চিকিৎসক থেকে রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া বিশ্বনেতাদের গল্প
ডেস্ক রিপোর্ট: সাদা অ্যাপ্রোন, গলায় স্টেথোস্কোপ, অপারেশন থিয়েটারের ব্যস্ততা কিংবা হাসপাতালের ওয়ার্ড—এটাই ছিল তাঁদের প্রতিদিনের কর্মক্ষেত্র। রোগ নির্ণয় ও অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে মানুষের জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই ছিল তাঁদের পেশা। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই আরোগ্যের শিল্পীরাই পা রাখেন রাজনীতির মঞ্চে। জনগণের আস্থা, রাজনৈতিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের গুণে একসময় তাঁরা হয়ে ওঠেন নিজ নিজ দেশের সরকার প্রধান।
চিকিৎসকদের রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার ইতিহাস
তবে বিশ্ব রাজনীতিতে চিকিৎসকদের রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার ঘটনা খুব বেশি নয়। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, চিকিৎসা পেশা থেকে উঠে এসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে পৌঁছেছেন বেশ কয়েকজন।
২০১২ সালে প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় বিশ্বের অন্তত ২৯ জন চিকিৎসকের রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার তথ্য উঠে আসে। তবে আরও কয়েকজন চিকিৎসক রাষ্ট্রক্ষমতায় এলেও বর্তমানে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মাত্র কয়েকজন চিকিৎসকই রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান
বর্তমানে চিকিৎসক থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা নেতাদের অন্যতম ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। মেডিকেল শিক্ষক থেকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং পরে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এই কার্ডিয়াক সার্জন। ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে এখন ইরানের সর্বোচ্চ নির্বাহী নেতৃত্বে রয়েছেন।
ড. টেরেন্স মাইকেল ড্রু
অন্যজন ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের প্রধানমন্ত্রী ড. টেরেন্স মাইকেল ড্রু। চিকিৎসা পেশায় দীর্ঘদিন কাজ করার পর তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ২০২২ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন এবং বর্তমানে দেশ পরিচালনার পাশাপাশি ২০২৬ সালে ক্যারিকমের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
এভাবে চিকিৎসকদের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি মাহাথির মোহাম্মদ। চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে তিনি দুই দফায় প্রায় ২৪ বছর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার হিসেবে তাঁর নাম আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।
সালভাদর আলেন্দে
লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে সালভাদর আলেন্দে এক অনন্য অধ্যায়। চিকিৎসক থেকে ১৯৭০ সালে চিলির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে তিনি সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দর্শনের প্রতীক হয়ে ওঠেন।
মিশেল ব্যাচেলেট
চিলির আরেক চিকিৎসক মিশেল ব্যাচেলেট ছিলেন একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ। তিনি দুই দফায় দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
বাশার আল-আসাদ
সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ পেশায় ছিলেন একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ। চিকিৎসা পেশা ছেড়ে রাজনীতিতে এসে দীর্ঘ সময় দেশ পরিচালনা করেন। স্বাধীন মালাউইয়ের প্রতিষ্ঠাতা নেতা হেস্টিংস কামুজু বান্দা চিকিৎসক হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং পরে প্রেসিডেন্ট হন।
যুক্তরাজ্যে চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ নেওয়া বাশার আল আসাদের শাসনামলে ছয় লক্ষাধিক মানুষ নিহত হন।
সালি বেরিশা
আলবেনিয়ার সালি বেরিশা ছিলেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ। তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী—উভয় পদেই দায়িত্ব পালন করেছেন।
ডেনজিল ডগলাস
ক্যারিবীয় অঞ্চলের আরেক চিকিৎসক ডেনজিল ডগলাস সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিসের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনা করেন টানা দুই দশক।
আয়াদ আলাওয়ি ও ইব্রাহিম আল-জাফারি
ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় চিকিৎসক আয়াদ আলাওয়ি অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে আরেক চিকিৎসক ইব্রাহিম আল-জাফারিও দেশটির প্রধানমন্ত্রী হন।
ফ্রাঁসোয়া দুভালিয়ে
হাইতির বিতর্কিত শাসক ফ্রাঁসোয়া দুভালিয়ে, যিনি ‘পাপা ডক’ নামে পরিচিত, তিনিও ছিলেন একজন চিকিৎসক। চিকিৎসা পেশা ছেড়ে রাজনীতিতে এসে দীর্ঘদিন দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
সান ইয়াত-সেন
আর আধুনিক চীনের ইতিহাসে সান ইয়াত-সেন একটি অবিস্মরণীয় নাম। চিকিৎসাবিদ্যায় শিক্ষিত এই নেতা কিং সাম্রাজ্যের পতনের পর আধুনিক চীনের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন।
লোটে শেরিং
লোটে শেরিং ভুটানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও একজন প্রখ্যাত ইউরোলজিস্ট। তিনি ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনকারী লোটে শেরিং চিকিৎসক ও রাজনীতিবিদ উভয় পরিচয়েই সুপরিচিত।
স্টেথোস্কোপ থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার যাত্রা নিঃসন্দেহে বিরল, তবে অসম্ভব নয়। ইতিহাস প্রমাণ করে, চিকিৎসকদের একটি অংশ হাসপাতালের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের ভাগ্য গঠনের দায়িত্বও সফলভাবে পালন করেছেন।
এক সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চিকিৎসক রাষ্ট্রপ্রধানের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি ছিল। তবে বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে এলেও সাদা অ্যাপ্রোন থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্বে পৌঁছানোর এই যাত্রা বিশ্ব রাজনীতির এক অনন্য ও অনুপ্রেরণামূলক অধ্যায়।
এমআর/এমইউ