বাংলাদেশকে মেডিকেল ট্যুরিজম হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরামর্শ
মেডিভয়েস রিপোর্ট: বাংলাদেশকে মেডিকেল ট্যুরিজম হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছে বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটি সাহসী ও বাস্তবসম্মত ধারণা হলো বাংলাদেশকে একটি মেডিকেল ট্যুরিজম হাব হিসেবে গড়ে তোলা। এর খরচ-সুবিধা এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান ব্যবহার করে দেশটি প্রতিবেশী অঞ্চল, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার রোগীদের আকৃষ্ট করতে পারে।
আজ শনিবার (২১ ডিসেম্বর) সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘চিকিৎসা সেবায় বিদেশমুখীতা: আমাদের উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ পরামর্শ দেন তাঁরা।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্বাস্থ্যখাতের মান উন্নয়নের জন্য একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন, সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক বিপণন প্রচারণা দরকার। এরমাধ্যমে বাংলাদেশের ভূমিকা বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবার মানচিত্রে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব এই উদ্যোগে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করতে পারে। কল্পনা করুন, এমন একটি হাসপাতাল যা থাইল্যান্ডের বিখ্যাত হাসপাতালের সমকক্ষ প্যাকেজ অফার করছে সাশ্রয়ী মূল্যের, তবে মানের ক্ষেত্রে আপসহীন। অন্যদিকে, মেডিকেল ট্যুরিস্টদের বিদেশমুখী প্রবাহ ঠেকাতে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা এবং শুরুতেই রোগ নির্মূলের ওপর জোর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
তাঁরা বলেন, জনস্বাস্থ্য প্রচারণা, প্রাথমিক চিকিৎসা অবকাঠামো এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক কর্মসূচিতে বিনিয়োগ অনেক রোগের স্থানীয় সমাধান করতে পারে, ফলে ব্যয়বহুল এবং রোগের শেষ পর্যায়ের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন কমে আসবে। (উদাহরণস্বরূপ, ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের সময়মতো শনাক্তকরণ এবং ব্যবস্থাপনা জটিলতা হ্রাস করতে পারে, যা বর্তমানে রোগীদের বিদেশি হাসপাতালের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বক্তারা বলেন, মেডিকেল ট্যুরিজম কেবল অন্য একটি দেশে সেবা নেয়া নয়, এটি একটি দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সক্ষমতা এবং দুর্বলতার প্রতিফলন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিদেশমুখী মেডিকেল ট্যুরিজমের উত্থান একদিকে যেমন একটি সতর্কবার্তা, অন্যদিকে একটি সুযোগ। এটি পদ্ধতিগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে, একই সঙ্গে সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।
বক্তারা আরও বলেন, সরকারের উচিত স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোখাতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করা, বিশেষায়িত স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া, যা সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে সজ্জিত। বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসেবা জায়ান্টদের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা এই অগ্রগতিকে দ্রুততর করতে পারে, যা নিয়ে আসবে দক্ষতা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির সমন্বয়। স্বাস্থ্যখাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশকে তার চিকিৎসা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলোকে বৈশ্বিক মানে উন্নীত করতে হবে এবং মেধা ধরে রাখতে শক্তিশালী প্রণোদনা ব্যবস্থা প্রয়োগ করতে হবে। যাতে মেধাবীরা দেশে ফিরে আসে অত্যাধুনিক সুবিধা এবং পেশাগত সন্তুষ্টি ও প্রতিযোগিতামূলক বেতনের আকর্ষণে বিদেশে প্রশিক্ষিত বাংলাদেশি ডাক্তাররা দেশে ফিরে এসে কাজ করছেন। দুর্নীতি ও অদক্ষতাকে মোকাবিলা করার জন্য স্বচ্ছতা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা এই প্রচেষ্টাগুলোর ভিত্তি হতে হবে।
