ডিমেনশিয়া ঝুঁকির ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিরোধ করা সম্ভব: ডব্লিউএইচও
মেডিভয়েস রিপোর্ট: ডিমেনশিয়া ও জ্ঞানীয় অবক্ষয়ের (কগনিটিভ ডিক্লাইন) ঝুঁকি কমাতে নতুন হালনাগাদ নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটি বলছে, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, ঝুঁকির কারণগুলো নিয়ন্ত্রণ এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির প্রায় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করা সম্ভব।
গতকাল বুধবার (১৫ জুলাই) ডব্লিউএইচও জ্ঞানীয় অবক্ষয় এবং ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমানোর বিষয়ে হালনাগাদ নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। নতুন এই নির্দেশিকায় দেশগুলোকে জীবনব্যাপী ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে প্রমাণভিত্তিক সুপারিশ বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ডিমেনশিয়া
ডিমেনশিয়া হলো মস্তিষ্কের বিভিন্ন রোগের কারণে সৃষ্ট একটি অবস্থা, যা ধীরে ধীরে স্মৃতিশক্তি, চিন্তাভাবনা, ভাষা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দৈনন্দিন কাজ করার সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে পাঁচ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষ ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত। প্রতি বছর নতুন করে প্রায় এক কোটি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হন। ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে সাধারণ ধরন হলো আলঝেইমার রোগ, যা মোট রোগীর প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের ক্ষেত্রে দায়ী।
ঝুঁকির প্রায় অর্ধেকই নিয়ন্ত্রণযোগ্য
যদিও ডিমেনশিয়ার এখনো পর্যন্ত কোনো নিরাময় আবিষ্কৃত হয়নি। তবে ডব্লিউএইচও বলছে, এর ঝুঁকির প্রায় ৪৫ শতাংশই কিছু নির্দিষ্ট কারণের সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে—তামাক ব্যবহার,অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, বায়ুদূষণের সংস্পর্শ এবং বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ যেমন—উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ ও স্ট্রোক। তাই এসব ঝুঁকি সমূহ নিয়ন্ত্রণে রাখার পরামর্শ দিয়েছে ডব্লিউএইচও।
ডিমেনশিয়া শুধু স্মৃতিশক্তির অবনতিই ঘটায় না; এটি একজন মানুষের স্বাধীনভাবে জীবনযাপন, মর্যাদা এবং নিরাপত্তাকেও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে।
যা বললেন ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ড. টেড্রোস আধানম গেব্রেয়াসুস বলেন, ‘ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির কারণ সম্পর্কে আমরা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি জানি। নতুন এই নির্দেশিকাগুলো সেই জ্ঞানকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দিয়েছে। দেশগুলোর হাতে এখন এমন প্রমাণভিত্তিক সুপারিশ রয়েছে, যা মানুষের জ্ঞানীয় স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবিলম্বে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।’
নতুন নির্দেশিকায় যা রয়েছে
২০১৯ সালে প্রকাশিত ডব্লিউএইচওর এর প্রথম নির্দেশিকার পর সাম্প্রতিক গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ভিত্তিতে নতুন সংস্করণটি হালনাগাদ করা হয়েছে। নির্দেশিকায় ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি কমাতে যেসব পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সেগুলো হলো—নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, ধূমপান ও তামাক ব্যবহার বন্ধ করা, অ্যালকোহল সেবন কমানো, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ, বায়ুদূষণের সংস্পর্শ কমানো, সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ, জ্ঞানীয় প্রশিক্ষণ (কগনিটিভ ট্রেইনিং) ও মানসিক উদ্দীপনামূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, বিশেষ করে যাদের মৃদু জ্ঞানীয় বৈকল্য (মাইল্ড কগনিটিভ ইমপেরিমেন্ট) রয়েছে।
এছাড়া উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ কোলেস্টেরলের মতো হৃদ-বিপাকীয় রোগগুলো নিয়ন্ত্রণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শ্রবণশক্তি কমে গেলে প্রয়োজনে শ্রবণ সহায়ক যন্ত্র (হিয়ারিং এইড) ব্যবহারের পরামর্শও দিয়েছে ডব্লিউএইচও।
যেসব ভিটামিন বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ বারণ
শুধু ডিমেনশিয়া প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে ভিটামিন বি, ভিটামিন ই, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড কিংবা মাল্টিভিটামিন-মিনারেল সাপ্লিমেন্ট গ্রহণের সুপারিশ করেনি ডব্লিউএইচও।
সংস্থাটি বলছে, শরীরে এসব উপাদানের ঘাটতি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত না হলে এগুলো গ্রহণের উপকারিতার পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং অপ্রয়োজনীয়ভাবে গ্রহণ করলে ক্ষতির সম্ভাবনাও থাকতে পারে।
মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপ
ডিমেনশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির পাশাপাশি তার পরিবার ও পরিচর্যাকারীদের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ডিমেনশিয়ার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতি বছর প্রায় ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করে, ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির কারণগুলো সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে লাখো মানুষের দীর্ঘদিন সুস্থ, সক্রিয় ও স্বাধীন জীবনযাপন নিশ্চিত করা সম্ভব।
এইউ/