অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী
সাবেক চেয়ারম্যান, ভাইরোলজি বিভাগ, বিএসএমএমইউ ও পরিচালক (চলতি দায়িত্ব), সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল।
০৮ জানুয়ারী, ২০২৫ ০৭:৩৩ পিএম
হিউম্যান মেটানিউমোভাইরাস কতটা ভয়াবহ?
হিউম্যান মেটানিউমোভাইরাস (এইচএমপিভি) আমাদের শ্বাসযন্ত্রের প্রদাহ তৈরি করে। প্রদাহ থেকে এর জটিলতা হিসেবে ব্রঙ্কিওলাইটিস অথবা নিউমোনিয়া হতে পারে। এটি শিশুদের (যাদের বয়স পাঁচ থেকে কম) বেশি আক্রান্ত করে অথবা যাদের বয়স ৬০-৬৫ বা বৃদ্ধ বয়সের—তারা বেশি আক্রান্ত হয়। পাশাপাশি যারা ইমিউনো-কমপ্রোমাইজড, অর্থাৎ যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়—সেসব ব্যক্তিদের এটি বেশি হচ্ছে। কিন্তু যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (ইমিউনিটি) আছে বা পূর্ণবয়স্ক, তাদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম।
এই রোগের এখন পর্যন্ত কোনো চিকিৎসা নেই, কোনো ধরনের ভ্যাক্সিনও নেই। আসলে তখনই কোনো রোগের ভ্যাক্সিন অ্যাভেইলেবল থাকে বা আমরা চিকিৎসার ব্যাপারে চিন্তা করে থাকি, যখন এটি প্রাণসংহারী হয়। সাধারণত এটি যখন অনেক মানুষের মৃ্ত্যুর কারণ হয়, অনেক ভোগান্তির কারণ হয়, তখন এগুলোর ভ্যাক্সিন বা কোনো ধরনের চিকিৎসার ব্যাপারে আমরা চিন্তা-ভাবনা করে থাকি। সেক্ষেত্রে এই ভাইরাসে এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী আমরা মৃত্যুর কথা শুনতে পাইনি। যদিও চীনের পরে এটি ভারতে রিপোর্টেড হয়েছে, আমাদের এখানেও (বাংলাদেশে) আসতে পারে। তবে এতে আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার কিছু নেই।
সাধারণত যেসব হ্যান্ড-হাইজিন থাকে অর্থাৎ হাতের যে স্বাস্থ্য পরিচর্যা আমরা করে থাকি তা মেইনটেইন করা বা এটি যেহেতু আমাদের হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়ায়, তাই এই জিনিসগুলো থেকে মুক্ত থাকতে হবে—যেন এভাবে ভাইরাসটি আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে না পড়ে।
এইচএমপিভির লক্ষণ, রোগ নির্ণয় ও প্রতিকারে করণীয়
এইচএমপিভি যেহেতু শ্বাসযন্ত্রের প্রদাহের মাধ্যমে তৈরি হয়, সেক্ষেত্রে শ্বাসযন্ত্রের অসুখের যে লক্ষণগুলো থাকে, সেগুলোই বেশি পরিমাণে দেখা দেয়—যেমন হাঁচি, কাশি, জ্বর, গায়ে ব্যথা। এ ছাড়া বমি ও ডায়রিয়াও হতে পারে। যে কোনো ফ্লুতে (যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, শিশুদের রেসপিরেটরি সিনোসাইট্রিয়াল ভাইরাস-আরএসপি বা কোভিড) যে লক্ষণগুলো থাকে, এই ভাইরাসেও এসব লক্ষণই দেখা যায়। অর্থাৎ শ্বাসযন্ত্রের প্রদাহ তৈরি করে এমন ভাইরাসগুলোর সাধারণ লক্ষণ এগুলো। এই লক্ষণগুলো দেখার পরে এক্সরে ও রক্তের পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করা যেতে পারে, তবে নির্দিষ্টভাবে এই রোগটি নির্ণয়ের জন্য পিসিআর বা অন্য কোনো টেস্টের সহজলভ্যতা এখনও হয়নি।
মনে রাখতে হবে, ভ্যাক্সিন না থাকার কারণে এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে এর প্রতিকার সম্ভব। যে লক্ষণগুলো দেখা দেয়, তার চিকিৎসা করলেই এর প্রতিকার করা যায়। চিকিৎসার পরিভাষায় এ ধরনের চিকিৎসাকে ‘সিম্পটমেটিক ট্রিটমেন্ট’ বলা হয়। যেমন জ্বর থাকলে জ্বরের ওষুধ সেবন। তবে এক্ষেত্রে কোনো ধরনের ব্যথানাশক ওষুধ (এনএসএইড) দেওয়া যাবে না। আর এক্সরেতে যদি নিউমোনিয়াজাতীয় কিছু লক্ষণ দেখা যায়, তখন নিউমোনিয়ার ট্রিটমেন্ট করতে হবে, তখন অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের শিশুদের ব্যাপারে খুবই সতর্ক থাকতে হবে। কারণ বাচ্চাদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া সহজে হয়ে যায়। শিশুদের পাশাপাশি বৃদ্ধদের ক্ষেত্রেও আমাদের বেশি সতর্ক থাকতে হবে।
এইচএমপিভি কতখানি ভয়াবহ হতে পারে?
