জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউটে ৪০ শয্যার আইসিইউ উদ্বোধন
রোগীর চাপ সামলাতে বড় হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
মেডিভয়েস রিপোর্ট: রোগীর চাপ বেশি থাকা হাসপাতালগুলোর বরাদ্দ বাড়ানো, অবকাঠামো ও চিকিৎসা সরঞ্জাম উন্নয়ন এবং উপজেলা পর্যায়ে কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল।
আজ সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মহাখালীতে জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। এ সময় নতুন ৪০ শয্যার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসার জন্য রাজধানীসহ বড় হাসপাতালগুলোতে আসেন। ফলে এসব হাসপাতালে রোগীর চাপ তুলনামূলক বেশি থাকে। রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা আরও বাড়ানো জরুরি।
তিনি জানান, রোগীর চাপ বেশি এমন হাসপাতালগুলোতে বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি হাসপাতালের অবকাঠামো উন্নয়ন, চিকিৎসা সরঞ্জাম বৃদ্ধি এবং সেবার মান উন্নয়নে কাজ করছে সরকার।
সাখাওয়াত হোসেন বলেন, শুধু হাসপাতাল নির্মাণ করলেই হবে না, সেখানে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য জনবল নিশ্চিত করতে হবে। রোগীরা যেন একটি হাসপাতাল থেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পান, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রতি উপজেলায় ১০টি ডায়ালাইসিস মেশিন
কিডনি রোগীদের চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য করতে আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় ১০টি করে কিডনি ডায়ালাইসিস মেশিন দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বর্তমানে কিডনি রোগীদের নিয়মিত ডায়ালাইসিসের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই জেলা শহর বা বড় শহরের হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে প্রত্যন্ত এলাকার রোগীদের চিকিৎসা নিতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হয়।
উপজেলা পর্যায়ে ডায়ালাইসিসের সুযোগ বাড়ানো গেলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের রোগীদের চিকিৎসাসেবা আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত চিকিৎসার সুযোগও বাড়বে—বলেন তিনি।
চিকিৎসকদের দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ
স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে চিকিৎসকদের দক্ষতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সুযোগ তৈরি করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পাশাপাশি হাসপাতালগুলোর চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
২১ বছর পর আইসিইউ সম্প্রসারণ
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের উন্নয়ন প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ২০০৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া হাসপাতালটি উদ্বোধন করেছিলেন। দীর্ঘ ২১ বছর পর হাসপাতালটিতে আইসিইউ সেবা সম্প্রসারণ করা হলো।
আইসিইউ সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে নতুন করে ৪০টি আইসিইউ বেড যুক্ত হয়েছে। এর ফলে গুরুতর অবস্থায় থাকা রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ আরও বাড়বে বলে জানান তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে গুরুতর রোগীদের চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত আইসিইউ সুবিধা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর সংখ্যা ও চিকিৎসার চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব সুবিধা আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে
স্বাস্থ্যসেবাকে রাজধানীকেন্দ্রিক না রেখে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছেও পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। দেশের সব মানুষের জন্য মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই সরকারের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
