আন্দোলনে বিরোধিতা ও জুলাই নিয়ে বিরূপ মন্তব্য: অভ্যুত্থানের দুই বছর পরও বহাল তবিয়তে চাঁদপুর মেডিকেলের অধ্যক্ষ
মেডিভয়েস রিপোর্ট: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পতিত স্বৈরাচারের সুবিধাভোগীদের অপসারণ করা হলেও চাঁদপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সাহেলা নাজনীন বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে বিরোধিতা, অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ভীতি প্রদর্শন এবং শিক্ষার্থীদের দলীয় কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে বাধ্য করাসহ নানা অপরাধে জড়িত ছাত্রলীগ নেতাদের বিচারে গড়িমসির অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসজুড়ে ডা. নাজনীনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ও জবাবদিহির দাবি জোরালো হচ্ছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২ এপ্রিল চাঁদপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) কুমিল্লা শাখার আজীবন সদস্য অধ্যাপক ডা. সাহেলা নাজনীন। এর পর থেকেই তিনি একের পর এক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের লেজুড়বৃত্তির জানান দিতে থাকেন।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে কোনো রকম রাখঢাক ছাড়াই মেডিকেল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যোগদানে সরাসরি বাধা দেন তিনি। একই সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দিলে একাডেমিক কাউন্সিলের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া, এমনকি ছাত্রত্ব বাতিলেরও হুমকি দেন তিনি।
এর অংশ হিসেবে ১৮ জুলাই এ ব্যাপারে নোটিস জারি করে চাঁদপুর মেডিকেলের শিক্ষক/কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরকে এই আন্দোলনে অংশ নিতে নিষেধ করেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও একে সমর্থন করে কোনো বক্তব্য শেয়ার না দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেন।
ডা. সাহেলা নাজনীন স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত নোটিসে বলা হয়, ‘এতদ্বারা চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ, চাঁদপুর এর সকল শিক্ষক/কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অবগতির জন্য জানানো যাইতেছে যে, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশনা মোতাবেক চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ, চাঁদপুরের কোনো শিক্ষক/কর্মকর্তা ও কর্মচারী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বর্তমান দেশব্যাপী চলমান আন্দোলনের ইস্যুতে কোনোভাবেই জড়িত থাকতে পারবেন না এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন কোনো মতামত প্রদান করবে না, অথবা অন্য কারও মতামত শেয়ার, লাইক দেওয়া যাবে না, যাতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।’
আন্দোলনে বিরোধিতাসহ তার বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চেয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বরাবর একটি চিঠি দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, ‘চাঁদপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. সাহেলা নাজনীন যিনি ফ্যাসিবাদের দোসর এবং আওয়ামী লীগ নেত্রী হিসাবে জুলাই পরবর্তীতে কীভাবে অধ্যক্ষ হিসাবে বহাল তবিয়তে থাকে তাহা সাধারণ জনগণের বোধগম্য নহে। তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের জুলাই আন্দোলনের সময়সহ বর্তমানেও নানা রকম হুমকি প্রদান করে থাকেন, যদি কোনো ছাত্র-ছাত্রী তাহার আদেশ অমান্য করে তবে তাদেরকে নানা রকম ভয় ভীতি দেখায় যে, পরীক্ষায় বসতে দিবে না এবং হোস্টেলের সিট বরাদ্দ বাতিল করে দিবে।’
চিঠিতে তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ করা হয়, ‘আওয়ামী লীগের দোসর ছাত্রলীগের কর্মীদের বিচারের দাবি জানালে তিনি তাদের বিচার না করে উল্টো ছাত্র-ছাত্রীদের এবং তাদের অভিভাবকদের বিভিন্নভাবে হেনস্তা, হুমকি প্রদান এবং ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষায় বসতে না দেওয়ার হুমকি দেন।’
‘তিনি সপ্তাহে মাত্র দুই থেকে তিন দিন অফিসে উপস্থিত থাকেন এবং সকল সুবিধা ভোগ এবং ছাত্র ছাত্রীদের নিকট হতে জমাকৃত টাকা ব্যাংক হিসাবে প্রদান করে পরবর্তীতে ওই টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ ছাড়াও ছাত্র-ছাত্রীদের নিকট হইতে অবৈধভাবে হোস্টেল ফি গ্রহণ এবং অর্থ আত্মসাৎ করেন, এ ব্যাপারে কেউ প্রতিবাদ করলে তার সিট বাতিল করার হুমকি দেন’—তার বিরুদ্ধে অভিযোগ।
ভুক্তভোগী মেডিকেল শিক্ষার্থীরা বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যাকারী স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারের পতন হলেও দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রয়ে গেছে পতিত সরকারের সুবিধাভোগীরা। চাঁদপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সাহেলা নাজনীন তাদের একজন। নানা কৌশলে তিনি ক্ষমতার চেয়ার ধরে রেখেছেন।
মেডিকেলে আওয়ামী মনোভাবের ব্যক্তিদের আনুকূল্য দিয়ে যাচ্ছেন অভিযোগ করে শিক্ষার্থীরা বলেন, গণঅভ্যুত্থান পূর্ববতী সময়ে ছাত্রদের দলীয় কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে বাধ্য করাসহ নানা অপরাধে জড়িত চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ ছাত্রলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে বিচারের দাবি তুললে তা নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং তাদের শাস্তি কমানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন তিনি। বিচারের দাবিতে সোচ্চার শিক্ষার্থীদের হেনস্তার শিকার হওয়ার পাশাপাশি তাদের একাডেমিক ক্যারিয়ারও এখন হুমকির মুখে রয়েছে।
জুলাইকে ‘সন্ত্রাসী আন্দোলন’ আখ্যা
‘ডা. সাহেলা নাজনীন মনে করেন জুলাই আন্দোলন ছিল অযৌক্তিক এবং সন্ত্রাসী আন্দোলন, এখনো নিয়মিত জুলাই নিয়ে আজেবাজে মন্তব্য করেন তিনি। এমনকি সাম্প্রতিক সময়ে কলেজের নতুন ছাত্রদের ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামে জুলাই নিয়ে কথা না বলার জন্য তিনি বিভিন্নমাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করেন’—বলেন শিক্ষার্থীরা।
একাধিক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে কলেজের বিভিন্ন প্রোগ্রামে বক্তব্যে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতি বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করেছেন সিলেট মেডিকেলে অধ্যয়নের সময় ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকা ডা. সাহেলা নাজনীন।
ইসলামিক প্রোগ্রামে বাধা
ডা. সাহেলা নাজনীনের ইসলাম বিদ্বেষী মনোভাবের অভিযোগ করেছেন একাধিক শিক্ষার্থী। তারা বলেন, ‘বিশেষ রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততার অভিযোগে এনে তিনি বরাবর সাধারণ শিক্ষার্থীদের ইসলামিক আয়োজনে বাধা সৃষ্টি করেন। ইসলামিক প্রোগ্রামের জন্য তার কাছে গেলেই শুরু হয় নানা টাল বাহানা।’
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ‘কলেজে নাচ, গান ও পূজাসহ সকল প্রোগ্রাম আয়োজনে তিনি স্বতঃস্ফূর্ত অনুমতি এবং আর্থিকসহ সহযোগিতা করলেও সিরাত কনফারেন্সের জন্য তার কাছে শিক্ষার্থীরা গেলে সীরাত নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন তুলেন।’
‘তিনি বলেন, সীরাত কনফারেন্স করা মহাঅন্যায়। এর জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। সীরাত পড়লে কুরআনকে অবমাননা করা হয়। বুখারী শরীফ পড়া যাবে না। বুখারী শরীফে শয়তান আকর্ষণ সৃষ্টি করে রাখে। ইত্যাদি’—বলেন শিক্ষার্থীরা।
যা বললেন অধ্যক্ষ
জুলাইয়ে আন্দোলনে বাধাদানের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগে তদন্ত করে সত্যিটা বের করেন। তদন্ত করেন। সেগুলো দুই বছর আগের কথা। আপনি এখন আমাকে প্রশ্ন করছেন। একটিবার ভাবুন, বাংলাদেশের সকল অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে এ রকম অভিযোগ আছে, সব শিক্ষক এবং ছাত্র তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। জোর করে পদত্যাগ করানো হয়েছে। আমি যদি তাদেরকে আন্দোলনে যেতে বাধা দিতাম, তাহলে আমার বিরুদ্ধেও আন্দোলন হতো। তাহলে আমি নিশ্চয়ই এই জায়গায় থাকতে পারতাম না। কল্পনা করেন! আমার এখানে কোন ছাত্র-শিক্ষক কোনো রকম আন্দোলন হয়েছে? কারণ আমি এগুলোর কোন কিছুরই বিপক্ষে ছিলাম না।
আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে আপনি নিয়মিত ক্যাম্পাসে আসেন না। এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখানে বায়োমেট্রিক হাজিরা আছে। প্রতিদিন সকাল বায়োমেট্রিক হাজিরা দিতে হয়। আমি আসব, কি আসব না—এ ব্যাপার সরকার আমাকে ধরবে। কারণ এখানে প্রত্যেকটা পদ্ধতি এখন অনলাইন হয়ে গেছে। আমি অনিয়মিত হলে অধ্যক্ষের চেয়ারে থাকতে পারতাম না। আই অ্যাম নট ইন্টারেস্টেড, আই অ্যাম এ গাইনিকোলজিস্ট। আমি কখনোই প্রিন্সিপালের চেয়ারে বসার কোনো ইচ্ছা কোনোদিন প্রকাশ করি নাই। আর আমি এত বছর সরকারি চাকরি করি, আমার বিরুদ্ধে কোনো রকম অভিযোগ থাকলে সরকার আমাকে এই চেয়ারে বসাতো না।
জুলাইয়ে যারা আন্দোলনে গেছে তাদের ছাত্রত্ব বাতিল করার হুমকি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো শিক্ষার্থী এ ধরনের কথা আমাকে বলতে পারে না। আমি কখনোই আন্দোলনের বিরুদ্ধে ছিলাম না, বরং পক্ষে ছিলাম। আপনারা জানেনও না! ক্লাসের পরে শিক্ষার্থীরা প্রেস ক্লাবের সামনে ব্যানার নিয়ে আন্দোলন করেছে। তখন ওদেরকে বাধা দেওয়া হয়েছে? কিছু বলা হয়েছে? কিছুই করা হয়নি। আমরা কিছু বলিনি তখন। সুতরাং এই ধরনের অভিযোগ অকারণে দেওয়া হচ্ছে।
আন্দোলনে অংশ না নিতে বাধা দেওয়ার নোটিস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সরকার যে নির্দেশনা দেয়, সেটা পালন করা আমাদের দায়িত্ব, এটাই নিয়ম! আমি নিজে থেকে কোনো কিছু করতে পারি না এবং জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে আমি কোনো কিছুই করিনি।’
ছাত্রলীগের যেসব নেতাকর্মী শিক্ষার্থীদের মিছিল-মিটিংয়ে যেতে বাধ্য করতো, আপনি তাদের বিচারের ব্যাপারে গড়িমসি করছেন—এমন প্রসঙ্গে তাঁর দাবি, ‘তাদের সবার বিচার হয়েছে। আপনি জানেন? আন্দাজে কথা বলেন কীভাবে? একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত। একাডেমিক কাউন্সিলের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত, আমার একার কোনো ক্ষমতা নেই।’
তবে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অফিসে যোগাযোগ করেন। আমার এখানে ভাইস প্রিন্সিপাল আছে, তার সাথে যোগাযোগ করেন।’
এমইউ/