এই ভাইরাসে দীর্ঘমেয়াদি কোনো ক্ষতি হয় না। এটি আসলে সাধারণ একটি ভাইরাস। আমাদের দেশীয় বা এই জাতীয় আবহাওয়ায় এই ভাইরাস অনেক দিন থেকেই আছে। এখন পর্যন্ত শোনাও যায়নি যে চীনে ভাইরাসটির নতুন কোনো মিউটেশন হয়েছে, যার জন্য এটি খুব প্রাণসংহারী হয়ে গেছে। সুতরাং এই ভাইরাসের যে একিউট ইনফেকশন (শরীরে হঠাৎ করে এবং দ্রুত সময়ে ঘটতে থাকা সংক্রমণ) হচ্ছে, তাতে স্বাভাবিক প্রতিকার করলে মৃত্যুর সম্ভাবনা একদম নেই। কেউ নিউমোনিয়া থেকে মৃত্যু বরণ করতে পারে বা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে, অন্যথায় এই ভাইরাসে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
প্রয়োজনীয় সতর্কতা
যেহেতু শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে হিউম্যান মেটানিউমোভাইরাস ছড়ায়, সেক্ষেত্রে প্রধানত হাঁচি-কাশিতে অন্য কেউ যেন আক্রান্ত না হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে আমরা মাস্ক ব্যবহার করতে পারি। এ ছাড়া নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ও কোনো ব্যক্তির সাথে হ্যান্ডশেকের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। এরকম বিভিন্ন ধরনের হ্যান্ড-হাইজিন মেইনটেইন করলে এই ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব।
আসলে কোভিড পরবর্তীকালে আমাদের যে অভ্যাসটি হয়েছিল, সেটি আমরা ভুলতে বসেছি। তদুপরি আবহাওয়াও খারাপ, ঢাকা নগরী ধুলা-বালি এবং পরিবেশ দূষণের ক্ষেত্রে তালিকার উপর দিকে আছে। সেক্ষেত্রে আমরা যদি নিয়মিত মাস্ক ব্যবহার করে থাকি, সেটি এই ধরনের রেসপিরেটরি ভাইরাসগুলোকে প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে।
এইচএমপিভি কি নতুন ভাইরাস?
হিউম্যান মেটানিউমোভাইরাস নতুন কোনো ভাইরাস নয়, এটি অনেক দিন থেকেই আমাদের মধ্যে আছে। ২০০১ সালে নেদারল্যান্ডে প্রথমবার এটি রিপোর্টেড হয়। বলা যেতে পারে, সে বছর এটি আবিষ্কার হয় যে এইচএমপিভি মানুষের মধ্যে সংক্রমণ করছে। বাংলাদেশে শ্বাসযন্ত্রের প্রদাহ তৈরি করে এমন ভাইরাসগুলো নিয়ে বিভিন্ন সময়ের গবেষণায় দেখা যায়, ২০০৭ সালে এই ভাইরাস প্রথমবার নজরে এসেছে। ২০১৯ সালেও এর অস্তিত্ব বাংলাদেশে পাওয়া গেছে।
এটি কি মহামারী রূপ নিতে পারে?