এ জন্য উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বড় হাসপাতালগুলোতে রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, অবকাঠামো উন্নয়ন, চিকিৎসা সরঞ্জাম বৃদ্ধি, ডায়ালাইসিস সেবা সম্প্রসারণ, আইসিইউ সক্ষমতা বাড়ানো এবং চিকিৎসকদের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে সরকার।
‘ডাক্তারদের নেক্সট টু গড মনে করি’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমার সম্পর্কে দু-একজন ডাক্তার বলেন, আমি সাংবাদিকদের মাধ্যমে ডাক্তারদের খাটো করি। এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। আমি বোধ হয় প্রথম মন্ত্রী, যিনি বারবার ডাক্তারদের প্রশংসা করে বলেছেন, তাঁরা ‘নেক্সট টু গড’। আর কোনো মন্ত্রী জীবনে এ কথা বলেছেন কি-না, সন্দেহ আছে! আমি ভীষণভাবে ডাক্তারদের শ্রদ্ধা করি। আমি বিশ্বাস করি, তাঁরা নেক্সট টু গড।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি নিজেও দু-একবার অসুস্থ হয়েছি। তখন একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে একজন ডাক্তারের গুরুত্ব অনুভব করেছি। আমার কোনো কাজে কারও ব্যক্তিগত স্বার্থে আঘাত লাগলে তিনি আমার সমালোচনা করতে পারেন, তাতে আমি পরোয়া করি না। তবে আমি আন্তরিকভাবে পুরো চিকিৎসক সমাজের জন্য কাজ করি।’
কখনো রোগীদের অভিযোগও সহ্য করতে হয়
‘আমি যতবার বিভিন্ন হাসপাতালে পরিদর্শনে যাই, সাংবাদিকদের সামনে অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে ডাক্তারদের কথা তুলে ধরি। হ্যাঁ, দু-একটি ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে মিডিয়া ঢুকে গেলে রোগীদের কাছ থেকে দুই-চারটি অভিযোগ বা কথা আসতে পারে। এটাও আমাদের সহ্য করতে হবে। আপনাদের বুঝতে হবে, আপনাদের প্রত্যেকের পরিবার আছে’—বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
চিকিৎসকদের কাছে রোগীদের প্রত্যাশা অনেক বেশি
সরদার সাখাওয়াত বলেন, ‘মানুষ যখন অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকে, তখন সে শুধু সেবা ও দ্রুত আরোগ্য চায়। আর আল্লাহর পর আপনারাই তাকে আরোগ্যের পথে নিয়ে যেতে পারেন। কাজেই আপনাদের কাছে মানুষের প্রত্যাশার কোনো সীমা নেই। একজন চিকিৎসক হিসেবে আপনাদের বুঝতে হবে, রোগীদের প্রত্যাশা আপনাদের কাছে অনেক বেশি।’
মেজাজ না হারানোর পরামর্শ
‘তবে আপনারা সব প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবেন—এটা ঠিক নয়। আমাদের ২০ কোটি মানুষের দেশে চিকিৎসক আছেন কতজন? একজন চিকিৎসক যখন অনেক রোগী দেখেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন। আমার অনেক বন্ধু ও পরিবারের সদস্য চিকিৎসক। তাঁরা প্রতিদিন অসংখ্য রোগী দেখেন। আমি বুঝি, এতে আপনাদের মেজাজ হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু আপনারা চিকিৎসক; আপনাদের মেজাজ হারানো চলবে না।’
মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা প্রত্যেকে যদি বুকে হাত দিয়ে ভাবি, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমরা কতটা ভালো কাজ করেছি, তাহলে অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। নিজের জীবন নিয়ে এক মিনিট চোখ বন্ধ করে ভাবুন—আমরা কী কী অপরাধ করেছি। সেসব যদি মানুষ ও আমাদের সন্তানরা জানত, তাহলে লজ্জায় আমাদের মুখ দেখানো কঠিন হয়ে যেত। কিন্তু আমরা সেগুলো নিয়ে আলোচনা করি না। আল্লাহ যদি আমাদের পাপের বিচার করতেন, তাহলে আমাদের একজনও ঘর থেকে বের হতে পারত না। আমরা বের হতাম আর স্ট্রোক করতাম, একের পর এক অসুস্থ হয়ে পড়তাম। আমাদের প্রত্যেকেরই অনেক অপরাধ আছে। কিন্তু আল্লাহ ক্ষমাশীল। তিনি অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে আমাদের সবকিছু দিয়ে যাচ্ছেন।’
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. গোলাম সারওয়ার লিয়াকত হোসেন ভুইয়াঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী, ডক্টরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদ, ড্যাবের মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস প্রমুখ।
এমআর/এমইউ/