জরায়ুমুখ ক্যান্সার টিকা পাবেন ৬২ লাখ কিশোরী, ক্যাম্পেইন শুরু ২৪ অক্টোবর
মেডিভয়েস রিপোর্ট: জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে কিশোরীদের এ বছরও এক ডোজ হিউম্যান পেপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) টিকা দেওয়া শুরু হচ্ছে। আগামী ২৪ অক্টোবর থেকে ঢাকা বাদে দেশের সাত বিভাগে স্কুল ও স্কুলের বাইরে বিনা মূল্যে এ টিকা দেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত টিকা ক্যাম্পেইন চলবে।
আজ সোমবার (২১ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) আয়োজনে এইচপিভি টিকা ক্যাম্পেইন নিয়ে এক কর্মশালায় এসব তথ্য জানানো হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সহকারী পরিচালক ডা. শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি পরিচালিত এ কার্যক্রম চলবে ১৮ দিনব্যাপী। এবার ৬২ লাখ কিশোরীদের বিনা মূল্যে টিকা দেয়ার লক্ষ্য রয়েছে। স্কুল, ইপিআই টিকা কেন্দ্রগুলোতেও টিকা দেওয়া হবে।
সাত বিভাগের ৫১টি জেলায় এ কার্যক্রম চলবে জানিয়ে তিনি বলেন, এই কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য প্রতিটি কমিটিতে দুজন করে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত বছর দেশে প্রথমবারের মতো সরকারিভাবে বিনা মূল্যে এইচপিভি টিকা দেওয়া শুরু হয়। প্রথম পর্যায়ে শুধু ঢাকা বিভাগে এ কার্যক্রম চলেছিল। এ বছর অন্তত ৯৫ শতাংশ কিশোরীকে এইচপিভি টিকার আওতাভুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
কর্মশালায় জানানো হয়, গত বছরের মতো এ বছরও স্কুলের পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণির ছাত্রী এবং স্কুলের বাইরে থাকা ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী কিশোরীদের এ টিকা দেওয়া হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বয়স ভিত্তিক বিন্যাস অনুসারে ১০ বছর বয়সী কিশোরীরা ৫ম শ্রেণিতে এবং ১১-১৪ বছর বয়সী কিশোরীরা ৬ষ্ঠ-৯ম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।
এইচপিভিতে বছরে ৫ হাজার নারীর মৃত্যু
ডা. শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানান, দেশে প্রতিবছর জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত প্রায় ৫ হাজার নারী মারা যান। আর প্রতিবছর লাখে ১১ জন নারী এ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। সে হিসাবে প্রতি বছর প্রায় ১২ হাজার নারী জরায়ুমুখ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। দেশে নারীরা যত ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, তার মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হচ্ছে জরায়ুমুখ ক্যান্সার।
ইপিআইয়ের তথ্য অনুসারে, ২০১৬-১৭ সালে এইচপিডি টিকাদান কার্যক্রমের পাইলটিং হিসেবে গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর, কালীগঞ্জ, কাপাসিয়া, শ্রীপুর উপজেলা এবং সিটি কর্পোরেশন জোন-০১ এর ৫ম শ্রেণির ছাত্রী ও ১০ বছর বয়সী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বহির্ভূত কিশোরীদের এইচপিভি টিকা প্রদান করা হয়।
প্রথম ধাপে ঢাকা বিভাগে ২০২৩ সালের অক্টোবর-নভেম্বর মাসে এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে যেখানে প্রায় ২০ লাখ কিশোরীর মধ্যে ১৫ লাখ ৮ হাজার ১৮৩ কিশোরীকে ১ ডোজ এইচপিভি টিকা দেওয়া হয়, যা উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭৫ শতাংশ। মাইক্রোপ্ল্যান অনুযায়ী ১৫ অক্টোবর থেকে ১৬ নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান/টিকাদান কেন্দ্রে এইচপিভি টিকা দেয়া হয়েছে।
এবার বাকি সাত বিভাগে মোট ৬২ লাখ ১২ হাজার ৫৩২ কিশোরীকে টিকা দেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে স্কুলের বাইরে থাকা এক লাখ ৮৬ হাজার ৬৭৬ কিশোরীকে টিকা দেয়া হবে। ঢাকা বিভাগের অভিজ্ঞতার আলোকে অবশিষ্ট সাতটি বিভাগে অক্টোবর-নভেম্বের ২০২৪ সালে এইচপিভি ক্যাম্পেইন শুরু হতে যাচ্ছে।
এইচপিভি কী?