ভাইরাস বা ভাইরাল ডিজিজগুলো কেন মহামারী রূপ নেয়? এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা যদি আমরা জানতে চাই, তাহলে দেখা যায় ওই ভাইরাসগুলোর জিনের কিছু পরিবর্তন হয়। যেমন—ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের জিনের মধ্যে যদি কোনো পরিবর্তন হয়, সে পরিবর্তনের ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির যদি ওই ধরনের প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকে, তখন ওই ব্যক্তির অঙ্গগুলো আক্রান্ত হয়; বিশেষ করে তার শ্বাসযন্ত্র এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও এতে যুক্ত হয়। আবার কোভিডের ক্ষেত্রে—এই ভাইরাসটি মানুষের মধ্যে আগে ছিল না। কিছু জন্তুর মাধ্যমে এটি আমাদের মধ্যে এসেছিল।
কিন্তু এর কোনোটিই হিউম্যান মেটানিউমোভাইরাসের সাথে মিলছে না। কারণ এটি আগে থেকেই আমাদের মধ্যে আছে এবং এখন পর্যন্ত এর কোনো ধরনের মিউটেশনের রিপোর্ট আমরা পাইনি। অর্থাৎ পূর্বের স্বাভাবিক অবস্থায় এটি আছে। সেক্ষেত্রে এটি প্রাণ সংহারী হওয়া অথবা এপিডেমিক বা মহামারী হওয়ার লক্ষণ বা সম্ভাবনা দেখছি না।
কী বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের অ্যালার্ম বা অ্যালার্ট জারি করেনি এই ব্যাপারে। এ ছাড়া এ পর্যন্ত এই ভাইরাস সম্পর্কে চীন থেকে যেসব তথ্য দেওয়া হচ্ছে, তাতে চীনা কর্তৃপক্ষের কোনো রেস্ট্রিকশনের সংবাদও পাওয়া যাচ্ছে না। বরং আতঙ্কগ্রস্ত না হয়ে পর্যটকদের চীন ভ্রমণের আহ্বান জানাতেও দেখা যাচ্ছে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ভাইরাস সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের ব্যাপারে চীনা কর্তৃপক্ষের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। কোভিডের ক্ষেত্রে যেমনটা আমরা সন্দেহ পোষণ করে থাকি যে, এটি চীন তৈরি করেছে বা সঠিক তথ্য সব সময় দেয়নি, এই ভাইরাসের ব্যাপারে তা হয়নি। ফলে এখন পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে, তাতে এই ভাইরাস যে খুব বেশি ক্ষতি করতে পারছে, তা কিন্তু নয়।
অর্থাৎ এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসের ব্যাপারে বিভিন্ন মিডিয়াতে যা কিছু দেখছি বা শুনতে পাচ্ছি, তাতে মনে হচ্ছে এটি সেখানকার মানুষের মধ্যে ধরনের চাঞ্চল্য তৈরির পিছনে আমাদের কোভিড অভিজ্ঞতা বড় ভূমিকা রেখেছে। কোভিডে যে মৃত্যু এবং ভোগান্তি, তার ফলে মানুষের মধ্যে একটি আতঙ্ক কাজ করে সব সময়। ফলস্বরূপ, এই রোগে যারা সামান্যতম আক্রান্ত হচ্ছে বা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি দেখছে, তারা বেশি পরিমাণে বিভিন্ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যাচ্ছে। এটি এক ধরনের অতি সংবেদনশীলতা থেকেও হতে পারে।
এ ছাড়া এ নিয়ে বেশি আলোচনার আরেকটি কারণ হতে পারে রোগ শনাক্তকরণের পদ্ধতি কোভিড পরবর্তীতে আগের তুলনায় অনেক সহজলভ্য হয়ে যাওয়া। এসব পদ্ধতির প্রতি মানুষের মধ্যে চাহিদাও যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, মানুষ এটিকে অ্যাফোর্ডও করতে পারছে। অর্থাৎ বেশি আলোচনাতেই আসলে যে রোগ বা ভাইরাসটি ভয়ঙ্কর হবে, তা কিন্তু নয়। সুতরাং আমাদের এই আতঙ্ক থেকে বের হয়ে আসতে হবে। নিজেরা আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার চেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে মতামত রাখতে হবে। একই সাথে নিজেকে সুস্থ রাখতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ মেনে চলতে হবে।
এনএআর/এমইউ
-
১৮ জানুয়ারী, ২০২৫
-
১৭ জানুয়ারী, ২০২৫
-
১৬ জানুয়ারী, ২০২৫
-
১৬ জানুয়ারী, ২০২৫
-
১৬ জানুয়ারী, ২০২৫
-
১৩ জানুয়ারী, ২০২৫
-
১৩ জানুয়ারী, ২০২৫
-
১৩ জানুয়ারী, ২০২৫
-
১২ জানুয়ারী, ২০২৫