১৭ জানুয়ারী, ২০২৬ ১১:১২ পিএম
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বৃদ্ধি ও মূল্য নির্ধারণ নিয়ে বাপি 

একতরফা সিদ্ধান্তে ওষুধের মান ও প্রাপ্যতা হুমকিতে পড়বে

একতরফা সিদ্ধান্তে ওষুধের মান ও প্রাপ্যতা হুমকিতে পড়বে
রাজধানীতে ‘বাংলাদেশ ফার্মা ইন্ডাস্ট্রি : প্রেজেন্ট চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড ফিউচার প্রসপেক্টস’ শীর্ষক কর্মশালা। ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ ও মূল্য নির্ধারণে সরকারের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও অভিজ্ঞদের সম্পৃক্ত করার ঘাটতির অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (বাপি)। সংগঠনটির মহাসচিব ও ডেল্টা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. জাকির হোসেন বলেন, এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার আগে ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। তাঁর মতে, খাতসংশ্লিষ্টদের অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করে একতরফা এ সিদ্ধান্ত ওষুধের সরবরাহ, গুণগত মান এবং রোগীদের স্বার্থের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আজ শনিবার (১৭ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীতে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ফার্মা ইন্ডাস্ট্রি : প্রেজেন্ট চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড ফিউচার প্রসপেক্টস’ শীর্ষক কর্মশালায় এসব কথা বলেন তিনি।

ডা. জাকির হোসেন বলেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বাড়ানো এবং সেগুলোর দাম নির্ধারণ—দুটিই অত্যন্ত কারিগরি ও বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত। অথচ এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকার ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আলোচনা হয়নি। এমনকি এই শিল্পের সংগঠন হিসেবে বাপির সঙ্গেও কোনো পরামর্শ করা হয়নি।

বাপি ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে নয় জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘দাম নির্ধারণ যদি উৎপাদন ব্যয়, কাঁচামালের মূল্য, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বাজার বাস্তবতা বিবেচনা না করে করা হয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত টেকসই হয় না।’

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের মহাসচিব বলেন, গত আট থেকে নয় মাস ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে সমিতির সঙ্গে কোনো কার্যকর যোগাযোগ নেই। উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী বা সচিব পর্যায়ের কেউই সমিতির সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলেননি। এমনকি ওষুধ শিল্পসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ মূল্য নির্ধারণ কমিটি ও অবজার্ভার তালিকা থেকেও বাপিকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

ডা. জাকির হোসেনের প্রশ্ন, ‘আমরা কি এতটাই অপ্রয়োজনীয়? দেশের অন্যতম বড় শিল্প খাত হয়েও আমাদের কথা শোনা হচ্ছে না কেন?’

দাম নির্ধারণ কমিটিতে অভিজ্ঞদের উপেক্ষা করার অভিযোগ করে তিনি আরও বলেন, ওষুধের দাম নির্ধারণের জন্য যে টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেখানে ওষুধ উৎপাদন বা ওষুধ ব্যবসার বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কাউকে রাখা হয়নি।

‘যারা কখনো ওষুধ বানাননি, যারা কখনো এই শিল্পের সঙ্গে কাজ করেননি, তারা কীভাবে ওষুধের কারিগরি বাস্তবতা বুঝে সিদ্ধান্ত নেবে? মিডিয়ার ভেতরের সমস্যা একজন সাংবাদিকই সবচেয়ে ভালো বোঝেন, তেমনি ওষুধ শিল্পের জটিল কারিগরি দিক বাইরের লোক দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়’—যোগ করেন বাপি মহাসচিব।

ডব্লিউএইচওর গাইডলাইনের কথা উল্লেখ করে শিল্প প্রতিনিধিদের ডাকা হচ্ছে না—এই যুক্তিও প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করেন ডা. জাকির। বলেন, স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর কথা বলে যাদের ওপর বাস্তবায়নের দায়িত্ব, তাদের মতামতই যদি না নেওয়া হয়, তাহলে নীতিমালা বাস্তবসম্মত হয় না। 

তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গত ৮-৯ মাসে সমিতির সভাপতি সেক্রেটারির কারও সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। একবার তাদের সঙ্গে দেখা করেছেন জুলাইয়ের আন্দোলনের পর আহতদের চিকিৎসার জন্য। এর বাইরে গত দেড় বছরে কোনো আলোচনা করেননি। পরে স্বাস্থ্য অর্থনীতির অধ্যাপক ড. হামিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে লিখিতভাবে তাদের যুক্তি ও প্রস্তাব জমা দিয়েছেন তারা।

ওষুধ শিল্পের স্বচ্ছতা ও নজরদারি প্রসঙ্গে ডা. জাকির হোসেন বলেন, ‘দেশের ওষুধ শিল্প বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। কাঁচামাল আমদানি থেকে শুরু করে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে নারকোটিক্সসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে মোট ১৪ বার রিপোর্ট দিতে হয়। পরিবেশ সুরক্ষার জন্য ইটিপি মনিটরিংয়ে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে, যার সংযোগ সরাসরি সরকারি দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত এবং তা ২৪ ঘণ্টা চালু রাখতে হয়। তার ভাষায়, ভুল তথ্য দিয়ে পার পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমরা সেটা চাইও না।’

মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তিনি বলেন, ওষুধ কারখানায় কাজ করা অফিসার পর্যায়ের সবাই গ্র্যাজুয়েট বা মাস্টার্স ডিগ্রিধারী। এমনকি মাঠ কর্মীদেরও ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নিশ্চিত করা হয়। ফ্যাক্টরির ভেতরে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে (এইচভিএসি সিস্টেম) কাজ করতে হয়, কর্মীদের জন্য নির্ধারিত পোশাক, জুতা ও নিয়মিত মেডিকেল চেকআপ বাধ্যতামূলক।

দেশের ওষুধ শিল্প একটি কৌশলগত খাত উল্লেখ করে ডা. জাকির হোসেন আরও বলেন, এই খাতকে বাদ দিয়ে, অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করে নীতিনির্ধারণ করলে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ওষুধের সরবরাহ ও গুণগত মানের ওপর।

বাপি মহাসচিবের আশাবাদ, ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক আলাদা সেশন আয়োজন করে শিল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে এবং নীতিনির্ধারণে বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। তার মনে করেন, ওষুধ শিল্প ও রোগীর স্বার্থ রক্ষায় অংশগ্রহণমূলক ও বাস্তবসম্মত নীতিনির্ধারণের কোনো বিকল্প নেই।

আলোচনায় রোগীর পকেটের খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেন ডা. জাকির হোসেন। বলেন, বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে যে খরচ তার বিশ্লেষণ করলে সহজে বোঝা যাবে, কোন খাতে কত খরচ হয়। 

এ প্রসঙ্গে নিজের মায়ের চিকিৎসা ব্যয়ের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, কয়েক দিন আগে মা হাসপাতালে ছিলেন, সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচ অনেক বেশি ছিল।

ডা. জাবির বলেন, ওষুধের খরচ সরকার বহন না করার কারণে সাধারণ রোগীদের ওষুধের পেছনে বেশি খরচ হয়। সেজন্য ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দায়ী করলে চলবে না। সরকার তিন থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার ওষুধ ইডিসিএল থেকে প্রস্তুত করে নিলে রোগীদের এ খরচ থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে সে ব্যাপারে গুরুত্ব না দিয়ে ওষুধ কোম্পানিকে দোষারোপ করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বলা হচ্ছে, আউট অব পকেট এক্সপেন্ডিচার ৭৩-৭৬ শতাংশ। দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে ১৬ ভাগ রোগী। এখানে স্বচ্ছতার সঙ্গে বিষয়টি তুলে ধরা জরুরি যে, আসলে ওষুধের পেছনে রোগীদের খরচ কত?’

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বাপি সভাপতি, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মুক্তাদির, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান ও কোষাধ্যক্ষ হালিমুজ্জামান। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ ও সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত