স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিতে প্রতি আটজনে এক নারী
মেডিভয়েস রিপোর্ট: দেশে প্রতি আটজনে একজন নারী স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিতে রয়েছেন। শুধু নারী না, বরং পুরুষরাও স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হতে পারেন। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১৩৮ জন পুরুষের একজন স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিতে রয়েছেন। তবে এটি এখন আর মৃত্যু ঘটানোর মতো রোগ নয়, বরং সচেতনতার মাধ্যমে এ থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। এজন্য সচেতনতা সৃষ্টিতে ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি।
স্তন ক্যান্সার সচেতনতার মাস উদযাপন উপলক্ষে মঙ্গলবার (২৮ অক্টোবর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) উদ্যোগে টিএসসি অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। বারডেম জেনারেল হাসপাতালের সহযোগিতায় এই আয়োজনে অংশ নেন ঢাবির প্রায় ১২শ’ শিক্ষার্থী, যাদের অধিকাংশই নারী।
ঝুঁকি এড়াতে চাই সচেতনতা
অনুষ্ঠানে বারডেম জেনারেল হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. শর্মিষ্ঠা রায় স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত বিশ্ব বরেণ্য একাধিক নারীর এ রোগ সম্পর্কে তাদের সচেতনতা কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি স্তন ক্যান্সার থেকে সুরক্ষায় ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার ব্যাপারে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
অধ্যাপক শর্মিষ্ঠা রায় বলেন, ‘আমাদের দেশের পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি আটজনে একজন নারী স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাহলে প্রতি এক হাজার নারীর মধ্যে প্রায় একশ’ জনের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এটা ভীতিকর! এ থেকে সুরক্ষা পেতে সচেতনতা খুব প্রয়োজন।’
‘মনে রাখতে হবে, এটা এখন আর মৃত্যুর কারণ নয়, বরং একটি রোগ। এটা শনাক্ত করতে হবে, লড়াই করতে হবে এবং পরাজিত করতে হবে। সুতরাং সচেতনতার মাধ্যমে এ থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। আমরা পরস্পরকে সহযোগিতা করবো। সচেতনতার তথ্যগুলো সবার মাঝে ছড়িয়ে দেবো। কারণ একত্রে আমরা শক্তিশালী’—বলেন ডা. শর্মিষ্ঠা রায়।
এ সময় বিশ বছরের উপরের নারীদের প্রতি মাসে সেলফ ব্রেস্ট পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন তিনি।
ঝুঁকিতে পুরুষরাও
এ প্রসঙ্গে বারডেম জেনারেল হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মাহমুদা জয়া বলেন, ‘শুধু মহিলা না, বরং পুরুষরাও স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। যেহেতু পুরুষরা এ ব্যাপারে সচেতন থাকেন না, তারা ধরেই নেন এটি নারীদের রোগ। ফলে তারা কখনোই সেভাবে পরীক্ষা করান না। আমার কর্মজীবনে যে কয়জন পুরুষকে স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত অবস্থায় পেয়েছি, দুঃখজনকভাবে পরিণতি ভালো কিছু ছিল না। কারণ চিকিৎসা ছিল বিলম্বিত। রোগটা অনেক দূর অগ্রসর হওয়ার পর তারা এসেছেন।’
এক গবেষণার বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতি ১৩৮ জন পুরুষের মধ্যে একজন স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন।’
বারডেম অফিসার্স ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. মোর্শেদ উদ্দিন আকন্দ বলেন, ‘চিকিৎসা ব্যবস্থায় আমরা অবহেলিত থাকতে চাই না। ক্যান্সার দুরারোগ্য ব্যাধি। সচেতনার মাধ্যমে এ থেকে আমাদের উতরে যেতে হবে। সচেতনতা বাড়ানো গেলেই মৃত্যু হার কমে আসবে। এটা ইতিমধ্যে অনেকখানি কমে এসেছে। স্তন ক্যান্সার এমন একটি ক্যান্সার, যে কারণে মা-বোনেরা লজ্জা ও সংকোচে বলতে দ্বিধা করেন। এই বৃত্ত থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। এজন্য আমাদের সচেতন হওয়া জরুরি। আমাদের কাছে যখন রোগীরা আসেন, তখন অনেক বিলম্ব হয়ে যায়। তখন চিকিৎসা করে ভালো ফল পাওয়া যায় না। সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসা করা গেলে সারাজীবনের জন্য এ থেকে আমরা পরিত্রাণ পেতে পারি।’
লজ্জা ছেড়ে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ
লজ্জা-সংকোচ থেকে বেরিয়ে এসে রোগকে রোগ হিসেবে চিন্তা করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন ডা. মোর্শেদ উদ্দিন। বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে ঢাবির খুব কাছের প্রতিষ্ঠান হিসেবে বারডেম এগিয়ে না এলে এ সচেতনতা কাজে আসবে না। আমরা সচেতনতার হাত বাড়িয়ে দিতে চাই। আপনারা যে কোনো সময় আসবেন।’
অনুষ্ঠানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) এক পরিসংখ্যানের উদ্বৃতি দিয়ে ডাকসুর ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) সাদিক কায়েম বলেন, ‘ডব্লিউএইচওর ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ছয় লাখ সত্তর হাজার নারী স্তন ক্যান্সারে মারা গেছেন। বর্তমানে ১৫৭টি দেশের নারীরা স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত। বাংলাদেশে ১৮ শতাংশ নারী এই রোগে ভুগছেন। অথচ এ নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। এ সংকোচ ভেঙে দিতেই আজকের এই আয়োজন।’
এ সময় ডাকসুর বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে সাদিক কায়েম। তিনি বলেন, ‘আমাদের অঙ্গীকার ছিল আমরা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবো। এর অংশ হিসেবে প্রতি মাসে হেলথ ক্যাম্প শুরু হয়েছে। গত মাসে জগন্নাথ ও শামসুন্নাহার হলে শুরু করেছি এবং এ ক্যাম্প প্রতি মাসে চলবে। একই সাথে বেসরকারি মেডিকেলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা স্বারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করছি। বিভিন্ন মেডিকেলের সঙ্গে আমাদের কথা হচ্ছে। বারডেমের সঙ্গে কথা হয়েছে। সর্বোচ্চ ছাড়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা ও বোনেরা যেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পান।’
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, স্তন ক্যান্সার নিয়ে সচেতনতা কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল ছাত্রীরা বিনামূল্যে বারডেমে স্তন পরীক্ষা করাতে পারবেন। একই সঙ্গে মাত্র এক হাজার টাকায় আল্ট্রাসনোগ্রাম, যার স্বাভাবিক মূল্য ১৫০০ টাকা এবং এক সপ্তাহের জন্য ২৫০০ টাকার ম্যামোগ্রাম মাত্র ১৫০০ টাকায় করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীদের মা ও বোনেরাও নির্ধারিত সময়ে এই সুবিধা নিতে পারবেন।
এমইউ/