কর্মশালায় জানানো হয়, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (এইচপিভি) একটি যৌনবাহিত ভাইরাস। এটি জননাঙ্গে আঁচিল (ওয়ার্টস) ও জরায়ুমুখ ক্যান্সার সৃষ্টি করে থাকে। আজ পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া শতাধিক ধরনের এইচপিভি ভাইরাসের মধ্যে প্রায় ১৩টি সেরোটাইপ ক্যান্সার সৃষ্টি করে থাকে। তার মধ্যে ১৬ এবং ১৮ সেরোটাইপ খুবই মারাত্মক, যা ৭০% জরায়ুমুখ ক্যান্সারের জন্য দায়ী। শতকরা ৯৯ ভাগ জরায়ুমুখ ক্যান্সার এইচপিভি ভাইরাস দ্বারা হয়।
এইচপিভি ছড়ায় যেভাবে
অনিরাপদ শারীরিক মিলনের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়িয়ে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এইচপিভি ভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ সঙ্গে সঙ্গে বোঝা যায় না। সাধারণত এই ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হওয়া থেকে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের লক্ষণ প্রকাশ পেতে ১৫-২০ বছর সময় লাগে। তবে স্বল্প রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন নারীদের ক্ষেত্রে ক্যান্সারে রূপ নিতে মাত্র ৫-১০ বছর সময় লাগে। আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত এবং দেহরসে এই ভাইরাস পাওয়া যায়।
জরায়ুমুখ ক্যান্সারের লক্ষণ
কর্মশালায় জরায়ুমুখ ক্যান্সারের লক্ষণ তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো—
অতিরিক্ত সাদা স্রাব, অতিরিক্ত অথবা অনিয়মিত রক্তস্রাব, মাসিক পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার পর পুনরায় রক্তপাত, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব, শারীরিক মিলনের পর রক্তপাত ও কোমর/তলপেট/উরুতে ব্যথা।
জরায়ুমুখ ক্যান্সারের অধিক ঝুঁকিতে যারা
বাল্যবিবাহ, ঘন ঘন সন্তান প্রসব, অনিরাপদ শারীরিক মিলন। একাধিক যৌনসঙ্গী, ধূমপায়ী, স্বল্প রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী (যেমন—এইডস রোগী) এবং যে সকল নারী প্রজনন স্বাস্থ্য এবং পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে সচেতন নন এবং সমস্যার প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসকের অথবা স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নেন না, তাদের এই ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
এইচপিভি টিকা পেতে নিবন্ধন যেভাবে
কর্মশালায় বলা হয়েছে, টিকা নেওয়ার জন্য https://vaxepi.gov.bd/registration ওয়েবসাইটে গিয়ে ১৭ ডিজিটের অনলাইন জন্মনিবন্ধন নম্বর দিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। তবে যাদের অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ নেই, তাদেরও বিশেষভাবে তালিকাভুক্ত করে টিকা দেওয়া হবে।
এ ছাড়া শুরুতে এ কার্যক্রম সাতটি বিভাগের নির্দিষ্ট বয়সী ও নির্ধারিত শ্রেণীতে অধ্যয়নরত কিশোরীরা www.vaxepi.gov.bd ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করে টিকাকার্ড সংগ্রহ করতে পারবেন। পরে ওই কার্ড দেখিয়ে টিকার ডোজ গ্রহণ করা যাবে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হালনাগাদ সুপারিশে জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে এক ডোজ টিকাই কার্যকর। এ ক্যান্সারে প্রতিরোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের ৯০ শতাংশকে টিকা, ৩৫ ও ৪৫ বছর বয়সে অন্তত দুবার স্ক্রিনিং বা পরীক্ষা এবং ৯০ শতাংশকে চিকিৎসার আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাস্তবায়নাধীন ‘শিশু, কিশোর-কিশোরী ও নারী উন্নয়নে সচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম’ প্রকল্পের আওতায় গণমাধ্যমকর্মীদের নিয়ে জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটে এই কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক সুফী জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোহাম্মদ গোলাম আজম।
কর্মশালায় এইচপিভি টিকাদান ক্যাম্পেইন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন ইপিআই কর্মসূচির ডিপিএম ডা. রাজীব সরকার। এই ক্যাম্পেইনে গণমাধ্যমের ভূমিকা সম্পর্কে বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের পরিচালক (প্রশিক্ষণ প্রকৌশল) মো. নজরুল ইসলাম। এ ছাড়া কর্মশালায় ইউনিসেফের প্রতিনিধি ব্রিজেট জব জনসন বক্তব্য রাখেন।
এমইউ/
-
১২ নভেম্বর, ২০২৪
-
০৩ নভেম্বর, ২০২৪
-
৩০ অক্টোবর, ২০২৪
-
২৯ অক্টোবর, ২০২৪
-
২২ অক্টোবর, ২০২৪
-
৩০ জানুয়ারী, ২০২৪
এইচপিভি টিকা পেলেন ৭৫ শিক্ষার্থী
চমেকে জরায়ুমুখ ক্যান্সার সচেতনতা মাসের কর্মসূচির সূচনা
-
১৫ অক্টোবর, ২০২৩
-
১৫ অক্টোবর, ২০২৩
-
১৩ অক্টোবর, ২০২৩