তাঁরা বলেন, মেডিকেল ট্যুরিজম বা চিকিৎসা পর্যটন অর্থাৎ বিদেশে গিয়ে চিকিৎসাসেবা নেয়া এটি আসলে কোন দেশের স্বাস্থ্যখাতের সেক্টরের ব্যর্থতায় মানুষের সহজাত প্রতিক্রিয়া। যুগ যুগ ধরে মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামে উদ্ভাবন ও উৎকর্ষতাকে আপন করে নিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে আছে। মেডিকেল ট্যুরিজম যদিও প্রাচীন গ্রীসের নিরাময় মন্দির এবং রোমান সাম্রাজ্যের খনিজসমৃদ্ধ পানিতে গোসল থেকে শুরু হয়েছে, আজ চিকিৎসা পর্যটন হল একটি ১০০ বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক ব্যবসা যা অর্থনীতিকে পুনর্নির্মাণ করে এবং স্বাস্থ্যসেবাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে ভারত, থাইল্যান্ড, তুরস্ক এবং সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলি পাওয়ার হাউস হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে, যা পশ্চিমা খরচের ভগ্নাংশে অত্যাধুনিক চিকিৎসা প্রদান করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৫ লাখ ডলার খরচ হতে পারে এমন একটি লিভার ট্রান্সপ্লান্ট ভারতে মাত্র ৫০ হাজার ডলারে করা যায়। এই একটি উদাহরণেই যথেষ্ট কেন লক্ষ লক্ষ মানুষ চিকিৎসা সেবার জন্য অন্য দেশে যায়।
তাঁরা আরও বলেন, অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশ মেডিকেল ট্যুরিজমের শিকারে পরিণত হয়েছে। আশি ও নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের কিছুসংখ্যক অভিজাত শ্রেণীর লোক চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতো, বর্তমানে চিকিৎসার জন্য বাইরে যাওয়া জোয়ারে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালে ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৫৭০ জন বাংলাদেশি স্বাস্থ্যসেবার জন্য বিদেশ ভ্রমণ করেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৮% বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা নিছক পরিসংখ্যান নয়; বরং এটি আমাদের স্বাস্থ্যসেবা খাত নাগরিকদের চাহিদার সাথে কতটুকু তাল মিলাতে পারছে তার ইঙ্গিত দেয়।
বক্তারা বলেন, ধনী ব্যক্তিরা হয়তো সিঙ্গাপুরের চকচকে হাসপাতাল বা থাইল্যান্ডের মেডিকেল স্পা- এ যেতে পারেন, কিন্তু সিংহভাগ ভারতেই যায়। অর্ধেকেরও বেশি বাংলাদেশি চিকিৎসা পর্যটকরা ভারতীয় হাসপাতালে যান, তাদের সান্নিধ্য, সামর্থ্য এবং শ্রেষ্ঠত্বের খ্যাতির কারণে। এই চিকিৎসার জন্য বিদেশে গমণের অর্থনৈতিক প্রভাব যতটা তীব্র, ততটাই উদ্বেগের। বাংলাদেশ প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার হারায়, যার বেশিরভাগই ভারতের দ্রুত-বর্ধনশীল স্বাস্থ্যখাতকে শক্তিশালী করে। এই অর্থপ্রবাহ কেবল একটি আর্থিক বিষয় নয় এটি দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের সমস্যা, যা দেশে উন্নত সুযোগ-সুবিধার অভাব থেকে শুরু করে দীর্ঘস্থায়ী দুর্নীতি ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনার মতো ঘাটতিগুলোকে সামনে আনে। মিস রেহানার পরিবারের মতো পরিবারের জন্য এই যাত্রা হয় নানাবিধ জটিলতা এবং অস্থিরতায় ভরা যা প্রিয়জনকে বাঁচানোর জন্য পরিবারগুলোর নিরন্তর সংগ্রাম।
-
১৬ মে, ২০২৬
-
২২ এপ্রিল, ২০২৬
-
০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
ইশতেহারে ৩৭ দফা স্বাস্থ্য পরিকল্পনা ঘোষণা
স্বাস্থ্য বরাদ্দ তিনগুণ করবে জামায়াত, স্বাস্থ্যবীমা-হেলথ কার্ড চালুর অঙ্গীকার