অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইন সংশোধন করে গেজেট প্রকাশ, অনুমোদন পেল ‘ইমোশনাল ডোনার’
মেডিভয়েস রিপোর্ট: অঙ্গ প্রতিস্থাপনে অনিয়ম, বাণিজ্যিক চক্রের দৌরাত্ম্য ও জালিয়াতি রোধে বহুল আলোচিত ‘অঙ্গ প্রতিস্থাপন আইন সংশোধন ২০২৫’–এর গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। নতুন এই আইনে প্রথমবারের মতো ইমোশনাল ডোনারকে বৈধভাবে প্রতিস্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১৯ নভেম্বর) আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ থেকে এ গেজেট প্রকাশ করা হয়।
সংশোধিত আইনে দাতা নির্ধারণ, প্রতিস্থাপনের অনুমোদন, চিকিৎসকের যোগ্যতা, ইমোশনাল ডোনার, ক্যাডেভারিক ডোনেশন ও সোয়াপ ট্রান্সপ্লান্ট—প্রতিটি ধাপেই এসেছে বড় পরিবর্তন। বিশেষ করে নজরদারি, জাতীয় রেজিস্ট্রি এবং শাস্তিমূলক কাঠামো যুক্ত হওয়ায় চিকিৎসা সংক্রান্ত এই আইন আগের তুলনায় আরও কঠোর ও কার্যকর বলে জানানো হয়েছে।
দাতার নতুন সংজ্ঞা
গেজেটে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে অঙ্গদাতার সংজ্ঞায়। আগে শুধু রক্তের সম্পর্কের ভিত্তিতে অঙ্গ দান অনুমোদিত ছিল। নতুন আইনে দাতাকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে—
বায়োলজিক্যাল ডোনার: নিকট রক্তের সম্পর্ক বা প্রমাণযোগ্য জেনেটিক সম্পর্ক
ইমোশনাল ডোনার: স্বামী–স্ত্রী, দত্তক সম্পর্ক, বন্ধুত্ব বা দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সম্পর্ক, যেখানে আর্থিক স্বার্থ জড়িত নয়
ক্যাডেভারিক ডোনার: আইনগতভাবে মৃত ঘোষিত ব্যক্তি
মৃত্যুর সংজ্ঞা ও ক্যাডেভারিক দান
ক্যাডেভারিক দান কার্যকর করতে প্রথমবারের মতো মৃত্যুর চিকিৎসাগত সংজ্ঞা গেজেটে স্পষ্ট করা হয়েছে। সরকারি অনুমোদিত ‘ডেথ সার্টিফিকেশন বোর্ড’ মস্তিষ্কের অপরিবর্তনীয় কার্যহীনতা, নিউরোলজিক্যাল রিফ্লেক্সের অনুপস্থিতি এবং কৃত্রিম শ্বাস–প্রশ্বাসের ওপর নির্ভরশীলতা নিশ্চিত করার পর মৃত্যুর ঘোষণা দেবে।
ক্যাডেভারিক দান বাধ্যতামূলক নয়। তবে মৃত্যুর আগে সম্মতিপত্র বা মৃত্যুর পর পরিবার সম্মতি দিলে দান করা যাবে—অবশ্যই কোনো আর্থিক লেনদেন ছাড়া।
জাতীয় অঙ্গ প্রতিস্থাপন রেজিস্ট্রি
গেজেটে বাধ্যতামূলকভাবে একটি জাতীয় অঙ্গ প্রতিস্থাপন রেজিস্ট্রি গঠনের কথা বলা হয়েছে, যা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। দাতা–গ্রহীতার পরিচয়, সামঞ্জস্যতা, হাসপাতাল ও সার্জনের তথ্য, সোয়াপ ট্রান্সপ্লান্টের নথি, নৈতিক বোর্ডের সিদ্ধান্ত—সবই এতে সংরক্ষণ করা হবে।
রক্তের গ্রুপ না মিললে দুই পরিবার বা দুই রোগীর মধ্যে সোয়াপ ট্রান্সপ্লান্ট এখন আইনগতভাবে বৈধ। তবে উভয় পক্ষকে জাতীয় রেজিস্ট্রিতে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো সোয়াপ প্রতিস্থাপন করা যাবে না।
দাতা–গ্রহীতার যোগ্যতা ও হাসপাতালের মানদণ্ড
নতুন আইনে দাতা ও গ্রহীতার ক্ষেত্রে কঠোর মেডিকেল স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দাতার বয়স, শারীরিক–মানসিক সক্ষমতা, রক্তের গ্রুপ, জোরপূর্বক দানের ঝুঁকি—এসব মূল্যায়ন করতে হবে। বিশেষ ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশনও বাধ্যতামূলক।
হাসপাতাল ও সার্জনের যোগ্যতাতেও এসেছে কঠোরতা। বিশেষায়িত ট্রান্সপ্লান্ট ইউনিট, নিবন্ধিত সার্জনদের তালিকা, আন্তর্জাতিকমানের আইসিইউ–ওটি এবং টিস্যু টাইপিং ল্যাব ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান অঙ্গ প্রতিস্থাপন করতে পারবে না।
কঠোর শাস্তি
অঙ্গ বিক্রি, দাতা পাচার, জোরপূর্বক দান, জাল নথি বা দালালি–এসবের বিরুদ্ধে রাখা হয়েছে কঠোর শাস্তির বিধান। অবৈধ প্রতিস্থাপনে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল বা চিকিৎসকের লাইসেন্স বাতিল করা হবে।
গেজেটে উল্লেখ করা হয়, ‘যদি কোনো চিকিৎসক আইন ভঙ্গ করে অঙ্গ প্রতিস্থাপন করেন, তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে বিচার হবে।’