ে মনোযোগী হতে পারবে, সেগুলো হলো—সামগ্রিকভাবে মানের উন্নয়ন এবং প্রতিযোগিতার মাধ্যমে জিনিসপত্রের দাম কমানো। সেটা ওষুধ, বিস্কুট, পানি যাই হোক না কেন? ন্যাচারাল মার্কেট ফোর্সের মাধ্যমে শিল্প এভাবে কাজ করে। এগুলো যখনই আপনি বাধাগ্রস্ত করবেন, তখনই এই শিল্প উৎপাদন হারাবে এবং এক পর্যায়ে শেষ হয়ে যাবে।

এ ব্যাপারে ভেনেজুয়েলার দৃষ্টান্ত তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর সব চাইতে বেশি পেট্রলিয়াম রিজার্ভ রয়েছে ভেনিজুয়েলায়, সৌদি আরবের চাইতেও বেশি। সেখানে সব কিছু রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ করবে—এ রকম অবস্থায় যাওয়ার আগে সে দেশের জনগণ অভিযোগের জন্য দলে দলে বিভিন্ন দেশে যেত, আমেরিকায় যেত, ঘুরে বেড়াত। এই দেশ সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির মধ্যে বসবাস করতো। রাষ্ট্র এক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করলো, তেল কোম্পানির বিজ্ঞানিসহ সবার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করল। ফলে তেল শিল্পের যে ন্যাচারাল ফ্লো ছিল, তাদের টেকনোলজির যে উন্নতি ছিল—সেগুলো সব বন্ধ হওয়া শুরু হলো। হতে হতে যেখানে ৯৮ ভাগ মানুষ সমৃদ্ধ-সাবলম্বী ছিল, আজ সেখানে ৮৫ ভাগ লোক খেতে পায় না। ঘর নাই, খাওয়া নাই, প্রতিষ্ঠান নাই, চিকিৎসা নাই—কিছুই নাই। ন্যাচারাল একটি বৃদ্ধির বাজারকে খামচে ধরলে যে অবস্থা হতে পারে, চোখের সামনে আপনারা দেখতে পারছেন ভেনেজুয়ালের কি অবস্থা হয়েছে। সেই দেশে অশান্তি, সমস্যায় জর্জরিত। এখন বাইরের একটি শক্তি এসে ঠিক করার চেষ্টা করছে, কী হবে আমি জানি না।’

‘রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপে ওষুধ শিল্প বন্ধ করার চেষ্টা’

বাপি সভাপতি বলেন, ‘আমাদের ওষুধ শিল্পের স্বাভাবিক যে ধারা ছিল, তা শুরু হয়েছিল ১৯৯২ সালে। ২০১৬ সালে এসে এটা বন্ধ হয়ে গেছে। ২০১৬ থেকে ২০২৬—এই দশ বছর ওষুধ শিল্পের উন্নতির প্রতিটি জায়গায় অন্তরায় তৈরি করে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এখন আবার সেটা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এমনভাবে বন্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে এই শিল্পের স্বাভাবিক গতিধারা চলতে পারবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভবিষ্যতে যে সরকার আসবে তারা পদক্ষেপ নেবে। আমরা শুধু সমস্যা চিহ্নিত করে দিতে চাই। যে কারণে এ শিল্প সামনে উঠে এসেছিল, সেই ১৯৯৪ এর নীতি আপনারা বহাল রাখেন। আমরা চাই, ৬০ ভাগ ওষুধ প্রতিষ্ঠানের উন্নতির জন্য যা যা করার দরকার সরকার দ্রুত তা করে যেন প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্বের পর্যায়ে ফেরত নিয়ে আসে।’

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বাপি সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. জাকির হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান ও কোষাধ্যক্ষ হালিমুজ্জামান। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ ও সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত